জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জন ও জিজ্ঞাসা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পরে এসে সেই অভ্যুত্থানের অর্জন ও অপ্রাপ্তির খতিয়ান নেওয়া শুধু স্মৃতিচারণা নয়, এক জরুরি রাজনৈতিক দায়ও বটে। লিখেছেন কাজী মারুফুল ইসলাম

দুই বছর আগে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসকে এক অনন্য দিকবদলের মুখোমুখি করে। কিন্তু এই অভ্যুত্থান এক দিনে জন্ম নেয়নি। এর ভাষা, ভাব, প্রতিবাদের ব্যাকরণ তৈরি হচ্ছিল ধীরে ধীরে—বিশেষত ২০১৮ সালের পর থেকে। নিরাপদ সড়ক আর কোটা সংস্কারের আন্দোলন থেকে শুরু করে বিক্ষিপ্ত নানা প্রতিরোধে একটি নতুন রাজনৈতিক শব্দভান্ডার জমা হচ্ছিল। এর পাশাপাশি একদল লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী বছরের পর বছর ভিন্নমতের একটি বয়ান নির্মাণ করে যাচ্ছিলেনযে বয়ান দমন, বৈষম্য ও ভয়ের সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। 

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পরে এসে সেই অভ্যুত্থানের অর্জন ও অপ্রাপ্তির খতিয়ান নেওয়া তাই শুধু স্মৃতিচারণা নয়, এটা জরুরি রাজনৈতিক দায়ও বটে। হিসাব নেওয়ার আগে একটি কথা স্পষ্ট করা দরকার। এই পর্যালোচনা সন্তুষ্টির নয়, হতাশারও নয়; এটি আত্মানুসন্ধান ও পর্যালোচনার।

২.

একটি বিশ্লেষণী কাঠামো সামনে রাখলে দুই বছরের ছবিটি স্পষ্ট হয়। একটি সত্যিকারের গণ-অভ্যুত্থান হলো জনগণের সৃষ্টিশীল ক্ষমতার বিস্ফোরণ; কিন্তু সেই ক্ষমতা সহজেই একটি এলিট-বোঝাপড়ার হাতে বন্দী হয়ে পড়তে পারেযেখানে শাসনের মুখ বদলায়, কাঠামো বদলায় না। পরীক্ষাটি তাই সরল—অভ্যুত্থানের শক্তি কি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে রূপ নিতে পারল, নাকি পুরোনো ব্যবস্থাই নতুন পোশাকে ফিরে এল? বাস্তবতা হলো, গভীর রাজনীতি প্রোথিত থাকে সমাজে এবং মানুষের জাগ্রত কর্তাসত্তায়। তাহলে পর্যালোচনায় এটাও দেখতে হবে যে এই আন্দোলন কোনো জনগোষ্ঠীর কর্তাসত্তা উজ্জীবনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারল কি? 

রাজনীতিবিজ্ঞানের যেকোনো সংজ্ঞায় জুলাই ছিল একটি বিপ্লবের সম্ভাবনায় জারিত স্বতঃস্ফূর্ত একটি গণ-অভ্যুত্থান। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানকে বিপ্লবে রূপান্তরের জন্য যে পূর্বপ্রস্তুতি, বিপ্লবী সাংগঠনিক শক্তি ও বিপ্লবোত্তর সমাজ–রাষ্ট্রের চরিত্র ও গতিমুখ সম্পর্কে স্পষ্ট রূপকল্প হাজির না থাকায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা, নিঃশঙ্ক ত্যাগ একটা অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানেই স্তিমিত হয়। 

আরও পড়ুন

জুলাই আন্দোলন কোনো একক দলের ছিল না; ছিল বহুস্বরের। অন্য অনেক আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের সঙ্গে জুলাইয়ের একটা অন্যতম পার্থক্য হলো, এই অভ্যুত্থান সংঘটনে কোনো একক নেতা, সংগঠন, রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় নির্ধারক ভূমিকা ছিল না। শিক্ষার্থীদের সাহস আর সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল এর প্রধান শক্তি। এর প্রকৃত চালিকা শক্তি ছিল স্বৈরাচারের দমন-পীড়ন এবং হাজারো তরুণকে হতাহত করা, যা মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছিল। ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী, রিকশাচালক, নারী, প্রান্তিক মানুষ—যাঁরা এত দিন রাজনৈতিক গণনার বাইরে ছিলেন, তাঁরাই জুলাইয়ে নিজেদের দৃশ্যমান করে তোলেন। 

