সিরিয়াল কিলার, সমাজের চোখ ও অদৃশ্য ভিকটিম

সম্রাটের ভিকটিমরা ছিলেন একেবারেই ছিন্নমূল মানুষ—ভবঘুরে, আশ্রয়হীন, সমাজের চোখে প্রায় অস্তিত্বহীন।স্ক্রিনশট : সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগ্রহীত

‘সিরিয়াল কিলিং’ আমাদের দেশে তেমন আলোচিত বিষয় নয়। কেউ নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে একই ধরনের পদ্ধতিতে একাধিক মানুষকে হত্যা করলে তাকে সিরিয়াল কিলিং বলা হয়। এমন নয় যে আমাদের দেশে এ ধরনের অপরাধ ঘটে না। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে যত রকম মন খারাপ করা ঘটনা ঘটে, তার ভেতরে সিরিয়াল কিলিংও একটি।

তবু বিষয়টি এখনো অনেকের কাছে বিদেশি, দূরবর্তী কোনো বাস্তবতার মতো। এর পেছনে নানা কারণ আছে। তবে অন্যতম কারণ সম্ভবত এটিই যে বাংলাদেশে সিরিয়াল কিলিংয়ের ভিকটিমরা প্রায় সব সময়ই সমাজের সবচেয়ে গরিব, সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে ‘অদৃশ্য’ মানুষ।

এ দেশে গরিব মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু নতুন কিছু নয়। তারা ফুটপাতে হাঁটতে গিয়ে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়া ইটের আঘাতে মারা যায়। বৃষ্টিভেজা শহরের রাস্তায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। নদী পার হতে গিয়ে লঞ্চডুবিতে মারা যায়। কাজ করতে গিয়ে কারখানার আগুনে পুড়ে মারা যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতার মৌসুমে দলগুলোর কোন্দলে মারা যায়। নামহীন, পরিচয়হীন দেহ হয়ে তারা নিয়মিত নানা ঘটনায় ও দুর্ঘটনায় মারা যায়।

এই মৃত্যুগুলো আমরা সংবাদ হিসেবে দেখি, সামাজিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখি না। ফলে এর মধ্যে কে আবার ধারাবাহিক কোনো খুনির হাতে নিহত হলো—সেদিকে নজর দেওয়ার সামাজিক তাগিদ তৈরি হয় না।

খুনের খবর আমরা সাধারণত খুব দ্রুত পড়ে ফেলি। সকালে পত্রিকা হাতে নিয়ে, কিংবা রাতে মোবাইল স্ক্রল করতে করতে। ‘পাঁচজনকে হত্যা’, ‘ধর্ষণের পর খুন’, ‘লাশ উদ্ধার’—এই শব্দগুলো আমাদের চোখে পড়ে, কিন্তু খুব একটা মনোযোগ কাড়ে না। কারণ, আমাদের জীবনে খারাপ খবরের ভিড় খুব বেশি।

চাঁদপুরের আদালতে রসু খাঁ
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

অপরাধের খবরে আমরা ক্লান্ত। আমরা দুঃসংবাদের শোরগোল চাই না। অথচ বেশির ভাগ খুন ঘটে নীরবে, অনেক সময় আমাদের খুব কাছাকাছি। আমরা গরিব মানুষের মৃত্যু নীরবে এড়িয়ে যাই। আর এই নীরবতার মধ্যেই জন্ম নেয় ধারাবাহিক খুন। কেউ আলাদা করে লক্ষ করি না।

এই বাস্তবতার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ রসু খাঁর ঘটনা। রসু খাঁ কোনো সিনেমার দানব ছিলেন না। তিনি ছিলেন চাঁদপুরের এক সাধারণ মানুষ—দেখতে, চলনে-বলনে আমাদেরই মতো। প্রেমের ভাঙন তাঁকে নারীবিদ্বেষী করে তোলে।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রসু নিজেই বলেছিলেন, প্রেমে ব্যর্থতা থেকে তাঁর ভেতরে নারীদের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়। সেই ক্ষোভই একসময় ভয়ংকর সহিংসতায় রূপ নেয়। তিনি একই কৌশলে একের পর এক নারীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন, ধর্ষণ করেন এবং শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

প্রান্তিক মানুষ বারবার টার্গেট হয়, কারণ সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, আইনি সুরক্ষা ও নাগরিক নজরদারি তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল। তারা নিখোঁজ হলে দ্রুত নজরে আসে না, ফলে অপরাধীরা জানে—এই মানুষদের ক্ষতি করলে প্রশ্ন কম উঠবে।

