আর্মেনিয়া থেকে পাভেল পার্থ
প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলন কি প্রাণপ্রকৃতির রক্তক্ষত আমলে নেবে
‘প্রকৃতির জন্য তৎপরতা’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আর্মেনিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলন। ওই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন পাভেল পার্থ
আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে চলছে জাতিসংঘ বিশ্ব প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনের ১৭তম আসর। ১৯ অক্টোবর শুরু হওয়া এ সম্মেলন শেষ হবে ৩০ অক্টোবর।
কৃষিজ, ভূমিজ, বন, জলাভূমি, দ্বীপ, সমুদ্র ও উপকূল এবং পাহাড়ি প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষাকে প্রধান বিবেচনায় রেখে সম্মেলন ঘিরে একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘লিডার্স ফর নেচার সামিট’, কার্টেজেনা প্রটোকলের ১২তম এবং নায়োগা প্রটোকলের ষষ্ঠতম সভা ও মন্ত্রীদের উচ্চপর্যায়ের সভা।
১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ধরিত্রী সম্মেলনে গৃহীত ‘প্রাণবৈচিত্র্য সনদের (সিবিডি)’ অঙ্গীকার সুরক্ষায় প্রতি দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপক্ষের প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলন। ২০২২ সালের কানাডার মন্ট্রিলে কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক (কেএমজিবিএফ) তৈরি হয়। প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষার এই বৈশ্বিক কর্মকাঠামো ২০৫০ সালের মধ্যে প্রকৃতিমুখী জীবনব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে ৪টি দীর্ঘ ও ২৩টি স্বল্পমেয়াদি কর্মভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
স্থল ও জলাভূমি এবং সমুদ্র বাস্তুতন্ত্রের অন্তত ৩০ শতাংশ কার্যকরভাবে সংরক্ষণ, দখল ও ক্ষয় থেকে ৩০ শতাংশ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে বছরে ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল সংগ্রহ, লোকায়ত ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের স্বীকৃতি ও যথাযথ ব্যবহার এবং আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, অধিকার নিশ্চিতকরণসহ ২৩টি লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সিবিডি সনদ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর অর্জন করার কথা।
কিন্তু সেই সব লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বনেতৃত্ব বরাবরই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে চলেছেন। প্রতিদিন বিশ্বের কোনো না কোনো বাস্তুতন্ত্র থেকে নিখোঁজ হচ্ছে প্রাণপ্রজাতি, ক্ষয় হচ্ছে বাস্তুতন্ত্র। বিশ্বব্যাপী জারি থাকা প্রবল মানুষকেন্দ্রিক (অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক) উন্নয়নচিন্তা মৌমাছি থেকে হাতি, অণুজীব থেকে বটগাছ—কারোর জীবনরেখা সুরক্ষিত রাখছে না।
যুদ্ধ, অস্ত্রবাণিজ্য, অন্যায় খাদ্যব্যবস্থা, দখল, ডিজিটাল উপনিবেশ, দূষণ আর নিওলিবারেল বাহাদুরি এই গ্রহকে বৈচিত্র্যহীন করে তুলছে। মানুষসহ প্রতিটি প্রাণপ্রজাতির বেঁচে থাকা ও বিকশিত হওয়ার শর্তগুলো নানাভাবে চুরমার করে দিচ্ছে।
ঢাকা থেকে ২৬ অক্টোবর সকালে ইয়েরেভান বিমানবন্দরে যখন পৌঁছাই, আর্মেনিয়ার ৭টি উভচর ও শতাধিক হ্রদ স্বাগত জানাল। আর্মেনিয়ার এনডেমিক নীল প্রজাপতিকে সম্মেলনের লোগো করা হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে রিপাবলিক স্কয়ারের দিকে ট্যাক্সিতে যেতে যেতে ককেশাস পবর্তমালার দিকে তাকিয়ে আর্মেনিয়ার নীল প্রজাপতি আমাকে বাংলাদেশের মধুপুর শালবনের এক ফলের মাছির কাছে নিয়ে যায়। এই মাছিও আর্মেনিয়ার নীল প্রজাপতির মতো মধুপুর বনে এনডেমিক। যেসব প্রজাতি কেবল একটি নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্রে বসবাস করে, দুনিয়ার আর কোথাও প্রাকৃতিক পরিবেশে দেখা যায় না, তারাই এনডেমিক।