এই অভ্যুত্থানের ভাষা ছিল একেবারে নতুন। প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলো যে প্রাণহীন রাজনৈতিক বুলি আওড়ে যাচ্ছিল, তা পাশ কাটিয়ে তরুণেরা নিজেদের কথা বলল দেয়ালের গ্রাফিতিতে, র্যাপের চরণে, মিমের ব্যঙ্গে। ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’—এই ছিল প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা; সব ধর্ম, বর্ণ ও জাতিসত্তার সমান মর্যাদার এক বাংলাদেশের স্বপ্ন। রাস্তার এই ভাষা ছিল ‘সুশীল’ ভাষার বিপরীতে দ্রোহী উচ্চারণ; আর এই স্বতঃস্ফূর্ত সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বই ছিল অভ্যুত্থানের প্রাণ।

► ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী, রিকশাচালক, নারী, প্রান্তিক মানুষ—যাঁরা এত দিন রাজনৈতিক গণনার বাইরে ছিলেন, তাঁরাই জুলাইয়ে নিজেদের দৃশ্যমান করে তোলেন।  ► প্রতিরোধ সম্ভব; ভয়কে জয় করা যায়—এই উপলব্ধি একবার জন্মালে তা আর মুছে ফেলা যায় না, আর পরাজয়ের অভিজ্ঞতাও পরের লড়াইয়ের প্রস্তুতিকে শক্ত করে। 

আন্দোলন ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। ১৬ জুলাই রংপুরের রাজপথে আবু সাঈদের বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার ঘটনাকে এ আন্দোলনের একটা অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এরপর সর্বব্যাপী দমন-পীড়ন, ইন্টারনেট বন্ধ ইত্যাদির মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৮ জুলাই তাঁরা যখন নিজেদের হাতে আন্দোলনের ভার তুলে নিলেন, তখন সেটি হয়ে উঠল এক নির্ণায়ক মুহূর্ত। যে তরুণেরা সাধারণত সরকারি চাকরির প্রত্যাশী নন, তাঁরাও সরকারি-বেসরকারির বিভাজন মুছে দিয়ে সাহস ও আত্মত্যাগের যে নজির রাখলেন, তা আন্দোলনের গতিপথই বদলে দিল। এরপর জাগরণ ছড়িয়েছে দেশের প্রতিটি প্রান্তে; ঢাকার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও জেগে ওঠে। এভাবেই ক্রমেই আন্দোলন পরিণত হয় এক গণ-অভ্যুত্থানে, পতন হয় স্বৈরাচারী শাসকের। 

চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে ফেরানোর সুযোগ করে দিয়েছে
ফাইল ছবি

৩.

অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর সময় পেরিয়ে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা—এটি নিঃসন্দেহে ওই সরকারের বড় অর্জন। কিন্তু ওই পর্বের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতাও ছিল। রাষ্ট্র তার বৈধ একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিযোগী স্বার্থগোষ্ঠীর ওপর প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। 

গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের স্বপ্ন প্রসারিত হয়, রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি ওঠে। এই জনপ্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং দলগুলোর মধ্যে সংলাপের পরিসর তৈরি করে একটি ঐকমত্যের ভিত্তি রচনা করে; জুলাই সনদ তারই ফসল। কিন্তু অচিরেই পুরো প্রক্রিয়াটি হয়ে উঠল এলিট-নিয়ন্ত্রিত, আর জনগণ থেকে গেল দর্শক। কমিশনের সুপারিশ নিয়ে যখন দর-কষাকষি চলছিল, তখন কেউ সাধারণ মানুষকে বোঝায়নি—দ্বিকক্ষ সংসদ কিংবা স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে কী বদল আনবে। ফলে সংস্কারপ্রক্রিয়ায় জনগণ কোনো মালিকানা খুঁজে পায়নি; আর এই বিচ্ছিন্নতাই ছিল সংস্কারের মূল দুর্বলতা।

এই পর্বের আরেকটি প্রশ্নবিদ্ধ দিক হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি। একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করা—দীর্ঘমেয়াদি কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করা নয়। অথচ এই সময়েই বহিঃশক্তির সঙ্গে কিছু চুক্তি সম্পাদিত হয়, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি উল্লেখযোগ্য। এটি বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি এক নির্ভরতা ও শৃঙ্খলের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ রকম সিদ্ধান্তের কোনো ম্যান্ডেট অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল না।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

৪.

