মতামত
বাংলাদেশে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ কেন প্রয়োজন
রাজনৈতিক গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক গণতন্ত্র দুটোই আমাদের অর্থনৈতিক অন্তরায়গুলো মোকাবিলা করার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। বাংলাদেশে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ কেন প্রয়োজন, সেই বিষয়ে লিখেছেন সেলিম জাহান
‘গণতন্ত্র’ ধারণাটিকে আমরা সাধারণত রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সঙ্গেই সমার্থক মনে করি। কিন্তু রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সীমানা পেরিয়ে গণতন্ত্রের নানাবিধ মাত্রিকতা আছে—যেমন অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, সামাজিক গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক গণতন্ত্র ইত্যাদি। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে যে এটি গণতন্ত্রের অন্যান্য মাত্রিকতাকেও প্রভাবিত করে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রত্যেক মানুষের জন্য সামষ্টিক সক্রিয়তার ক্ষেত্রটিকে সমান করে দেয়।
সুতরাং এটা পরিষ্কার যে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি অর্থনৈতিক সমতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। সে জন্য প্রয়োজন সর্বক্ষেত্রে সমান সুযোগের। সেই সুযোগ গ্রহণের জন্য প্রত্যেক মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক সামাজিক সেবাগুলোতে প্রত্যেক নাগরিকের সমান প্রবেশাধিকার।
কিন্তু সামাজিক সেবাগুলোতে অধিকারকে শুধু পরিমাণগত দিক থেকে দেখলে চলবে না, তাকে নিশ্চিত করতে হবে গুণগত দিক দিয়ে। মানসম্পন্ন শিক্ষা, সুব্যবস্থামূলক স্বাস্থ্য সবার কাছে লভ্য করে দিতে হবে। সক্ষমতা গঠিত হলে পরে ভূমি, ঋণ, আর্থিক সম্পদ, কর্মনিয়োজন সুযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি–সুবিধার মতো উৎপাদনকেন্দ্রিক উপকরণে প্রত্যেক নাগরিকের সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বনাঞ্চল, জলাশয় এবং অন্যান্য পরিবেশভিত্তিক যেসব যৌথ সম্পদ রয়েছে, সেখানেও সমাজের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার থাকা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বশাসন সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। যেসব সিদ্ধান্ত নাগরিকদের জীবনের ওপরে প্রভাব ফেলে, সেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশগ্রহণ অবশ্যই থাকতে হবে এবং সেসব অংশগ্রহণ লোক দেখানো হলে চলবে না, সেগুলো কার্যকর অংশগ্রহণ হতে হবে।
অনেক সময়েই এ জাতীয় প্রক্রিয়ায় দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের অংশগ্রহণ প্রতীকী পর্যায়েই থেকে যায় এবং সেখানে তাঁদের কণ্ঠস্বর অনুপস্থিত থাকে। আলোচনা প্রক্রিয়ায় মানুষের সমপ্রতিনিধিত্ব ভিন্ন সমাজের সাধারণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় না। অর্থনৈতিক বিতর্ক, আলোচনা ও কথাবার্তায় এবং সেই সঙ্গে নীতিবিষয়ক সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব এবং অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়, যা ভিন্ন অর্থনৈতিক গণতন্ত্র বজায়ক্ষম হয় না।
তৃতীয়ত, দেশের সব নাগরিকের জন্য সুফলের সমতার নিশ্চিতকরণও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের একটি অত্যাবশ্যকীয় মাত্রিকতা। যদি সক্ষমতা ও সুযোগের ক্ষেত্রে সম–অধিকার নিশ্চিত করা হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমপ্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে একটি দেশের প্রতিটি গোষ্ঠীই সমভাবেই লাভবান হবে।
এ সত্ত্বেও একটি সমাজে বৃদ্ধ গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতো নানা গোষ্ঠী থাকবে, যাদের কল্যাণের জন্য সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যমুখী নানা ব্যবস্থা থাকতে হবে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে সামাজিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো নানা ব্যবস্থা।
২.
