বিশ্ব খাদ্য দিবস: ‘মানুষকেন্দ্রিক’ খাদ্যব্যবস্থার বদল জরুরি

প্রতীকী ছবি

গত এক শ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ বহুবার খাদ্যসংকট, দুর্ভিক্ষ ও মহামারি সামাল দিয়েছে। কলেরা ও বসন্ত মহামারির মতো ১৯৪৩ এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষও অমোচনীয় দাগ রেখে গেছে আমাদের জিনলিপিতে। ভোলা ঘূর্ণিঝড় (১৯৭০) কিংবা বড় বন্যা (১৯৮৮, ১৯৯৮) থেকে করোনা মহামারি ও ২০২৪-২৫ সালের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার পূর্বাভাস আমাদের সামনে বিশৃঙ্খল সব খাদ্যদৃশ্য হাজির করেছে।

খাদ্য দিবসের বার্তায় ‘বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)’ জানায়, বিশ্বে ৬৪ দশমিক ৫ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত এবং ২৬৯ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাতে পারে না।

এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’। এফএও এই ‘উদ্ভাবনকে’ এক সমন্বিত দূরদর্শী সমাধান হিসেবে দেখছে। লোকায়ত জ্ঞান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতির সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, বৈচিত্র্যময়, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে সুরক্ষিত রাখার প্রচেষ্টাই আজকের ‘উদ্ভাবন’।

কৃষক সংগ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গণ–অভ্যুত্থান; সব সময়েই ‘অন্তর্ভুক্তি’ ও ‘বহুত্ববাদের’ জন–আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু কোনো শাসনামলেই খাদ্যব্যবস্থা বহুত্বকে ধারণ করেনি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা প্রবলভাবে অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক বা মানুষকেন্দ্রিক, একই সঙ্গে নিওলিবারেল ও বহুজাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রিত। এই অসম ও অন্যায্য খাদ্যব্যবস্থার বদল জরুরি।  

আরও পড়ুন

‘বাম্পার ফলনের’ তলায় চাপা পড়া সত্য

কৃষক, জেলে, খাদ্য উৎপাদক, আহরণকারী, ক্রেতা, ভোক্তার বয়ান আমলে নেয় না রাষ্ট্র। টংক, নানকা, তেভাগা কৃষক সংগ্রামের খাদ্যব্যবস্থা মুক্তির বার্তাকে পাঠ করা হয়নি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানেও খাদ্যব্যবস্থা মুক্তির জন–আকাঙ্ক্ষা গ্রাফিতি হয়ে উঠেছিল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গ্রাফিতিতে একটি টেলিভিশনে ‘বাম্পার ফলনের’ ছবি এঁকে লেখা হয়েছে, ‘একি রণ–বাজা বাজে ঘন ঘন’। এরপর ইংরেজিতে লেখা হয়েছে, ‘জাস্ট শাট আপ! ফাইন্ড দ্য কারেজ টু রিভিল দ্য ট্রুথ’।

কিন্তু নিদারুণভাবে ‘বাম্পার ফলনের’ অধিপতি বয়ানের তলায় চাপা পড়া ‘সত্য’ উদ্ধারে কেউ তৎপর নয়। কৃষক ছাড়া খাদ্যব্যবস্থার দায় ও দায়িত্ব এখনো কেউ নিতে চায় না। এই ‘বাম্পার ফলনের’ নামে বৈশ্বিক সবুজ বিপ্লব প্রকল্প চাপিয়ে দিয়ে সামগ্রিক কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাকে জিম্মি করা হয়েছে। এতে বৈচিত্র্য বিনাশ হয়েছে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে এবং খাদ্য পরিসরে গ্রামীণ জনগণের নেতৃত্ব শূন্য।

প্রতিদিন বাহাদুরি সব উন্নয়ন গিলে খাচ্ছে কৃষিজমি, খাদ্য হয়ে উঠছে বিষাক্ত পণ্য। পারিবারিক কৃষি ঐতিহ্যের দেশে আজ তরুণ প্রজন্ম কৃষি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। অধিক খাদ্য ফলানোর নামে সবুজ বিপ্লবের লিগ্যাসি টানার দরকার কী? এমনকি নতুন কোনো ‘জিন–বিপ্লবেরও’ দরকার আমাদের নেই। দেশের মাটি-জল-হাওয়া-প্রাণসম্পদ আর লোকায়ত জ্ঞানের প্রতি আস্থা ও মমতা জাগানোই এখন টিকে থাকবার মূল রসদ।