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই বছরের ব্যালান্স শিট মিশ্র। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোট একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছিল—জুলাই সনদের পক্ষে গণভোটে ৬৮ শতাংশের বেশি রায় এসেছিল। এই রায় মানার ক্ষেত্রে প্রাক্​নির্বাচনী রাজনৈতিক সমঝোতা এবং নির্বাচন-পরবর্তী জনরায়ের বাধ্যতা থাকা সত্ত্বেও কিন্তু নির্বাচনের পরই এলিটদের নাজুক ঐকমত্যটি ভেঙে পড়ে। রায়টি যেহেতু বিশুদ্ধ আইনি নয়, রাজনৈতিকসেই ফাঁক ধরেই ক্ষমতাসীন দল সনদকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করার সুযোগ পেল; সংসদকে সংবিধান সংস্কার সভায় রূপান্তরের প্রস্তাবও গৃহীত হলো না।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বেশির ভাগ অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হলেও ঠিক সেগুলোই বাতিল বা স্থগিত হয়েছে, যেগুলো ক্ষমতাকে জবাবদিহির জন্য আবশ্যক ছিল। এটি কাকতালীয় নয়। জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর রাজনীতির সহায়ক নয়; সেই স্বার্থেই সেগুলো প্রথমে কাটা পড়ে।

বিচারের প্রশ্নে একটি প্রতীকী অর্জন আছে—২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে সর্বোচ্চ দণ্ড দিয়েছেন। তবে শুধু শীর্ষ ব্যক্তির বিচারই যথেষ্ট নয়; মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মান ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে কিছু অগ্রগতি হয়েছে—শহীদ পরিবার ও আহতদের নিয়মিত ভাতা এবং শতাধিক গুরুতর আহতকে বিদেশে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়ের ঘাটতি প্রকট; জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন তহবিল-সংকটে, তালিকায় ভুয়া নামও ধরা পড়েছে, আর ট্রমা ও বিষণ্নতার মতো দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতের পুনর্বাসন প্রায় উপেক্ষিত। 

মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও দ্বৈত ছবি—ভয়ের সংস্কৃতি কিছুটা শিথিল হলেও দমনমূলক সাইবার আইন বহাল, শতাধিক সাংবাদিক আইনি হয়রানির মুখে। রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ কমেছে বটে, কিন্তু ট্যাগিং আর ডিজিটাল লিঞ্চিংয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এক নতুন সামাজিক সেন্সরশিপ, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু গণ্য করা হয়। এক অর্থে দমনের হাতিয়ার বদলেছে, দমনের প্রবণতা বদলায়নি।

রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী ও আমলাতান্ত্রিক এলিট নেটওয়ার্ক মোটাদাগে অপরিবর্তিত থেকে গেছে। সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় সরকার কোথাও কোনো ব্যবস্থাগত পরিবর্তনের চেষ্টা দৃশ্যমান হয়নি। উল্টো এই সময়ে আমলাতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়েছে, অথচ জবাবদিহি বাড়েনি। মাঠপর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক আনুগত্য এখনো নির্ধারক; কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কেবল সদিচ্ছা দিয়ে দলীয় প্রভাব কমানো যায় না।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক অসংগতি নারী ও প্রান্তিক মানুষের প্রশ্নে। যে নারীরা আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন, ক্ষমতার ভাগে তাঁরা প্রায় অনুপস্থিত—সাধারণ আসনে জিতেছেন মাত্র সাতজন, প্রার্থীদের মাত্র ৪ শতাংশ ছিলেন নারী, আর সনদে দেওয়া নারী প্রতিনিধিত্বের অঙ্গীকারও রক্ষা পায়নি। প্রথম ছয় মাসেই আড়াই শতাধিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা আর মাজারে হামলার ঘটনা—নিছক ধর্মীয় উন্মত্ততা নয়; এ যেন বহুত্ববাদী ও সমন্বয়বাদী সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার এক রাজনৈতিক প্রকল্প, যেখানে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তাই এক নীরব অনুমোদন। নারীর প্রতি সহিংসতাও বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। 

রাজনৈতিক সংস্কৃতিও সংকুচিত হয়েছেগোটা বয়ান ডান দিকে সরে গেছে, অন্তর্ভুক্তির আকাঙ্ক্ষা পিছিয়ে পড়েছে অসহিষ্ণুতার কাছে। আর অর্থনীতি আটকে আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধির ফাঁদে; প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৪ শতাংশের ঘরে, মূল্যস্ফীতি ঘুরছে ৯ শতাংশের ওপরে, খেলাপি ঋণের বোঝা রেকর্ড উচ্চতায়, কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম নিম্ন, আর প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানহীনসেই একই সুবিধাবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা। 

৫.