মধুপুর শালবনে হলুদ গোত্রের দুটি গাছও এনডেমিক। বনের মান্দি আদিবাসীরা গাছগুলোকে বলে দিগ্গি সামজক। এসব গাছ মধুপুর শালবনের আদিবাসীদের লোকায়ত চিকিৎসা ও বহু আধ্যাত্মিক কৃত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইয়েরেভানের মেরিডিয়ান এক্সিবিশন সেন্টারে নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সম্মেলনে প্রবেশ করেই চারপাশ বিষণ্ন হয়ে যায়। একটা ব্যানারে লেখা আছে, ২০২৫ সালে আমরা ৫৮টি তাপানুলি ওরাংওটাং হারিয়েছি। প্রবল বৃষ্টি, ভূমিধস ও ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারের কারণে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় এরা নিহত হয়েছিল।
বাংলাদেশের পাহাড়ি ঢল, বন্যা, পাহাড়ধস, উত্তরাঞ্চলের খরা কিংবা প্রাকৃতিক বনে অগ্নিকাণ্ডের কারণে আমরা কত প্রাণপ্রজাতি হারিয়েছি, কে জানে?
একটি পাখি বা মাছ, সরীসৃপ বা উভচর, নদী বা বন, গাছ বা পতঙ্গের জীবন কি জীবন–মরণের যন্ত্রণা নিয়ে পরের সম্মেলনের জন্য অপেক্ষা করবে? নাকি আমরা বিশ্বব্যাপী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্বশীল তৎপরতা দেখতে পাব? ইয়েরেভান সম্মেলন এখনো এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।
প্রকৃতির জন্য তৎপরতা: ইয়েরেভান ঘোষণা
ইয়েরেভানে প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলন শুরু হয়েছে বিশ্বনেতৃত্বের অঙ্গীকার ভঙ্গ ও হতাশার খতিয়ান সামনে রেখে। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরুর আগে ১৬ অক্টোবর ‘লিডার্স ফর নেচার সামিটে’ বিশ্বনেতৃত্ব ‘ইয়েরেভান ঘোষণায়’ স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন, বিশ্বজুড়ে প্রাণপ্রকৃতি সুরক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। আবার ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণবৈচিত্র্যের অন্তর্ভুক্তি, বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থায়নের বৈশ্বিক আহ্বান ও সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবমুখী ও দৃশ্যমান তৎপরতা বাস্তবায়নে বিশ্বনেতৃত্ব ইয়েরেভান ঘোষণার মাধ্যমে আবার রাজনৈতিক অঙ্গীকার করলেন।
একটি পাখি বা মাছ, সরীসৃপ বা উভচর, নদী বা বন, গাছ বা পতঙ্গের জীবন কি জীবন–মরণের যন্ত্রণা নিয়ে পরের সম্মেলনের জন্য অপেক্ষা করবে? নাকি আমরা বিশ্বব্যাপী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্বশীল তৎপরতা দেখতে পাব? ইয়েরেভান সম্মেলন এখনো এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।
ইয়েরেভান প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনের নয়া তৎপরতা
‘কেএমজিবিএফের’ প্রথম বৈশ্বিক পর্যালোচনা হচ্ছে ইয়েরেভান সম্মেলনে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় গৃহীত ২৩টি বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে দেশগুলোর সম্মিলিত অগ্রগতি এবং ‘জাতীয় প্রাণবৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (এনবিএসএপি)’ বাস্তবায়ন ও অর্থায়নের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা চলমান।
পাশাপাশি প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় অর্থায়ন ও তহবিল সংগ্রহ, লোকায়ত ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের সুরক্ষাসহ এসব জ্ঞান থেকে সরাসরি বা জেনেটিক সম্পদের ডিজিটাল সিকোয়েন্স (ডিএসআই) তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে সৃষ্ট সুফলের ন্যায্যবণ্টন এবং এ ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী কীভাবে উপকৃত হবে, সেসবও এবার আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়।