আমাদের গ্রামভিত্তিক ‘খাদ্যস্মৃতি মানচিত্র’ তৈরি করা জরুরি। স্থানীয় বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদ কাজটি করতে পারে। খাদ্যস্মৃতি অনুসন্ধানের মাধ্যমে শিশুদের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও সংস্কৃতির সঙ্গে এক নতুন দায়িত্বশীল যোগসূত্র তৈরি হবে। মেধাস্বত্ব ও প্রথাগত সংস্কৃতিকে নিশ্চিত করে অঞ্চলভিত্তিক গ্রামীণ রেসিপিগুলোর দলিলায়ন দরকার। এখনো আমাদের খাবারের থালায় একটু অংশটা বিনা আবাদ থেকে থেকে আসে, যা আহরণ ও কুড়িয়ে পাওয়া।

সচরাচর আমরা যখন খাদ্যের কথা বলি, তখন কেবল মানুষের খাদ্য ও পানীয় নিয়েই কথা বলি। কিন্তু গ্রামীণ নিম্নবর্গ খাদ্য বলতে কেবল মানুষ নয়, প্রাণিসম্পদসহ সব প্রাণসত্তার কথাই বিবেচনায় রাখেন। অথচ সবুজ বিপ্লবের এজেন্ডা কেবল মানুষের জন্য দানাশস্য উৎপাদনের নামে জমিনে বিষ ঢেলে পানি তুলে লন্ডভন্ড করে দিলে কেঁচো, ব্যাঙ, সাপ, মৌমাছি, শামুক ও মাছেদের সংসার। প্রাণী বা মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের নামেও একইভাবে বৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র চুরমার হয়েছে। মানুষ, গাছপালা, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল-শূকর নিয়েই এক একটি গ্রামীণ সংসার। যদি ধানের সঙ্গে তুষ, খুদ, খড় না হয় তবে গরু-ছাগল বা হাঁস-মুরগি খাবে কী?

বিষ ও হাইব্রিড বীজের চাষাবাদে পরিবারের সবার খাদ্য নিশ্চিত হয় না। এমনকি রাসায়নিক চাষাবাদে বুনো প্রজাতির ‘পরিবেশ-গণহত্যা’ ঘটে। প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে, বুনো প্রাণীরা অনাহারে থাকে। কোনো এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, প্রাণসম্পদ, জলবায়ু, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, বিশ্বাস, প্রথাগত জ্ঞান মিলেই সেই এলাকার সামগ্রিক খাদ্যব্যবস্থা। বাম্পার ফলনের বাহাদুরির তলায় লড়াইরত সব প্রাণের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক খাদ্যব্যবস্থার এই রক্তক্ষতে আমলে নিতে হবে।

আরও পড়ুন

খাদ্যস্মৃতি মানচিত্র ও ‘অদৃশ্য’ খাদ্যভান্ড

বাংলাদেশসহ দুনিয়াজুড়ে খুন হয়েছে খাদ্যের স্থানীয় বৈচিত্র্য ও উৎসভান্ড। বিশ্ব আজ হাতে গোনা কিছু মুখস্থ খাবারের কলোনিতে বন্দী। এক একটি খাবার ভূগোল ও জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ স্মৃতির জিনলিপি বহন করে। ‘খাদ্য’ আমাদের স্বাদ, স্বাস্থ্য, স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা, সংঘাত ও সামাজিক বিস্তারের সাক্ষী।

খাদ্যের এই ঐতিহাসিক সাক্ষ্যকে মেনেই বাংলাদেশ ইলিশ মাছ, কালিজিরা ও ধান, ফজলি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, নাকফজলি, হাঁড়িভাঙা ও ক্ষীরশাপাতি আম, বাগদা চিংড়ি, রসমালাই, পাতক্ষীর, চমচম, মণ্ডা, রসগোল্লা, ছানার পায়েস, মিষ্টিপান, কাঁচাগোল্লা, তিলের খাজা, লটকন, সুন্দরবনের মধু, খেজুর গুড়, অমৃতসাগর কলা কিংবা মধুপুরের আনারসকে ‘ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই)’ হিসেবে নিবন্ধন করেছে।

