ইরান নয়, ট্রাম্পই এখন বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ

ডোনাল্ড ট্রাম্পরয়টার্স

হঠকারী এবং দিশাহারা ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে নিজের শুরু করা এই বিপর্যয়কর যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। মার্কিন সামরিক বাহিনী আবারও দেশটিতে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। আগের মতোই, এই বেআইনি হামলাগুলো কট্টরপন্থী একটি সরকারের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে।

এই সপ্তাহেও প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে তিনি ‘বিশাল জয়’ পাচ্ছেন। ট্রাম্প এবং পেন্টাগনের যুদ্ধবাজ প্রধান পিট হেগসেথ কতবার এমন ভুয়া বিজয়ের দাবি করেছেন? কেউ তাঁকে বিশ্বাস করে না।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন হোয়াইট হাউসের একটি সীমিত ও অধরা লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহি মনোভাবের কারণেই প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৃহত্তর যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো এখন আগের চেয়ে আরও বেশি অলীক মনে হচ্ছে।

মার্কিন বাহিনী যে অকার্যকর হয়ে পড়েছে, তার কারণ ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শক্তি নয়, ট্রাম্পের কাপুরুষোচিত নেতৃত্ব। ইরান যদি সত্যিই তাদের দাবি অনুযায়ী এতটা বিপজ্জনক হতো, তবে যৌক্তিক পথ ছিল পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ চালানো। জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ইরাককে বিপজ্জনক মনে করেছিলেন, তখন তিনি ১ লাখ ৭০ হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। সেটিও এক বিপর্যয় ছিল।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প ইরানে তেমন কিছু করার সাহস দেখাবেন না। এই সামান্য স্বস্তির জন্য বিশ্ববাসীর অবশ্যই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কিন্তু ট্রাম্প নিজের ভুল স্বীকার করবেন না। তিনি একটি অসমাপ্ত যুদ্ধ অবলীলায় শুরু করেছিলেন। ট্রাম্প বরং বেসামরিক মানুষ ও মার্কিন সৈন্যদের একটি অন্তহীন ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে পছন্দ করেন।

ট্রাম্প উপসাগরীয় আরব মিত্রদের বিপদে ফেলছেন, বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করছেন, অনুন্নত দেশগুলোতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন এবং মস্কো থেকে বেইজিংয়ের স্বৈরশাসকদের আনন্দ দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছেন এবং তাঁর নিজের রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী সম্ভাবনা নষ্ট করছেন। এত কিছুর পরও তিনি নিজের ভুল মেনে নিয়ে ‘শান্তি আলোচনা’র মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটবেন না।

ইরান নয়, ট্রাম্পের আত্ম–অহংকারই এখন বিশ্বের এক নম্বর শত্রু। এই যুদ্ধ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ তিনিই। তিনি একাই একটি জীবন্ত গণবিধ্বংসী অস্ত্র।

এখানে একটি চেনা চিত্র দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প কংগ্রেস, মার্কিন মিত্র বা আমেরিকার জনগণের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই যুদ্ধে জড়িয়েছেন। তাঁর কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল না। তিনি ইসরায়েলের বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বিজয়ের ভুয়া আশ্বাস সহজে বিশ্বাস করেছিলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোজতবা খামেনি
ফাইল ছবি

সামরিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি নিয়ে ট্রাম্পের যে অগাধ অজ্ঞতা ছিল, তা বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন দিয়েও দূর করা যায়নি। কারণ, তিনি সেই প্রতিবেদনগুলো পাত্তাই দেননি। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প ভেবেছিলেন, প্রণালিটি বন্ধ করার আগেই ইরান আত্মসমর্পণ করবে।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টাহামলায় ট্রাম্প ‘হতবাক’ হয়েছিলেন। কিন্তু বাকি কেউ অবাক হয়নি। এখন তিনি অথই সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন।

গত বছরের গাজার উচ্চাভিলাষী ২০ দফার ‘শান্তি পরিকল্পনা’তেও একই ধরনের অহংকার ও দায়িত্বহীনতা দেখা গিয়েছিল। পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠন বা নিরস্ত্রীকরণের মতো প্রধান বিষয়গুলোর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ট্রাম্প নিজেই এখন এর ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।

হামাস অস্ত্র সমর্পণ করেনি, ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, মানবিক সহায়তা এখনো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’র পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ট্রাম্পের ইরান বিপর্যয়ের কারণে হওয়া ক্ষতি এখন সীমাহীন বলে মনে হচ্ছে। বিশ্ব খুব কমই এমন দৃশ্য দেখেছে। একজন মদ্যপায়ী যেমন প্রতিবার নতুন করে মদ্যপান করার সময় ভাবে যে এবার ফলাফল ভিন্ন হবে, ট্রাম্পও তেমনি প্রতিদিন বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আগের কোনো হামলাই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে পারেনি। তিনি যত বেশি বোমা ফেলছেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী তত বেশি অনড় হচ্ছে। সংঘাত তত বেশি তীব্র ও বিস্তৃত হচ্ছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও একই সমালোচনা প্রযোজ্য। তিনি কখনোই যুদ্ধের মূল কারণ বা ভ্লাদিমির পুতিনের অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মাথা ঘামাননি। তিনি শক্তিশালী পক্ষকে সমর্থন জুগিয়েছেন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আধা-আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য চাপ দিয়েছেন। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে কিয়েভের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।