রসু খাঁর শিকার ছিলেন মূলত গার্মেন্টসের শ্রমজীবী নারীরা। যাঁরা সমাজের সেই অংশ, যাঁদের চলাচলের পথ অনিরাপদ, যাঁদের কর্মঘণ্টা অস্বাভাবিক, যাঁরা নিখোঁজ হলে পরিবার ছাড়া খুব কম মানুষই খোঁজ নেয়। রসু খাঁ অবশ্যই জানতেন, এই নারীরা হারিয়ে গেলে বড় কোনো প্রশ্ন উঠবে না। বাস্তবেও তা–ই হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক নারী নিখোঁজ হয়েছেন, লাশ মিলেছে, কিন্তু আমরা সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখেছি। ধারাবাহিকতা খুঁজিনি। যেন কেউ বারবার দরজায় কড়া নাড়ছে, আর আমরা ভাবছি—হাওয়ার শব্দ। এই কাঠামোগত উদাসীনতা না থাকলে একজন রসু খাঁ দীর্ঘ সময় ধরে হয়তো খুন করে যেতে পারতেন না।

সম্প্রতি সাভারের ‘ভবঘুরে সম্রাট’-এর ঘটনা এই সত্যকে আরও ভয়াবহভাবে সামনে এনে দিয়েছে। সম্রাটের ভিকটিমরা ছিলেন একেবারেই ছিন্নমূল মানুষ—ভবঘুরে, আশ্রয়হীন, সমাজের চোখে প্রায় অস্তিত্বহীন। যাঁদের নাম আমরা জানি না। যাঁদের ঠিকানা নেই। যাঁদের পরিবার নেই বা থাকলেও তাঁরা থানায় গিয়ে নিখোঁজ ডায়েরি করার সক্ষমতা রাখেন না। যেই মানুষগুলো নিখোঁজ হলে পরিসংখ্যানে কোনো হেলদোল হয় না, কোনো সামাজিক উদ্বেগ তৈরি হয় না।

আরও পড়ুন

সম্রাট এই অদৃশ্যতাকেই নিজের নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহার করেছে। সেও হয়তো জানত, এই মানুষগুলো হারিয়ে গেলে কেউ প্রশ্ন করবে না। কেউ ধারাবাহিকতা খুঁজবে না। এখানেই বাংলাদেশের সিরিয়াল কিলিংয়ের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। এ দেশে চিহ্নিত সিরিয়াল কিলিংয়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষমতা, শ্রেণি ও দৃশ্যমানতার আখ্যান।

সিরিয়াল কিলিংয়ের ভিকটিমরা প্রায় সব সময়ই সামাজিকভাবে দুর্বল—শ্রমজীবী নারী, শিশু, প্রান্তিক মানুষ, ভবঘুরে। ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী বা ‘গণ্যমান্য’ শ্রেণির মানুষেরা কখনো এ ধরনের অপরাধের শিকার হননি। অপরাধীরা জানে, কার মৃত্যুতে সমাজ কম প্রশ্ন করবে।

এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি বড় সমস্যা হলো—আমাদের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা। অপরাধ বহুবার ঘটার পর আমরা নড়েচড়ে বসি। সিরিয়াল কিলিং শনাক্ত করার জন্য যে প্রোফাইলিং দরকার, যে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দরকার, নিখোঁজ মানুষের যে সমন্বিত ডেটাবেজ দরকার—এসব এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিরিয়াল কিলার ধরা পড়ে কাকতালীয়ভাবে—চুরি করতে গিয়ে, আগুন লাগাতে গিয়ে, কিংবা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের কল্যাণে।

আরও পড়ুন

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, অপরাধীরা কাকতালীয়ভাবে ধরা পড়ার আগে আমরা কোথায় ছিলাম? প্রথম মৃত্যুতে? দ্বিতীয়টিতে? তৃতীয়টিতে? কেন বুঝতে পারলাম না যে আমাদের আশপাশে যা ঘটছে, তা আর সাধারণ অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই?

এ নিয়ে আলাপ করছিলাম নৃবিজ্ঞানী ড. মঈন জালাল চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশে সিরিয়াল কিলিংকে শুধু খুনির মানসিক বিকৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে একটি স্পষ্ট কাঠামোগত বাস্তবতা আছে।

প্রান্তিক মানুষ বারবার টার্গেট হয়, কারণ সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, আইনি সুরক্ষা ও নাগরিক নজরদারি তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল। তারা নিখোঁজ হলে দ্রুত নজরে আসে না, ফলে অপরাধীরা জানে—এই মানুষদের ক্ষতি করলে প্রশ্ন কম উঠবে।

ড. মঈন জালাল চৌধুরীর মতে উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার ভাষাও মূলত মূলধারার নাগরিককে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। সেখানে প্রান্তিক মানুষের জীবন প্রায়ই কেবল একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকে। এর ভেতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাঠামোটি কাজ করে, তা হলো লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য। সমাজে কিছু দেহকে স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে ধরা হয়।

এই তালিকার প্রথমেই থাকে নারীর দেহ, এরপর শিশু এবং প্রান্তিক পুরুষ। নারীর দেহকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, নৈতিক বিধিনিষেধ ও সহিংসতার ইতিহাস এই আক্রমণকে ব্যতিক্রম নয়, বরং কাঠামোগতভাবে স্বাভাবিক করে তোলে।