কিন্তু আমাদের খাদ্যমানচিত্র থেকে প্রতিদিন প্রশ্নহীনভাবে উধাও হচ্ছে অবিরল সব খাদ্যবিন্দু। এক একটি খাদ্যবিন্দুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাস্তুতন্ত্র, লোকায়ত জ্ঞান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি ক্রমেই অদৃশ্য হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে এক ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল নিওলিবারেল ‘খাদ্য-কর্তৃত্ববাদ’। যেখানে নিম্নবর্গের খাদ্য লঙ্ঘন ও লড়াইয়ের কোনো বয়ান নাই।

প্রতীকী ছবি

খুন হওয়া ভাওয়াল শালবনের এক মুমূর্ষু গ্রাম হাওরিয়াচালা। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বিলুপ্ত শালবনের এই গ্রামটিতে এখন কারখানা, রিসোর্ট আর আগ্রাসী গাছের বাগান। এককালের সুখী গৃহস্থ পরিবারের সুনীল চন্দ্র বর্মণ এখন দিনমজুর। তাঁর বাবা মঙ্গল চন্দ্র বর্মণ ও দাদু রশিচন্দ্র বর্মণ শালবনের বাইদ ও চালা পঙ্খিরাজ, বিন্নি, কাইকা, কুমলি, নোহা, রাজাশাইল, ক্ষীনই, বনকোষ, গুদধই, তেঁতুলিয়া, পোড়া বিন্নি, কাইস্যা বিন্নি, করাচি, লোহাটাং, কুমড়ি, মালতি, চিনিগুঁড়া, কালিজিরা ধানের আবাদ করতেন। গুদধই বা বনকোষ ধান দিয়ে তাঁর মা সমলা রানী শীতকালে পুষরা পরবের সময় ‘বকনি’ রান্না করতেন।

সে এক জটিল প্রস্তুতপ্রণালি। ধান শুকিয়ে পাটের বস্তায় জাগ দিয়ে অঙ্কুরোদ্‌গম করতে হয়। অঙ্কুরিত ধান রোদে শুকিয়ে ঢেঁকিতে ভানতে হয়। চাল ও তুষ মেশানো অঙ্কুর আলাদা করে এটি রান্না করতে হয়। পায়েস বা ক্ষীরের মতো খেতে মিষ্টিস্বাদের এই রান্নায় কোনো বাড়তি মিষ্টিদ্রব্য ব্যবহৃত হয় না। সুনীলের স্ত্রী মিনতি রানী রান্নাটি জানলেও উপকরণের অভাবে করতে পারেন না। তাঁদের মেয়ে গার্মেন্টসকর্মী শিলা রানী বকনি ভাত খায়নি কোনো দিন।

আরও পড়ুন

বিধ্বস্ত এক শালবনের গ্রামে আমি যখন কোচ-বর্মণদের ‘বকনি ভাত’ হারানোর করুণ কাহিনি শুনছিলাম, সুনীল বর্মণ তখন নাতনির জন্য দোকান থেকে কেনা একটা চিপসের প্যাকেট ধরিয়ে দিনমজুরির কাজে বেরিয়ে যান। ধানের অঙ্কুর ব্যবহার করে তৈরি এই বিশেষ খাবারটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বুকনি, বুগলি ও মধুভাত নামেও পরিচিত।

একসময় হাওরে বড় নানিদ, ঘাঘট, বোয়াল, চিতল দিয়ে রান্না হতো ‘মুচি’। লেবা, ডখলে, পেলকা, বউখুদ, কাঞ্জির জাউ, বাঘাই শিরনি, মেরা বা মলিদার মতো হারানো খাদ্যতালিকা কত দীর্ঘ হবে তা আন্দাজ করাও মুশকিল। ঘেচু, শালুক, কেওরালি, মনকাঁটা, ডেফল, মুরমুরি, কাউ, রসকো, তেতস্লাং, চুপড়ি আলুর মতো কত সহস্র বুনো খাদ্যভান্ড আমরা বিনাশ করেছি জানি না।