ট্রাম্পের সেই বোকামি, অধৈর্য ও দায়িত্বহীনতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে ইরানে।

এই পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পেরে ট্রাম্প এখন ছটফট করছেন। চলতি সপ্তাহের উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে জুনের একটি ‘পারস্পরিক সমঝোতা স্মারক’। এই চুক্তির মাধ্যমে মূল আলোচনার স্বার্থে ৬০ দিনের জন্য সংঘর্ষ স্থগিত রাখার কথা ছিল। ট্রাম্প এই চুক্তিকে নিজের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে প্রচার করেছিলেন।

কিন্তু ট্রাম্পের অন্য সব চুক্তির মতো এটিও ছিল মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। এখন এর পরিণতি স্পষ্ট হতে শুরু করায় তিনি পিছুটান দিচ্ছেন। তেহরান যে তাঁকে বিশ্বাস করে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসলে তাঁকে কে বিশ্বাস করে?

বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬।
ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের ইরান বিপর্যয়ের কারণে হওয়া ক্ষতি এখন সীমাহীন বলে মনে হচ্ছে। বিশ্ব খুব কমই এমন দৃশ্য দেখেছে। একজন মদ্যপায়ী যেমন প্রতিবার নতুন করে মদ্যপান করার সময় ভাবে যে এবার ফলাফল ভিন্ন হবে, ট্রাম্পও তেমনি প্রতিদিন বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আগের কোনো হামলাই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে পারেনি। তিনি যত বেশি বোমা ফেলছেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী তত বেশি অনড় হচ্ছে। সংঘাত তত বেশি তীব্র ও বিস্তৃত হচ্ছে।

এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। তিনি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-টোল আরোপের ঘোষণা দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার করে নেন। বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার তদারকি করছেন, যা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের মাধ্যমে লোহিত সাগর অবরোধের মতো মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই গভীর জলাভূমি থেকে কীভাবে রক্ষা পাবেন, তা ট্রাম্পের জানা নেই।

ইউরোপীয় মিত্ররা সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে, ওয়াশিংটনের শত্রুরা আনন্দে হাসছে, বিশ্ববাজার আতঙ্কিত এবং তেলের দাম আবার বাড়ছে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে আমেরিকার সুনাম ও প্রভাব কমছে। যখন কেউ আপনাকে সম্মান করে না, তখন পরাশক্তি হওয়া বেশ কঠিন।

নিজের সামরিক বিভ্রান্তির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ক্রেমলিনে বসে পুতিন আনন্দের সঙ্গে দেখছেন যে কীভাবে আমেরিকানরা ইউক্রেন থেকে দূরে, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধে তাদের মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, অর্থ ও শক্তি অপচয় করছে।

ট্রাম্পকে কে থামাবে? কংগ্রেস তাকে যুদ্ধ বন্ধ করতে অথবা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে বলেছে। তিনি তা উপেক্ষা করছেন। জরিপ বলছে, অধিকাংশ আমেরিকান এই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টিকারী সংকটের বিরুদ্ধে। তবু ট্রাম্প শুনছেন না।

ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলনে ট্রাম্পের তিরস্কারের শিকার হয়ে ব্যথিত মিত্ররা স্থায়ী ফাটলের ভয়ে তাঁকে থামাতে সাহস পাচ্ছে না। পোপ লিও তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এখন হয়তো কেবল প্রার্থনাই বাকি আছে।

নিজের সামরিক বিভ্রান্তির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ক্রেমলিনে বসে পুতিন আনন্দের সঙ্গে দেখছেন যে কীভাবে আমেরিকানরা ইউক্রেন থেকে দূরে, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধে তাদের মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর, অর্থ ও শক্তি অপচয় করছে।

আরও পড়ুন

পশ্চিমা জোটের মধ্যে ফাটল যত বাড়বে, পুতিন তত বেশি খুশি হবেন। আর চীনের মনোভাব নিয়ে যদি কারও সন্দেহ থাকে, তবে গত সপ্তাহে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দিকে তাকানো উচিত। চীন ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক ও নরম শক্তির দিক থেকে বিশাল সুবিধা পাচ্ছে। আজ হোক বা কাল, সি চিন পিং সামরিকভাবে এর ফায়দা তুলবেন।

ট্রাম্পের এই জটিল ধাঁধার সমাধান শেষ পর্যন্ত আমেরিকার জনগণকেই করতে হবে। তাঁরা তাঁকে নির্বাচিত করেছেন। তাঁরা এই বিপজ্জনক দানবকে বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হতে পারে।

  • সায়মন টিসডাল গার্ডিয়ানের কলামিস্ট। গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।