‘প্রকৃতির জন্য তৎপরতা’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে প্রাণবৈচিত্র্য ও জলবায়ু সংকট, ‘ওয়ান হেলথ’ স্বাস্থ্যচিন্তা, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর চাপ কমানো, আগ্রাসী প্রজাতি রোধ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়েও দেনদরবার চলমান।
অস্পষ্ট তহবিল এবং জনতার স্পষ্ট আওয়াজ
প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় বছরে ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিলের অঙ্গীকার এখনো কাঠামোগতভাবে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হয়নি। সর্বশেষ কালি প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনে জেনেটিক সম্পদ থেকে প্রাপ্ত ডিজিটাল সিকোয়েন্স তথ্য বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত সুফলের ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক বণ্টনের জন্য ‘কালি তহবিল’ গঠিত হয়েছিল।
২০২৫ সালে ইতালির রোমে আনুষ্ঠানিকভাবে তহবিলটি চালু হয়। জেনেটিক সম্পদ–সম্পর্কিত ডিজিটাল তথ্য ব্যবহার করে লাভবান প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির কাছ থেকে লভ্যাংশ সংগ্রহ করে উন্নয়নশীল দেশ, আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা ও অধিকার সুরক্ষায় ব্যয় করার কথা। তহবিলের ৫০ শতাংশ আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার ও অধিকার সুরক্ষায় ব্যয় হবে, যার মধ্যে নারী ও যুবদের অগ্রাধিকারের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জেনেটিক সম্পদ ও লোকায়ত জ্ঞানের একতরফা বাণিজ্যিক পেটেন্ট ও প্রাণডাকাতির (বায়োপাইরেসি) কোনো কাঠামোগত সুরাহা ছাড়াই ‘ডিজিটাল সিকোয়েন্স তথ্যের (ডিএসআই)’ আলোচনা আরেক নতুন তথ্য-উপনিবেশ ও বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করছে।
লোকায়ত জ্ঞান ও প্রাণসম্পদের জনগোষ্ঠীভিত্তিক সক্রিয় এবং ন্যায্য জনদলিল ও নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা ছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তি কেবল নতুনভাবে সংকট তৈরি করবে, প্রাণপ্রকৃতি সুরক্ষায় জনগোষ্ঠীর সহস্র বছরের অবদান ও অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে না।
ইয়েরেভান সম্মেলনে লোকায়ত জ্ঞান ও আদিবাসী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবেই টেবিলে আছে। ‘আদিবাসী আত্মপরিচয়কে’ এককভাবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণাকে (২০০৭) সিবিডি বাস্তবায়নের কাঠামোতে যুক্ত করার জোর দাবি এবারও উঠেছে আদিবাসীদের পক্ষ থেকে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস ডিকলারেশন অন দ্য রাইটস অব পিজান্টস অ্যান্ড আদার পিপল ওয়ার্কিং ইন দ্য রুরাল এরিয়াস (ইউএনডিআরওপি, ২০১৮)’ ঘোষণাকেও সিবিডি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্তকরণের আওয়াজ উঠেছে।
বেলেম জলবায়ু সম্মেলনের লিডার্স সামিটে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ‘ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি (টিএফএফএফ)’ গঠিত হয়।
এ অর্থায়নের ২০ শতাংশ আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। ৭০টির বেশি দেশের এক বিলিয়ন হেক্টর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন সুরক্ষায় ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ৬৬টি দেশ সমর্থন জানালেও বাংলাদেশ এখনো টিএফএফএফের আনুষ্ঠানিক সদস্য নয়।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদের অধীনে গৃহীত ‘দ্য অ্যাগ্রিমেন্ট অন মেরিন বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি অব এরিয়াস বিয়ন্ড ন্যাশনাল জুরিসডিকশন (বিবিএনজে চুক্তি)’ ২০২৪ সালে বাংলাদেশ অনুসমর্থন করে। সমুদ্র সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় লোকায়ত ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এবং আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা এই সনদের অন্যতম বিষয়।
