বাংলাদেশের অভিবাসনের গল্পগুলো সাধারণত একটি পরিচিত দ্বৈত কাঠামোর মধ্যেই বলা হয়। একদিকে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিক। অন্যদিকে রয়েছে উচ্চশিক্ষা বা দক্ষ পেশায় কাজের উদ্দেশ্যে পশ্চিম ইউরোপ কিংবা উত্তর আমেরিকায় পাড়ি জমানো উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিরা। কিন্তু এই দুই সুপরিচিত অভিবাসন করিডরের মাঝখানে রয়েছে আরেকটি পথ—তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত, অথচ ক্রমবর্ধমান—মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে অভিবাসন।
এই অভিবাসন করিডরের সূচনা ১৯৭০ ও ১৯৮০–এর দশকে, যখন পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শুরু করে। তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড বা বেলারুশের মতো দেশগুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করত। পড়াশোনা শেষ করার পর তাঁদের অনেকেই বাংলাদেশে ফিরে আসেন, আর অল্পসংখ্যক বাংলাদেশি সেখানেই থেকে যান এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে বাংলাদেশি প্রবাসী সম্প্রদায়ের পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন।
গত এক দশকে এই অঞ্চলে অভিবাসন নীরবে বাড়তে থাকে এবং এখন একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পোল্যান্ড, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি কিংবা চেক প্রজাতন্ত্রের মতো মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্য, ক্রমবর্ধমান শ্রমবাজার এবং শ্রমিক–সংকট এশিয়ার অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করছে। বাংলাদেশি, নেপালি ও ভারতীয়রা এই শ্রমঘাটতি পূরণে দৃশ্যমান অভিবাসী গোষ্ঠীগুলোর একটি হয়ে উঠেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শুধু পোল্যান্ডেই বৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশির সংখ্যা ২০১৪ সালে ১৬০ জন থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৬ হাজারের বেশি দাঁড়িয়েছে।
মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে যাওয়া অনেক বাংলাদেশিই পশ্চিম ইউরোপের ধনী অর্থনীতিতে পাড়ি জমানো উচ্চ দক্ষ পেশাজীবী নন, আবার উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের শ্রমবাজারের অংশও নন। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে সেখানে যান, যেখানে শিক্ষার ব্যয় তুলনামূলক কম এবং ভিসাপ্রক্রিয়াও পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় সহজ। অন্যরা শ্রমিক হিসেবে নির্মাণ, উৎপাদনশিল্প, কৃষি, লজিস্টিকস ও সেবা খাতে কাজ করেন, যেখানে শ্রমিকের ঘাটতি তীব্র। আবার অনেক অভিবাসীর কাছে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ একধরনের ‘সোপান’ হিসেবেও কাজ করে, যেখান থেকে তাঁরা ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ ইউরোপীয় দেশগুলোয় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
তবে এই ক্রমবর্ধমান অভিবাসন সত্ত্বেও গন্তব্য দেশগুলোতে কিংবা বাংলাদেশে অভিবাসন নীতি–সংক্রান্ত আলোচনায় এই অভিবাসীরা প্রায় অনুপস্থিত। ২০১১ সালে সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পর এবং ইউরোপের বহু সরকার যাকে ‘শরণার্থী সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, তার প্রেক্ষাপটে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশ অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়। অনিয়মিত অভিবাসনকে মূলত নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হতে থাকে। অন্যদিকে নিয়মিত শ্রম অভিবাসন—যা ক্রমেই বাড়ছে—রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের আলোচনায় তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে গেছে।
ইউরোপীয় রাজনীতিবিদেরা যখন অভিবাসন নিয়ে কথা বলেন, তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে অবৈধ বা অনিয়মিত উপায়ে সীমান্ত অতিক্রম করে আসা অভিবাসীরা। আর যখন ইউরোপের শ্রমবাজারের প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা হয়, তখন গুরুত্ব পায় ‘উপযুক্ত যোগ্যতা’ ও দক্ষ অভিবাসী আকর্ষণের বিষয়টি। রাজনৈতিক বক্তব্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার এই ফাঁক দীর্ঘদিন ধরেই উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অভিবাসন বিতর্ককে প্রভাবিত করে আসছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসীদের জন্য এর ফলে তৈরি হয়েছে এক জটিল পরিস্থিতি—যেখানে সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি অনিশ্চয়তাও কম নয়।
বাংলাদেশের অভিবাসন বর্ণনায় মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ এখনো প্রান্তিক বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এই ধারণা দ্রুতই সেকেলে হয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক শ্রম চলাচলের ধারা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই গন্তব্যগুলোও ক্রমশ আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠছে।