মান্দিদের ‘খারি’ নামের রেসিপিতে গাছগাছড়া থেকে বানানো ‘খারপানি’ ব্যবহৃত হতো। এখন দোকান থেকে কেনা খাবার সোডা ব্যবহার হয়। ‘আগের দিনের সেই স্বাদ এখন নাই’ বা ‘মায়ের হাতের ছোঁয়া’ এসব স্টেরিওটাইপ নস্টালজিয়াকে বাদ দিলেও খাদ্যবৈচিত্র্য নির্মূলের খতিয়ানকে অস্বীকার করা যাবে না। ‘সবুজ বিপ্লব’, রাসায়নিক কৃষি, অন্যায্য খাদ্যব্যবস্থা, কাঠামোগত বৈষম্য, প্রান্তিকীকরণ ও অপরায়ণের লিগ্যাসি এবং বহুজাতিক বাণিজ্য সরাসরি এই নির্মূলের জন্য দায়ী।

আরও পড়ুন

আমাদের গ্রামভিত্তিক ‘খাদ্যস্মৃতি মানচিত্র’ তৈরি করা জরুরি। স্থানীয় বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদ কাজটি করতে পারে। খাদ্যস্মৃতি অনুসন্ধানের মাধ্যমে শিশুদের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও সংস্কৃতির সঙ্গে এক নতুন দায়িত্বশীল যোগসূত্র তৈরি হবে। মেধাস্বত্ব ও প্রথাগত সংস্কৃতিকে নিশ্চিত করে অঞ্চলভিত্তিক গ্রামীণ রেসিপিগুলোর দলিলায়ন দরকার। এখনো আমাদের খাবারের থালায় একটু অংশটা বিনা আবাদ থেকে থেকে আসে, যা আহরণ ও কুড়িয়ে পাওয়া।

জাতীয় খাদ্য-খতিয়ানে যাবতীয় ন্যায্যতাকে নিশ্চিত করে এই ‘অদৃশ্য খাদ্যভান্ডকে’ দৃশ্যমান করতে হবে। এসব খাদ্যের উৎসস্থল ও বিচরণ অঞ্চলকে সুরক্ষিত রেখে এর অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। দুর্যোগ, অনাহার ও মহামারি কালের বিস্ময়কর শক্তিময় খাদ্যসঞ্জীবনীগুলো খুঁজে বের করতে হবে। গ্রামে গ্রামে খাদ্য বিনিময়, এমনকি শহরের ছাদবাগান থেকে প্রাপ্ত খাদ্য বিনিময়ের সংস্কৃতিকে চর্চায় আনা জরুরি। অধিপতি প্রাণডাকাতির ব্যবস্থায় খাদ্য–সম্পর্কিত লোকায়ত জ্ঞান, কারিগরি ও উপাদানের রাষ্ট্রীয় আইনগত স্বীকৃতি ও সুরক্ষাও এক জরুরি প্রশ্ন। জাতীয় বাজেটে ‘খাদ্যবৈচিত্র্য সুরক্ষার’ জন্য বিশেষ খাত বরাদ্দ করতে হবে।

স্থানীয় শস্যফসল ও বীজ, লোকায়ত খাদ্যবিদ্যা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণবৈচিত্র্যের তথ্যাদি গ্রামীণ নিম্নবর্গের নেতৃত্বে পাবলিক সম্পদ হিসেবে জনডিজিটাল ভান্ডারে সুরক্ষিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উন্মুক্ত ব্লকচেইন উদ্যোগগুলো কাজে আসতে পারে। তরুণ প্রজন্মকে ‘নতুন কৃষক’ হিসেবে খাদ্যব্যবস্থার দায়দায়িত্ব নিতে হবে।

খনার বচনে কোন মাসে কোন ঋতুতে কী খাওয়া বারণ তার ব্যাখা আছে। সব ঋতু ও মাসে সব শস্যফসল উৎপাদন ও গ্রহণের যে পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক ঝুঁকি তা আমলে আনা দরকার। চলমান জলবায়ু সংকটের নয়া ঝুঁকির ভেতর খাদ্যের ঋতুচক্র পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি খাদ্যসংকেটর লোকায়ত পূর্বাভাস নিয়ে গবেষণা জরুরি। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবেশনের পর খোসা, আঁশ, বীজ, হাড়, কাঁটা, পাতি, নাড়িভুঁড়িসহ যে উপজাত তৈরি হয় তা বর্জ্য হিসেবে না দেখে সৃজনশীল পণ্য তৈরিতে ব্যবহারের নিরীক্ষাগুলো চলমান রাখতে হবে।
 