স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করলেও বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত সুরক্ষার বাংলাদেশ লোকায়ত জ্ঞান, জাতীয় আইন বা বৈশ্বিক সনদ মানছে না। কক্সবাজারের বালিয়াড়ি বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে তথাকথিত উন্নয়ন বাণিজ্য জারি রেখেছে। সমুদ্র উপকূল ও দ্বীপ বাস্তুতন্ত্রের বন ও প্রাণবৈচিত্র্যকে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়ে নানামুখী উন্নয়ন তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এসব কর্মকাণ্ড প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার অঙ্গীকার ভঙ্গ করছে।
বাংলাদেশ উদাহরণ হোক
ইয়েরেভান সম্মেলনে মন্ত্রী পর্যায়ের উচ্চতম সভায় প্রদত্ত বক্তব্যে বাংলাদেশ তার ভূমি, জলাভূমি, উপকূল ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং ১৪ হাজার প্রজাতির বৈচিত্র্য বৈভবের শক্তি তুলে ধরেছে। প্রাণবৈচিত্র্যমুখী পরিকল্পনা, পুনরুদ্ধার, সংরক্ষিত এলাকা বৃদ্ধি, আগ্রাসী প্রজাতি চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে এক জলবায়ুসহিষ্ণু টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ।
প্রাণপ্রকৃতি সুরক্ষায় কালি তহবিলসহ সব প্রাণবৈচিত্র্য অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ তার বক্তব্যে ‘এথনিক মাইনোরিটি অ্যান্ড লোকাল কমিউনিটি’ ব্যবহার করলেও, এ ক্ষেত্রে দেশের আদিবাসী জনগণের আত্মপরিচয়কেই স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। এটি সিবিডিসহ বৈশ্বিক সনদ এবং দেশের আদিবাসী জনগণের ঐতিহাসিক পরম্পরা ও অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের প্রাণবৈচিত্র্যমুখী সংযোগ। রাষ্ট্রের এই দায়িত্বশীল তৎপরতা প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষার তহবিল প্রাপ্তিসহ দেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির বৈচিত্র্যময় রেখাবিন্দুগুলোর মিলন ঘটাবে।
জাতীয় প্রাণবৈচিত্র্য জনদলিল এবং লোকায়ত ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের জননেতৃত্বাধীন তালিকা প্রণয়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা তহবিল গঠন করতে হবে।
এনবিএসএপির লক্ষ্যপূরণে দেশের বাস্তুতন্ত্র, প্রাণবৈচিত্র্য, আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্বাধীন, স্বচ্ছ, জবাবদিহি এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা এবং তহবিল ব্যয় করা জরুরি।
আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যায়তন, গণমাধ্যম, সামাজিক-পরিবেশ সংগঠন—সব পক্ষকে নিয়ে সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো একটি জাতীয় প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষা কাঠামো গঠন করতে পারে।
ভৌগোলিক আয়তনে ছোট হলেও প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে বাংলাদেশ এই গ্রহের শক্তি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব বাস্তুতন্ত্রের প্রাণপ্রজাতিই এই গ্রহের অন্যতম বিরল শক্তি। পৃথিবীর সুরক্ষায় তার প্রাণসঞ্জিবনী প্রাণপ্রকৃতির রক্তক্ষতকে আমলে নিতেই হবে।
● পাভেল পার্থ লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী
*মতামত লেখকের নিজস্ব