প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থাপনা। প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের দুর্বলতা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার অপর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ নতুন গন্তব্যে শ্রম অভিবাসনকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন করে তোলে। ফলে অনেক অভিবাসীকেই অনানুষ্ঠানিক বা দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত নিয়োগ চ্যানেলের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা তাঁদের জন্য অভিবাসনের ঝুঁকি ও ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশি নাগরিকদের বারবার ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা—এবং ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি প্রধান উৎস দেশে পরিণত হওয়া—দেশের অভিবাসন শাসনব্যবস্থা ও সুরক্ষাকাঠামোর গুরুতর দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষতার ঘাটতি। অনেক বাংলাদেশি অভিবাসীর মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত বা কারিগরি দক্ষতা নেই। এই অমিল তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করে এবং অনিশ্চিত বা স্বল্প বেতনের কাজের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কূটনৈতিক উপস্থিতিও এসব দেশগুলোতে অনেকটা সীমিত। চেক প্রজাতন্ত্র ও রোমানিয়াসহ মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই।
ফলে কনস্যুলার সেবা অনেক ক্ষেত্রেই অস্থায়ী বা সীমিত ভিত্তিতে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৯টি দেশের মধ্যে মাত্র নয়টির বাংলাদেশে কূটনৈতিক বা কনস্যুলার উপস্থিতি রয়েছে। অধিকাংশ ইউরোপীয় দূতাবাস ভারতে অবস্থিত হওয়ায় সম্ভাব্য অভিবাসীদের সঠিক তথ্য পাওয়া এবং ভিসা বা অন্যান্য কনস্যুলার সহায়তা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে অভিবাসনের মতো মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে শ্রম অভিবাসন সাধারণত ভর্তুকিপ্রাপ্ত নয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বেশি লাগে, যা অভিবাসী ও সেবা প্রদানকারীদের জন্য আর্থিক চাপ বাড়ায়। একই সঙ্গে এই করিডর তুলনামূলক নতুন হওয়ায় সেখানে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি কমিউনিটি বা সামাজিক নেটওয়ার্কও খুব কম, যার ওপর নতুন অভিবাসীরা নির্ভর করতে পারেন।
সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশও কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কয়েকটি দেশে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য এখনো শক্তিশালী এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা কখনো কখনো সন্দেহ বা বৈষম্যের মুখে পড়েন। এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বিস্তৃত ‘নিরাপত্তা’ বা সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থার আওতায় পুলিশি নজরদারির মুখোমুখি হয়েছেন।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং স্থানীয় শ্রমিকদের পশ্চিম ইউরোপে চলে যাওয়ার কারণে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি অর্থনীতিতে শ্রমিক–সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
এই গন্তব্যগুলোতে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ আরও উন্নতি করতে পারে। নিয়োগব্যবস্থাকে পেশাদার করা এবং প্রশিক্ষণ জোরদার করা হলে ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো হতে পারে। ভাষাজ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা এবং শ্রম অধিকার সম্পর্কে ধারণা নিয়ে অভিবাসীরা গেলে তাঁরা গন্তব্য দেশের শ্রমবাজারে আরও সফলভাবে একীভূত হতে পারবেন।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং পেশাদার নিয়োগসেবার সক্ষমতা তুলে ধরলে বাংলাদেশিদের শুধু ‘সস্তা শ্রমশক্তি’ বা একমাত্রিক মুসলিম জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখার প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের অভিবাসন বর্ণনায় মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ এখনো প্রান্তিক বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এই ধারণা দ্রুতই সেকেলে হয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক শ্রম চলাচলের ধারা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই গন্তব্যগুলোও ক্রমশ আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠছে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য তাই এই করিডরকে প্রান্তিক নয়, বরং কাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের উচিত উন্নত অভিবাসন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, কূটনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং অভিবাসীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা।
বছরের পর বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশ এখন এক রূপান্তরের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। দেশ যখন স্থিতিশীলতা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নিজের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণের চেষ্টা করছে, তখন অভিবাসন কূটনীতিকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের মতো উদীয়মান গন্তব্যকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এই পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য অভিবাসীদের প্রস্তুত করা একটি দূরদর্শী অভিবাসন নীতির জন্য অপরিহার্য, যা একই সঙ্গে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অংশীদারত্বও শক্তিশালী করবে।
ড. আনাস আনসার, সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
ড. জ্বিবনেক মুচা জ্যেষ্ঠ গবেষক, ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট, চেক একাডেমি অব সায়েন্সেস
মতামত লেখকদের নিজস্ব