ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে যে প্রাথমিক চুক্তি হয়েছে, তাকে স্বাগত জানানো হলেও এটি কিছু কঠিন সত্য সামনে নিয়ে এসেছে।
ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ শুরু করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি চরম ভুল করেন। তিনি আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে এই যুদ্ধ চালিয়ে যান। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক—সব দিক থেকেই আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং আগামী বহু বছর ধরে এর কৌশলগত মূল্য চোকাতে হবে তাকে।
চুক্তির বিস্তারিত বিষয়গুলো এখনো অস্পষ্ট। তবে এখন পর্যন্ত এ চুক্তির যে রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্প যেসব শর্তের জন্য জেদ ধরেছিলেন, তিনি তার খুব কমই অর্জন করতে পেরেছেন। এটি তাঁর নিজের এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্যই অপমানজনকভাবে পিছু হটা।
এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প বারবার বলে আসছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জন করবে এবং ইরানকে ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’ করতে হবে। তিনি ইরানে সরকার পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানকে কোনোভাবেই ইউরেনিয়াম ‘সমৃদ্ধকরণ’ করতে দেওয়া হবে না এবং ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে মিলে তাদের মাটির গভীরে লুকিয়ে রাখা পারমাণবিক বোমা তৈরির উপযোগী সব উপাদান খুঁড়ে বের করবে ও তা সরিয়ে ফেলবে।’
চার মাসের এই যুদ্ধে ইরান এখন কৌশলগত বিজয়ী শক্তি। অবশ্য দেশটিকে বিশাল ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাদের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বড় অংশ, সামরিক-শিল্প সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বদের হারাতে হয়েছে। এমনকি যুদ্ধের প্রথম দিকেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইরান এখন নতুন করে তার নেতৃত্ব পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে পারবে।
কিন্তু এর কোনোটিই সত্যি বলে মনে হচ্ছে না। ইরানের কট্টরপন্থী সরকার এখনো বহাল তবিয়তে আছে। পারমাণবিক চুক্তির সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে দেশটির সঙ্গে আগামী দুই মাস আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। তবে শর্তগুলো দেখে মনে হচ্ছে, এটি ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করা চুক্তির মতোই হতে যাচ্ছে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে ২০১৮ সালে বাতিল করেছিলেন।
ওবামার সেই চুক্তিকে ট্রাম্প তখন ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে চুক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে এই চুক্তি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে নিয়ে যাচ্ছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করতে ইরানকে বাধ্য না করায় এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কারণে ওবামার চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। অথচ নিজেই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরুর পর এখন তাঁকে প্রায় একই রকম একটি চুক্তি মেনে নিতে হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির এই রূপরেখায় ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা। এর ফলে শেষ পর্যন্ত জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম কমবে। তবে এটি মূলত যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্ব অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে ইরান প্রতিশোধ হিসেবে এই প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছিল। তাদের সেই কৌশল কাজে দিয়েছে এবং ইরানের নেতারা এখন ভালোভাবেই বোঝেন যে তাঁদের হাতে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র রয়েছে।
সব মিলিয়ে, চার মাসের এই যুদ্ধে ইরান এখন কৌশলগত বিজয়ী শক্তি। অবশ্য দেশটিকে বিশাল ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাদের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বড় অংশ, সামরিক-শিল্প সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বদের হারাতে হয়েছে। এমনকি যুদ্ধের প্রথম দিকেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইরান এখন নতুন করে তার নেতৃত্ব পুনর্গঠনের কাজ শুরু করতে পারবে।
অন্যদিকে, বিশ্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্র আরও দুর্বল হিসেবে প্রমাণিত হলো। মার্কিন সামরিক বাহিনী বিপুল পরিমাণ দূরপাল্লার নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ব্যবস্থা) ব্যবহার করেও আকারে অনেক ছোট একটি প্রতিপক্ষকে দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিণতি অন্যান্য সম্ভাব্য শত্রুদের প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ায় তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা; এই যুদ্ধের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবে যা ফাটল ধরেছিল। একই সঙ্গে পেন্টাগনকেও আধুনিকায়ন করতে হবে এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে এর কোনোটিই হওয়ার সম্ভাবনা কম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার আগে, ইরানের নেতৃত্ব আড়াই বছর ধরে চরম দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার আগের তুলনায় দেশটির সরকার অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল (হামাসকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে অর্থ ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছে)। ওই হামলার জবাবে ইসরায়েল অভিযান চালিয়ে হামাস এবং ইরানের আরেকটি প্রক্সি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। সিরিয়ায় ইরান সমর্থিত এক স্বৈরশাসকের পতন ঘটে, অথচ তাকে বাঁচাতে ইরানের নেতারা কিছুই করতে পারেননি।
গত গ্রীষ্মে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়ে দেখিয়ে দেয় দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আসলে ‘কাগুজে বাঘ’ ছাড়া কিছু নয়। সেইসঙ্গে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অনেকটাই পিছিয়ে দেয়। একই সময়ে ইরানের মুদ্রার মান ক্রমাগত কমছিল এবং অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। গত বছরের শেষের দিকে ইরানের জনগণ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করলে সরকার হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে সেই আন্দোলন দমন করে।
ইরানের এই সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে এবং দেশটি তিন বছর আগের তুলনায় এখনো দুর্বল। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতে ইরানের কাছে যে দর-কষাকষির সুযোগ ছিল না, এই যুদ্ধ তাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। ইরানের সরকার প্রমাণ করেছে যে তারা তাদের দুই প্রধান শত্রুর একের পর এক হামলা সহ্য করেও টিকে থাকতে পারে। দেশটির নেতাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ত্যাগ করতে হয়নি। আর তারা এটাও বুঝে গেছে যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে তা পুনরায় খোলার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে বিশ্বের বাকি দেশগুলো মোটেও আগ্রহী নয়। আগামী মাস বা বছরগুলোতে ইরান যদি আবারও এই প্রণালী বন্ধ করে দেয়, ট্রাম্প তার জবাবে কী করবেন?
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাফসান গালিব