বিপ্লবী রূপান্তর কেন থমকে গেল? উত্তরটি একরৈখিক নয়। জনগণের বিপ্লবী শক্তি অভিজাত ঐকমত্যে শোষিত হয়েছে, সংস্কার পরিণত হয়েছে এলিটদের দর-কষাকষিতে, আর জনগণ হারিয়েছে মালিকানা। জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান যেহেতু পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির স্বার্থবিরোধী, দলগুলোর কাছে সেগুলো গড়ার বস্তুগত প্রণোদনা নেই। আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো যে সামাজিক শক্তি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, তা কোনো টেকসই সাংগঠনিক রূপ পায়নি; রাজপথের কর্তাসত্তা সংসদীয় ভাষায় অনূদিত হয়নি। ফলে বিপ্লবের শক্তি সংগঠিত রূপ না পেয়ে আবার কোটারিদের হাতেই ফিরে গেছে।

এত সীমাবদ্ধতার পরও জোর দিয়ে বলা দরকার, জুলাই কোনো হতাশা নয়। কারণ, এর গভীরতম অর্জন কোনো দপ্তরে নয়, তরুণ প্রজন্মের ভেতরে। তারা নিজেদের কর্তাসত্তা, সৃজনশীলতা ও সাহস নতুন করে আবিষ্কার করেছে; এটা এক প্রজন্মের আত্মঘোষণাজেন-জির নিজেকে চেনা ও জানান দেওয়া। তবে এই আত্মঘোষণার একটি দ্বৈত ধার আছে। কখনো কখনো তা রূপ নেয় সব রকম রীতিনীতি ও কর্তৃত্ব অস্বীকারের প্রবণতায়; আর সেই অবাধ্যতা যখন নোঙরহীন হয়ে পড়ে, তখন তা জন্ম দিতে পারে উন্মত্ত জনতার। এই সাহস তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ঝুঁকি; তারুণ্যের এই জাগ্রত শক্তিকে গণতান্ত্রিক দায়িত্ববোধ ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে মিলিয়ে রাখাই আগামী দিনের বড় পরীক্ষা।

তবু আশার জায়গাটি অটুট। কারণ, রাজনীতি শুধু সংসদ বা মিছিলে সীমাবদ্ধ নয়; তা বাস করে ঘরে, শ্রেণিকক্ষে, কর্মক্ষেত্রে, প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে। আনুষ্ঠানিক দরজা বন্ধ হলেই প্রতিরোধ থেমে যায় না। আন্দোলনের সময়ে আহতদের পাশে দাঁড়ানো স্বেচ্ছাসেবীদের যে স্বনিয়ন্ত্রিত সংহতি আমরা দেখেছি, তা রাষ্ট্র বা দল গড়ে দেয়নি—মানুষ নিজেই গড়েছে। মানুষ শিখেছে, প্রতিরোধ সম্ভব; ভয়কে জয় করা যায়। এই উপলব্ধি একবার জন্মালে তা আর মুছে ফেলা যায় না—আর পরাজয়ের অভিজ্ঞতাও পরের লড়াইয়ের প্রস্তুতিকে শক্ত করে। এই পারস্পরিক সহায়তার নৈতিকতা আর জেগে ওঠা কর্তাসত্তাই জুলাইয়ের প্রকৃত উত্তরাধিকার।

সামনের পথ তাই স্পষ্ট। সংস্কারকে এলিট দর-কষাকষি থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে জনপরিসরে; শাসকদের প্রতিশ্রুত মৌলিক সংস্কারে ফিরিয়ে আনতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ-শক্তিকে টেকসই সাংগঠনিক রূপ দিতে হবে; পুনর্গঠন করতে হবে জবাবদিহির প্রতিষ্ঠান; আর সুবিধাবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে কর্মসংস্থানমুখী ও পুনর্বণ্টনমূলক অর্থনীতির দিকে। সর্বোপরি সমাজে উদার, মুক্ত, প্রগতিশীল পরিসরের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও বহুস্বরকে রাজনীতির কেন্দ্রে ফেরাতে হবে। 

কাজী মারুফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক 

(গত ৩১ জুলাই ২০২৬-এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের ‘জুলাইয়ের অর্জন, জুলাইয়ের জিজ্ঞাসা’ অনুষ্ঠানে পঠিত মূল প্রবন্ধের সংক্ষেপিত এবং সম্পাদিত রূপ)

* মতামত লেখকের নিজস্ব