এফএও জানায়, ওয়ান হেলথ দৃষ্টিভঙ্গি মানুষ, প্রাণিসম্পদ, বন্য প্রাণী, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের আন্তনির্ভরশীলতাকে স্বীকার করে খাদ্যব্যবস্থার স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাবকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার সুযোগ দেয়। এ ক্ষেত্রে জলবায়ুসহিষ্ণু খাদ্যসার্বভৌম অবস্থার রূপান্তরে অ্যাগ্রোইকোলজি এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও আন্দোলন।

মরিয়েরা ও অন্যান্যরা (২০২৬) তাঁদের ‘ডিজাইনিং উইথ নন-হিউম্যানস ফর অ্যাগ্রিকালচারাল সিস্টেমস ট্রান্সফরমেশন: অ্যান ইন্টারডিসিপ্লিনারি রিভিউ অ্যান্ড ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফ্লেকশন’ শীর্ষক গবেষণায় দেখান, কৃষিব্যবস্থার নকশা ও রূপান্তর এখনো মূলত মানুষকেন্দ্রিক বা অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক। এখানে মানুষ ছাড়া অন্য জীবের প্রয়োজন ও স্বার্থ বিবেচনা করা হয় না। মানুষকেন্দ্রিক খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে মানুষসহ সব প্রাণসত্তার জন্য আন্তনির্ভরশীল ও প্রতিবেশবান্ধব খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যতের ‘নতুন কৃষক’

খাদ্যব্যবস্থার মালিকানা ও শর্ত আজ পাবলিক নাগালে থাকছে না। মনস্যান্টো, সিনজেনটা, কারগিল, বায়ার, ডুপন্ট, কোক-পেপসি বা নেস্‌লের মতো বহুজাতিক কোম্পানির দখলে আজ বৈশ্বিক খাদ্যভান্ড। নিওলিবারেল খাদ্যবাজার সামাল দেওয়ার সামর্থ্য ও শক্তি বাড়াতে হবে। উৎপাদন থেকে পরিবহন, বিপণন, মজুত, বিক্রয়, পরিবেশন, বণ্টন, প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা বিনিময়; খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে দেশের সব নাগরিকের ঐক্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।

মানুষসহ সব প্রাণসত্তার জন্য এক ন্যায্য, জলবায়ুসহিষ্ণু ও সার্বভৌম খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হবে যার কেন্দ্র, লোকায়ত জ্ঞান ও প্রাণসম্পদ হবে ভিত্তি এবং জনডিজিটাল প্রযুক্তি হবে এর সহায়ক। খাদ্যব্যবস্থার গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ‘ডিজিটাল কমনস’ বা জনডিজিটাল ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কৃষক, জেলে, উৎপাদক ও আহরণকারী যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তির কেবলমাত্র ভোক্তা নন; বরং ডিজিটাল সম্পদ ও ব্যবস্থাপনার মালিকানা, নেতৃত্বে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহনির্মাতা।

স্থানীয় শস্যফসল ও বীজ, লোকায়ত খাদ্যবিদ্যা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণবৈচিত্র্যের তথ্যাদি গ্রামীণ নিম্নবর্গের নেতৃত্বে পাবলিক সম্পদ হিসেবে জনডিজিটাল ভান্ডারে সুরক্ষিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উন্মুক্ত ব্লকচেইন উদ্যোগগুলো কাজে আসতে পারে। তরুণ প্রজন্মকে ‘নতুন কৃষক’ হিসেবে খাদ্যব্যবস্থার দায়দায়িত্ব নিতে হবে। খাদ্যব্যবস্থায় তরুণ প্রজন্মের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণই আজকের ‘উদ্ভাবন’, যা ভবিষ্যতে মানুষসহ সব প্রাণসত্তার খাদ্য পরিসরকে ‘পুষ্টি’ জোগাবে।

  • পাভেল পার্থ লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী
    *মতামত লেখকের নিজস্ব