একজন সম্ভাব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেডি ভ্যান্স এখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এক অস্বস্তিকর ও জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছেন। গত এক সপ্তাহে তিনি এমন তিনটি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছেন, যেগুলোর কোনোটিই তাঁর নিজের বেছে নেওয়া ছিল না, এবং যেগুলোয় জয়ের সম্ভাবনাও ছিল ক্ষীণ।
ইরানের সঙ্গে ব্যর্থ কূটনৈতিক আলোচনা, হাঙ্গেরির নির্বাচনে অপদস্থ হওয়ার অবস্থা এবং পোপের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক—এ তিন ঘটনাই তাঁকে সমালোচনা, অপমান ও উপহাস এনে দিয়েছে। আর সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যাঁর হয়ে লড়তে গিয়ে ভ্যান্স আজ নিজেই চাপে পড়ে গেছেন।
ভ্যান্সের সমস্যার মূল এখানেই। তিনি এমন এক আনুগত্যের রাজনীতিতে আটকে পড়েছেন, যার বিনিময়ে খুব কমই পাওয়া যায়। বরং তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত কমছে, জনমত জরিপে অবস্থান খারাপ হচ্ছে এবং ‘মাগা’ ঘরানার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দৌড়ে তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের দায়ও ভ্যান্সের ওপর এসে পড়ছে, যদিও অনেক সময় তাঁর নিজের মন্তব্য ও আচরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তবু বাস্তবতা হলো—হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের পরেই তাঁর অবস্থান। ফলে তাঁকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার সুযোগও নেই।
এ অবস্থায় একটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে আসে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে ভ্যান্স কি ট্রাম্পের হয়ে দায় কাঁধে নিয়েই এগোবেন? নাকি এমন এক সময় আসবে, যখন নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাঁচাতে তাঁকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হবে?
ইতিহাসে এমন পরিস্থিতির তুলনা টানা যায়—রোমান সম্রাট ক্যালিগুলার সময় ক্লডিয়াসের বেঁচে থাকা কিংবা জুলিয়াস সিজারের বিরুদ্ধে ব্রুটাসের বিদ্রোহের সঙ্গে। প্রশ্ন হলো, ভ্যান্স কোন পথ বেছে নেবেন?
ট্রাম্পের সঙ্গে আনুগত্যের সম্পর্ক যে একমুখী, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। তার আগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের পরিণতি এখনো তাজা। ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল আটকে দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় পেন্সকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করেছিলেন ট্রাম্প। এমনকি ক্যাপিটল হিলে হামলাকারীদের মধ্যে কেউ কেউ পেন্সকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে ফাঁসিতে ঝোলানোর দাবি তুললে ট্রাম্প তাতে আপত্তি করেননি বলেই অভিযোগ রয়েছে। ফলে এটি স্পষ্ট—প্রয়োজনে ট্রাম্প নিজের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীকেও মুহূর্তে বলির পাঁঠা বানাতে পারেন। এ বাস্তবতা ভ্যান্সের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।
তবে ভ্যান্স নিজেও খুব স্থির নন। রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান বারবার বদলেছে। একসময় তিনি ট্রাম্পের কড়া সমালোচক ছিলেন, এমনকি তাঁকে ‘আমেরিকার হিটলার’ হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলেন। মাগা রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন, অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান নেন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের বিতর্কিত বক্তব্যও (যেমন হাইতির অভিবাসীদের নিয়ে অদ্ভুত অভিযোগ) সমর্থন করেন।
পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও ভ্যান্সের অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলেছে। একসময় বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করলেও এখন তিনি ভেনেজুয়েলা, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া ও ইরানের মতো দেশে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন।
২০১৯ সালে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণের পর ধর্মীয় ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করলেও গির্জা ও পোপের মতামত নিয়ে প্রায়ই ভ্যান্স উদ্ধত ভঙ্গিতে মন্তব্য করেন। এটি তাঁর অবস্থানকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সব মিলিয়ে ভ্যান্সের রাজনৈতিক চরিত্রে একটি স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তা হলো—সুযোগ বুঝে অবস্থান বদলানোর প্রবণতা। অনেকেই তাঁকে একধরনের সুযোগসন্ধানী নেতা হিসেবে দেখেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। ট্রাম্প তাঁকে সহজে বরখাস্ত করতে পারবেন না। কারণ, তিনি নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী অনুযায়ী প্রয়োজনে ভ্যান্স নিজেই ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারেন।
কংগ্রেসের কিছু ডেমোক্র্যাট ইতিমধ্যেই এমন একটি কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে ভ্যান্সের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ অবস্থায় ভ্যান্স চাইলে নিজের অবস্থান পুনর্গঠন করতে পারেন। তিনি নিজেকে ট্রাম্পের এমন একজন উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, যিনি মাগা আদর্শে বিশ্বাসী কিন্তু তুলনামূলকভাবে স্থির ও সংযত। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সাহস, দূরদৃষ্টি এবং সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় তিনি নিজেই খুব শক্তিশালী বা আত্মবিশ্বাসী নেতা হিসেবে প্রমাণিত হননি; বরং তাঁকে অনেক সময় দুর্বল, অপরিণত, রাগান্বিত এবং সহজে প্রভাবিত হওয়া ব্যক্তি হিসেবেই দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভ্যান্সের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। হাঙ্গেরির নির্বাচনে ভিক্টর অরবানের পক্ষে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। কারণ, ট্রাম্প নিজে অরবানের পরাজয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে চাননি। কিন্তু এই সফর কোনো ইতিবাচক ফল আনেনি; বরং অরবানের পরাজয় ইউরোপের ডানপন্থী, জাতিগত জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জাতীয়তাবাদী ধারার সঙ্গে ভ্যান্স নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বিতর্কিত বক্তৃতা দেওয়ার পর তিনি এ ধারায় বেশি জড়িয়ে পড়েছিলেন।
এর পাশাপাশি ইসলামাবাদে ইরান নিয়ে আলোচনা ছিল আরেকটি বড় ব্যর্থতা। এ আলোচনা একদিনে সফল হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনাই ছিল না। ট্রাম্পের কৌশলগত অজ্ঞতা এবং ইরানের দৃঢ় অবস্থান এ ব্যর্থতার মূল কারণ। কিন্তু আলোচনায় ভ্যান্সের ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করে দেয়। তাঁর কোনো কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই, ইরান সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত জ্ঞানও সীমিত। ফলে তাঁকে বারবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এতে তাঁর দুর্বলতা প্রকাশ পায় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ট্রাম্পের ব্যর্থতার মুখ হয়ে দাঁড়ান।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে পোপ লিওকে ঘিরে। ট্রাম্প যখন পোপের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন, তখন প্রশাসনের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ ক্যাথলিক হিসেবে ভ্যান্সের কাছ থেকে ভিন্ন অবস্থান আশা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি উল্টো পোপের বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন এবং তাঁকে ‘নৈতিকতার বিষয়ে সীমাবদ্ধ’ থাকার পরামর্শ দেন। যুদ্ধ ও শান্তিকে নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে অস্বীকার করা যে কতটা অযৌক্তিক, তা বোঝা কঠিন নয়। এ মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খ্রিষ্টানদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
এরপরও বিতর্ক থামেনি। ট্রাম্পের একটি আপত্তিকর ছবি (যেখানে তাঁকে যিশুখ্রিষ্টের মতো উপস্থাপন করা হয়) নিয়ে সমালোচনা হলে ভ্যান্স সেটিকে ‘মজা’ বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু এ ধরনের ব্যাখ্যা সাধারণত তখনই দেওয়া হয়, যখন আপত্তিকর আচরণের দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
অন্যদিকে পোপ লিও ‘কয়েকজন স্বৈরশাসকের’ কারণে বিশ্বের ক্ষতির কথা উল্লেখ করে পরোক্ষভাবে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের সমালোচনা করেন।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে ট্রাম্প ক্রমেই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংকটে ডুবে যাচ্ছেন। জনমতের ঢেউ তাঁর বিরুদ্ধে উঠছে। অনেকে তাঁর মানসিক স্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। যদিও তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে দাবি করেন, তবু সাধারণ মানুষের চোখে তাঁর আচরণ অস্থির ও বিচক্ষণতাহীন বলে মনে হচ্ছে।
এ অবস্থায় ভ্যান্স চাইলে নিজের অবস্থান পুনর্গঠন করতে পারেন। তিনি নিজেকে ট্রাম্পের এমন একজন উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, যিনি মাগা আদর্শে বিশ্বাসী কিন্তু তুলনামূলকভাবে স্থির ও সংযত। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সাহস, দূরদৃষ্টি এবং সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় তিনি নিজেই খুব শক্তিশালী বা আত্মবিশ্বাসী নেতা হিসেবে প্রমাণিত হননি; বরং তাঁকে অনেক সময় দুর্বল, অপরিণত, রাগান্বিত এবং সহজে প্রভাবিত হওয়া ব্যক্তি হিসেবেই দেখা গেছে।
তবু ভ্যান্সের সামনে সময় রয়েছে। মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি চাইলে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারেন। রাষ্ট্রনায়কসুলভ আচরণ, সংযম এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা—এই গুণগুলো অর্জন করতে পারলে ভবিষ্যতে তাঁর জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু এই পথ মোটেও সহজ নয়। অলৌকিক ধরনের পরিবর্তন ছাড়া এটি সম্ভবও নয়।
সাইমন টিসডাল দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাষ্যকার।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