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রকে সর্বজনীন মানবাধিকার এবং মানব নিরাপত্তাকেও তার কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। ধর্মীয় বিশ্বাস, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং আত্মপরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও আইনের বলয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে। সেই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেকের নিরাপত্তা বিধান রাষ্ট্রের কর্তব্য।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের চালচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এ দেশের বিভিন্ন বলয়ে, যেমন আঞ্চলিক দিক থেকে, কিংবা নানা আর্থসামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে, গ্রাম ও নগরের মধ্যে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে সুগভীর অসমতা ও বৈষম্য বিদ্যমান। সেই সঙ্গে বলা দরকার, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দারিদ্র্য এবং অসমতা দুটোই বেড়েছে। যেমন এ দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর অনুপাত ১৮ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে অসমতা ও বৈষম্য—সুযোগের এবং ফলাফলেরও।
আমাদের অর্জনের সুফল সমভাবে বণ্টিত হয় না অঞ্চলের মধ্যে, না গ্রাম-শহরের মধ্যে, না বিভিন্ন আর্থসামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে। যেমন বাংলাদেশের উচ্চতম ১০ শতাংশের হাতে দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ রয়েছে, যেখানে দেশের নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ (দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক) মাত্র ৪ শতাংশ ভোগ করে। তেমনি দেশের নিচের দিকের ৪০ শতাংশ মানুষ জাতীয় আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ লাভ করে, যেখানে উচ্চতম ১০ শতাংশ পেয়ে যায় জাতীয় আয়ের ৩৮ শতাংশ।
একই রকম ভিন্নতা আছে মানব উন্নয়নেও। যেমন অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশুমৃত্যুর হার দেশের উচ্চতম আয়ের পরিবারে যেখানে হাজারে ২০, সেখানে নিম্নতম আয়ের পরিবারে সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটি হচ্ছে ৫০। বরিশালে বয়স্ক সাক্ষরতার হার যেখানে ৭৫ শতাংশ, সিলেটে তা ৬০ শতাংশ মাত্র। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বৈষম্য বেশ গভীর। শিক্ষার বলয়ে একটি ত্রিধারার শিক্ষাকাঠামো—সাধারণ জনগণের জন্য সুবিধারহিত সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা, ধনিক শ্রেণির জন্য উচ্চ সুবিধাসম্পন্ন বেসরকারি শিক্ষাকাঠামো এবং ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির বিভাজিত চাহিদা মেটানো হয়।
যেহেতু বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণিস্তরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, সুতরাং এই বিভাজিত শিক্ষাকাঠামো সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তোলে। তেমনিভাবে স্বাস্থ্যসেবার খাতেও একটি ত্রিধারা কাঠামোর কারণে বাংলাদেশে একটি বৈষম্যমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিম্নমানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসুবিধা এবং সেবা পাচ্ছে এবং উচ্চমানসম্পন্ন সেবাগুলো লভ্য হচ্ছে উচ্চবিত্তের মানুষগুলোর কাছে।
তথ্যপ্রযুক্তি–সেবার ক্ষেত্রে উচ্চতম ২০ শতাংশ গৃহস্থালিতে তিন-চতুর্থাংশ গৃহের তথ্যপ্রযুক্তি–সুবিধায় লভ্যতা আছে, কিন্তু নিম্নতম ২০ শতাংশ গৃহস্থালির জন্য সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটি হচ্ছে ৯ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে মাত্র ৩ শতাংশ বাড়িতে কম্পিউটার আছে এবং গ্রামের ৭৮ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করতে জানে না।
সুযোগ এবং ফলাফলের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য বাংলাদেশে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের পথে একটি বিরাট বাধা। এ দেশে মাত্র ৩৬ শতাংশ নারী শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করে থাকেন, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ৮১ শতাংশ এবং মধ্যস্তরের ব্যবস্থাপনায় মেয়েদের অনুপাত মাত্র ১২ শতাংশ। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ হচ্ছে মাত্র ১৭ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের জন্য সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটি হচ্ছে ৩৩ শতাংশ।
নারীর প্রতি বৈষম্য এবং তার বিরুদ্ধে সহিংসতা বাংলাদেশি সমাজের অসমতার একটি অন্যতম বাস্তবতা। সুযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা বৈষম্যের শিকার হয়, যা প্রতিফলিত হয় ফলাফলে। ঘরে-বাইরে নানাবিধ হয়রানি আর সহিংসতার শিকার হয় নারীরা। সেসব নির্যাতনের অংশ হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, গৃহাভ্যন্তরের সহিংসতা এবং ধর্ষণ।
৩.