এই কারণে সিরিয়াল কিলিংয়ের শিকার বারবার প্রান্তিক নারী, ভবঘুরে বা গৃহহীন মানুষ হলে সেটিকে কাকতালীয় বলা যায় না। এই বাস্তবতা না বুঝলে সিরিয়াল কিলিংকে শুধু ব্যক্তিগত বিকৃতি হিসেবে দেখা হবে। কিন্তু কাঠামো অক্ষত থাকলে, ঝুঁকিতে থাকা মানুষও বদলাবে না।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধবিদ্যা ও ভিকটিম তত্ত্বের গবেষণায়ও উঠে এসেছে, সিরিয়াল কিলাররা প্রায়ই সমাজের সেই মানুষদের লক্ষ্য করে, যাদের সামাজিক সুরক্ষা কম, যাদের নিখোঁজ হওয়া দেরিতে বা কখনোই নথিভুক্ত হয় না এবং যাদের মৃত্যুকে সমাজ তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেয়।

কানাডার সমাজবিজ্ঞানী কেভিন হ্যাগার্টি ও আরিয়ানে এলারব্রক ২০১১ সালে প্রকাশিত তাঁদের গবেষণায় দেখান, ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড মোটেও ‘এলোপাতাড়ি’ অপরাধ নয়। বরং অপরাধীরা সচেতনভাবেই এমন ভিকটিম বেছে নেয়, যাদের সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল এবং যাদের ক্ষেত্রে কার্যকর সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি অনুপস্থিত।

গবেষকেরা এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘অপরচুনিটি স্ট্রাকচার’ বা ‘সুযোগভিত্তিক কাঠামো’ ধারণার মাধ্যমে। যেখানে অপরাধীর প্রণোদনা, সহজলভ্য ভিকটিম এবং কার্যকর পাহারার অভাব একসঙ্গে কাজ করে।

আমেরিকান অপরাধবিদ স্টিভেন এ এগার তাঁর ২০০৩ সালের গ্রন্থ দ্য নিড টু কিল: ইনসাইড দ্য ওয়ার্ল্ড অব দ্য সিরিয়াল কিলার-এ ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ভিকটিমদের একটি শ্রেণিকে বর্ণনা করেছেন ‘দ্য লেস ডেড’ বা ‘কম মূল্যবান মৃত’ নামে।

তাঁর বিশ্লেষণে দেখা যায়, যৌনকর্মী, গৃহহীন, ভবঘুরে, অভিবাসী শ্রমিক বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষদের নিখোঁজ হওয়া সমাজে তেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না।

এই কারণেই অপরাধীরা তাদের ‘নিরাপদ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করে। এই পর্যবেক্ষণকে পরিসংখ্যানগতভাবে শক্ত ভিত্তি দেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ক্রিস্টেন কুইনেট।

কুইনেট ২০১১ সালে হোমিসাইড স্টাডিজ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় (১৯৭০-২০০৯ সময়কাল) দেখান, সামগ্রিকভাবে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমলেও, যেসব ঘটনা ঘটে সেগুলোতে যৌনকর্মী ও অন্যান্য প্রান্তিক নারীর ভিকটিম হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।

তাঁর গবেষণায় আরও দেখা যায়, এই ধরনের ভিকটিমদের ক্ষেত্রে অপরাধীরা দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকতে পারে, কারণ তদন্ত শুরু হতে দেরি হয় এবং সামাজিক চাপ কম থাকে।

মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের ২০০৫ সালের গবেষণা প্রতিবেদন সিরিয়াল মার্ডার: পাথওয়েজস ফর ইনভেস্টিগেশনস-এও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়, গৃহহীন ও যৌনকর্মীরা ‘হাই-রিস্ক ভিকটিম’ বা ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ভুক্তভোগী’ হিসেবে বিবেচিত, কারণ তাঁদের জীবনযাপন অনির্দিষ্ট, অনেক সময় তাঁদের অবস্থান নির্দিষ্ট থাকে না এবং তাঁদের নিখোঁজ হওয়া দ্রুত আইনি সতর্কতা তৈরি করে না।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বলছে, সিরিয়াল কিলিং সরাসরি সামাজিক দৃশ্যমানতা, শ্রেণিবৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। যাদের জীবনকে সমাজ কম মূল্য দেয়, তারাই এই অপরাধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকে।

বাংলাদেশে চিহ্নিত সিরিয়াল কিলিং এখনো বিরল—এটাই আমাদের একমাত্র স্বস্তি। কিন্তু সমাজের সব স্তরেই যদি আমরা মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিরাপত্তার চাদর বিস্তৃত করতে না পারি, তাহলে এমন নৃশংসতা আর হয়তো ‘বিরল’ শব্দে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

  • সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব