ইরান যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনা যেন এক অদ্ভুত নাট্যজগতে পরিণত হয়েছে। বাস্তব খবরের চেয়ে সেখানে এখন বেশি জায়গা নিচ্ছে কল্পনা, অনুমান আর নাটকীয় গল্প।
এক মুহূর্তে পাঠকদের বলা হচ্ছে, ‘বেবি শাহ’ নামে পরিচিত রেজা শাহ পাহলভি হয়তো শিগগিরই তেহরানে ক্ষমতায় ফিরতে চলেছেন বিজয়ী রূপে। পরক্ষণেই আবার শোনা যাচ্ছে, কুর্দি ‘অনিয়মিত বাহিনী’ নাকি ইরাক সীমান্ত পেরিয়ে হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব খবরের ধরন দেখে মনে হচ্ছে যেন সময়টা একবিংশ শতাব্দী নয়, এটি যেন এক শ বছর আগের কোনো যুদ্ধকাল।
এর মধ্যেই নতুন খবর আসে—ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন। কিন্তু সে খবরও স্থায়ী হয় না। দ্রুতই পাল্টে যায় গল্পের মোড়। বলা হয়, তাঁর পুত্র ও মনোনীত উত্তরসূরি নাকি এক রহস্যময়, বিকৃত চেহারার প্রতিশোধপরায়ণ ধর্মীয় নেতা, যিনি জনসমক্ষে আসেন না, ‘ছায়া থেকে’ শাসন চালান এবং লন্ডনে বিশাল সম্পত্তির মালিক।
গল্প এখানেই থেমে থাকে না। আবার নতুন মোড় আসে। এক সাবেক প্রেসিডেন্ট, যিনি ইসরায়েলবিরোধী ও জনতুষ্টিবাদী ধারার নেতা হিসেবে পরিচিত, যাঁকে সাধারণত কট্টরপন্থী বলা হয়, তাঁকেই হঠাৎ করে কোনো কোনো প্রতিবেদনে ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য ইসরায়েলের পছন্দ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এ ধারাবাহিক নাটকীয়তা দেখে প্রায় মনে হয়, ১৯৯৭ সালের ব্যঙ্গচিত্রধর্মী চলচ্চিত্র ‘যুদ্ধকে নাড়াও’ যেন বাস্তব সংবাদ জগতে ফিরে এসেছে। ওই ছবিতে এক স্পিন চিকিৎসক ও হলিউড প্রযোজক মিলে জনমত অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য কৃত্রিম যুদ্ধ তৈরি করেন।
সংবাদগুলোর চরিত্র এত দ্রুত বদলাতে থাকে যে সেগুলো আর খবরের মতো থাকে না; বরং সেগুলো রাজবংশীয় ষড়যন্ত্র, অতিরঞ্জিত খলনায়ক, নায়কের অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের মতো মসলাদার ঘটনায় প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন মোড় নেওয়া একেকটি ধারাবাহিক টেলেনোভেলায় পরিণত হয়। দর্শক যেন এক চলমান তিন অঙ্কের নাটকে বন্দী থাকেন।
একসময় এই যুগকে পড়ানো হবে, কীভাবে তথ্য সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় এবং কীভাবে গল্প বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়। কারণ, শেষ পর্যন্ত যদি গল্পটি বিক্রি হয়, তবে সত্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আর বিবেচনায় থাকে না।
এই পুরো চিত্রে সবচেয়ে কৌতূহল জাগানো বিষয় হলো পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে হঠাৎ নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যিনি এত দিন ‘অপোক্যালিপটিক’, ‘চরমপন্থী’ এমনকি নিজ দেশের জন্যও বিপজ্জনক হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন, তাঁকেই এখন কোনো কোনো প্রভাবশালী মাধ্যমে তুলনামূলক বাস্তববাদী, গ্রহণযোগ্য এবং সম্ভাব্য কার্যকর রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ তাঁর পক্ষ থেকে এমন কোনো অবস্থান বা বক্তব্যের নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
ইতিহাস বলছে, যুদ্ধকালীন এমন চরিত্রের পুনর্গঠন নতুন কিছু নয়। শীতল যুদ্ধের সময় কিংবা তার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নেতাকে সুবিধামতো ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের কখনো মিত্র, কখনো শত্রু হিসেবে দেখানো হয়েছে। যেমন ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম হুসেইন একসময় আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য সহযোগী হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। আবার পরবর্তী সময়ে তাঁকেই সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা হয়।
আফগান মুজাহিদিনদের একসময় ‘মুজাহিদিন’ বা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলা হতো। পরবর্তীকালে তাঁরাই চরমপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হন। পানামার সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগা একসময় গোয়েন্দা সহযোগী ছিলেন, পরে তিনি হয়ে ওঠেন অপরাধী শাসক। ভিয়েতনামে নো ডিন জিয়েম প্রথমে কমিউনিজমবিরোধী শক্তি হিসেবে প্রশংসিত হন, পরে স্বৈরাচারী হিসেবে বিবেচিত হন। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের পরিচয়ও সময়ে সময়ে বদলেছে। কখনো তাঁকে সন্ত্রাসী, কখনো বিপ্লবী, আবার কখনো শান্তিপ্রক্রিয়ার অংশীদার বলে দেখানো হয়েছে।
আহমাদিনেজাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। তাঁকে যদি কোনো বিদেশি শক্তির সঙ্গে সহযোগী হিসেবে সন্দেহ করা হয়, বিশেষ করে ইরানি বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে, তাহলে তা শুধু রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত নিরাপত্তারও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ইরানের ভেতরে এ ধরনের খবরকে অনেকেই অবিশ্বাস ও উপহাসের চোখে দেখছেন। একে একটি সুপরিকল্পিত বিভ্রান্তি বলেও মনে করছেন।
এখানেই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু অস্ত্রের মাধ্যমে নয়, তথ্যের মাধ্যমেও পরিচালিত হয়। এ তথ্যযুদ্ধ অবশ্য নতুন নয়, কিন্তু সামাজিক মাধ্যম, অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এর গতি ও প্রভাব বহুগুণে বেড়েছে।
এ ব্যবস্থায় বিশ্লেষণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় নাটকীয়তা। ইতিহাস ও সংস্কৃতির গভীরতা অপেক্ষা করে না, বরং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অনুমানই বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে প্রতিটি পক্ষই নিজের সুবিধামতো বাস্তবতার একেকটি সংস্করণ তৈরি করে নেয়।
যুদ্ধকালে সত্যের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে ‘গল্প’। উদ্দেশ্য থাকে জনমতকে প্রভাবিত করা, শত্রুকে দুর্বল দেখানো এবং নিজ দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করা যে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় গুজব ধীরে ধীরে বাস্তবতার মতো গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হলো—ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন যে আসন্ন, এ ধারণা বারবার জোর দিয়ে বলা। শুরু থেকেই বলা হয়েছে, শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে চলেছে, অভ্যন্তরীণ বিভাজন তীব্র এবং সামরিক চাপের মুখে পরিবর্তন অনিবার্য।
কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময়ও পশ্চিমা গণমাধ্যমে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের যে দাবি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি। সে সময়ের সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা আজও প্রশ্নবিদ্ধ।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, চাপের মুখেও ইরানি রাষ্ট্রকাঠামো অনেক বেশি দৃঢ়ভাবে টিকে আছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি বরং জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এ বাস্তবতা অনেক সময় গণমাধ্যমের প্রচলিত গল্পের সঙ্গে মেলে না।
ফলে একধরনের বিভাজন তৈরি হচ্ছে—একদিকে মাঠের বাস্তবতা, অন্যদিকে সংবাদনির্ভর কল্পচিত্র। অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্রও আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এ সময়কে তথ্যযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হবে। যেখানে সাংবাদিকতা, প্রচার, মনস্তাত্ত্বিক অভিযান ও বিনোদনের সীমারেখা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
একসময় এই যুগকে পড়ানো হবে, কীভাবে তথ্য সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় এবং কীভাবে গল্প বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়। কারণ, শেষ পর্যন্ত যদি গল্পটি বিক্রি হয়, তবে সত্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আর বিবেচনায় থাকে না।
তানিয়া গৌদসুজিয়ান আল–জাজিরা ইংলিশ অনলাইনের সাবেক মতামত সম্পাদক ও ইব্রাহিম আল-মারাশি মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক।
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।