অসমতা বা বৈষম্য তো শুধু অর্থনৈতিক নয়, তা ব্যাপ্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বলয়েও। বৈষম্য শুধু ফলাফলে নয়, তা পরিস্ফুট সুযোগেও। দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য–সুবিধাবঞ্চিত। তাঁরা বঞ্চিত সম্পদে, ঋণসুবিধায়, তথ্যপ্রযুক্তি–সেবায়। ফলে কর্মনিয়োজন এবং আয়ের দিক থেকেও তাঁরা বঞ্চনার শিকার হন।
রাজনৈতিক দিক থেকে বঞ্চিত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, আদিবাসীদের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব জাতীয় পর্যায়ের নানা দিকে নিতান্ত সীমিত। সমাজ অঙ্গনে ধর্মীয় বৈষম্যের কথা বারবার নানা আলোচনায় উঠে এসেছে।
কিন্তু এতত্সত্ত্বেও বাংলাদেশে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এই গণতন্ত্রায়ণের জন্য কতকগুলো মৌলিক ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। প্রথমত, সব মানববঞ্চনাকে বিবেচনার মধ্যে এনে, অর্থনৈতিক নীতিমালাকে সাম্যভিত্তিক করতে হবে। এসব নীতিমালাকে দরিদ্র এবং বঞ্চিত মানুষমুখী করা প্রয়োজন। সুতরাং অর্থনৈতিক গণতন্ত্রকে মাথায় রেখে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিমালা কাঠামো তৈরি করতে হবে।
এই কাঠামোর মধ্যে শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানির লভ্যতার মতো মৌলিক সামাজিক সেবাগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। দরিদ্রবান্ধব আর্থিক নীতি, কর ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাজস্ব নীতি, এবং সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোকে প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন সম্পদের বলয়টিকে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রমুখী করা সম্ভব। এককথায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি কৌশল বাংলাদেশে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণে অবদান রাখতে পারে।
মনে রাখা দরকার, রাজনৈতিক গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক গণতন্ত্র দুটোই আমাদের অর্থনৈতিক অন্তরায়গুলো মোকাবিলা করার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। রাজনৈতিক নিশ্চয়তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং একটি রাজনৈতিক দিকদর্শন আমাদের অর্থনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক গতিময়তার জন্য অপরিহার্য। নির্বাচন-পরবর্তী জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচিত সরকারকে এগুলো নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জনগোষ্ঠীর যে অংশ দুর্বল এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না, তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। এসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বৃদ্ধ মানুষ, প্রতিবন্ধী গোষ্ঠী, যাঁরা পরিবেশ-নাজুক এলাকায় বসবাস করেন, শিশুরা। সামাজিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে এসব জনগোষ্ঠীর কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়।
তৃতীয়ত, দেশের শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে বৈষম্যনিরোধী ও সাম্যবান্ধব হতে হবে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মূল্যবোধকে ধারণ করতে হবে।
এসব মূল্যবোধের মধ্যে থাকবে দৃশ্যমানতা এবং দায়বদ্ধতার একটি জোরালো কাঠামো। এ কাঠামোর একটি বিশেষ মাত্রিকতা হবে একটি দৃঢ় নিরীক্ষণ ও মূল্যায়নব্যবস্থা, যার জন্য প্রয়োজন হবে একটি শক্তিমান বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান কাঠামো।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রভিত্তিক করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার লাগবে। এই সংস্কারের একটি দিক হবে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপরে বিশ্বাসযোগ্য জোরালো বিভাজিত উপাত্ত।
৪.
মনে রাখা দরকার, রাজনৈতিক গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক গণতন্ত্র দুটোই আমাদের অর্থনৈতিক অন্তরায়গুলো মোকাবিলা করার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। রাজনৈতিক নিশ্চয়তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং একটি রাজনৈতিক দিকদর্শন আমাদের অর্থনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক গতিময়তার জন্য অপরিহার্য। নির্বাচন-পরবর্তী জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচিত সরকারকে এগুলো নিশ্চিত করতে হবে।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, একটি নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের একটি আবশ্যকীয় শর্ত, কিন্তু একটি পর্যাপ্ত শর্ত নয়। সেই পথযাত্রার রূপরেখা তৈরির জন্য নির্বাচিত সরকারের যেমন অঙ্গীকার এবং অগ্রাধিকার লাগবে, তেমনি দরকার হবে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ।
একটি স্বচ্ছ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেই অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে না, দারিদ্র্য এবং বৈষম্য কমে যাবে না এবং মানুষের জীবনের উন্নতি হবে না। সে প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় নয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
নির্বাচিত সরকারকে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের কিছু মৌলিক বিষয়ে নজর দিতে হবে। প্রথমত, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র নিশ্চিত করার জন্য যথোপযুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং একটি দৃশ্যমানতা ও দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে বিভিন্ন মেয়াদের বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার।
অর্থনৈতিক নীতিমালাগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে সব ধরনের সম্পদ, উৎপাদন উপকরণ ও সামাজিক সেবায় সমতাসম্পন্ন সাম্যমূলক অধিকার প্রতিটি নাগরিকের থাকে। সেই সঙ্গে যে বিষয়গুলো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতির পরিপন্থী হিসেবে কাজ করেছে সেগুলোকে প্রতিহত করতে হবে।
সমাজে ত্রাস, আশঙ্কা এবং আতঙ্কের যে একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাকে দূর করা দরকার। বলা বাহুল্য, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া দেশে রাজনৈতিক গণতন্ত্র বজা রাখা যাবে না, বাংলাদেশের সমাজও বৈষম্যমুক্ত হবে না। বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের এসব বিষয়কে বিবেচনার মধ্যে আনতে হবে এবং দেশের আগামী পথযাত্রার নীলনকশায় সেগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সেলিম জাহান সাবেক পরিচালক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ
*মতামত লেখকের নিজস্ব