ট্রাম্প যেভাবে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নষ্ট করে দিলেন

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী পর্যন্ত দখল করে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার কথা বলছেনফাইল ছবি

গত ২৫ বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যত সামরিক ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে, তার মধ্যে ইরান যুদ্ধ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ায় চালানো সামরিক হস্তক্ষেপের মতো ছিল না। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান শুধু আরেকটি মার্কিন সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা থেকে টিকে যায়নি; যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ কখনোই কেবল একটি সরকারের ভাগ্য নির্ধারণের লড়াই ছিল না।

ইরানকে বশে আনতে ব্যর্থ হওয়ায় আরও বড় একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষা থমকে গেছে কিংবা ভেঙে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুনভাবে সাজানোর সেই প্রকল্প, যার নেতৃত্বে থাকত পুনর্জন্ম পাওয়া ও শক্তিশালী হয়ে ওঠা তথাকথিত ‘গ্রেটার ইসরায়েল’। এই কৌশলগত লক্ষ্যই ছিল আব্রাহাম চুক্তির মূল উদ্দেশ্য; আর যখন সৌদি আরব এতে স্বাক্ষর করতে পিছিয়ে যায়, তখন বিকল্প হিসেবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।

পরিহাস হলো, হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পই শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নষ্ট করে দিলেন।

আরও পড়ুন

খরগোশের গর্তে পতন

ট্রাম্পের জন্য নেতানিয়াহুর তৈরি করা রাজনৈতিক ‘ফাঁদ’ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন কিছু ছিল না; কিন্তু নেতানিয়াহুর জন্য ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তন ছিল এক ভয়াবহ বিপর্যয়, যার প্রভাব কয়েক প্রজন্ম ধরে অনুভূত হতে পারে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমে আসে। নিজের দলেও বিরোধিতা বাড়তে থাকে। উপসাগরীয় অর্থনীতির অচলাবস্থা ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থেও আঘাত হানে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন—যেখানে তিনি সহজেই কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন।

ট্রাম্প চেয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলা ধাঁচের দ্রুত বিজয়; কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে ইরান সহজে আত্মসমর্পণ করবে না, তখন ৮০ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট কার্যত মানসিকভাবে যুদ্ধ থেকে সরে যান। ইসরায়েলি যুদ্ধ সংবাদদাতারাও একই মত দেন। চ্যানেল থার্টিনের সামরিক প্রতিবেদক অ্যালন বেন ডেভিড বলেন, এই যুদ্ধ পুরো পরিস্থিতি উল্টে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে আমেরিকার সমর্থনে ইসরায়েলকে অঞ্চলের প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যেত। যুদ্ধের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে ইরান।

হারেৎজ–এর সামরিক বিশ্লেষক অ্যামোস হারেল লিখেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা ছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা। ডানপন্থী শক্তিগুলো তখন ‘ইসরায়েলকে একাই এগোতে হবে’ ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু করে, যা মন্ত্রিসভায়ও তোলা হয়।

এই ক্ষতে আরও নুন ছিটিয়ে ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, নেতানিয়াহুর তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ, ‘ইরানের যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, ইসরায়েল দুই ঘণ্টাও টিকত না।’ ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে ইসরায়েল বলে কিছু থাকত না।’

ইরানের কোম শহরের কাছে ফর্দো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরের দৃশ্য
ছবি: রয়টার্স

কৌশলগত ধাক্কা

ডানপন্থী বিরোধী দল ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগডর লিবারম্যান বলেন, ইসরায়েলের উচিত নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গঠন করা এবং মোসাদকে শুধু ইরানের সরকার উৎখাতের কাজে নিয়োজিত করা। অতি ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ঘোষণা দেন, সরকার উৎখাতের অভিযান ‘নিজেদের ও সৃজনশীল উপায়ে’ চালিয়ে যাওয়া হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, যিনি ভবিষ্যতে নেতানিয়াহুর উত্তরসূরি হতে পারেন, তিনি সাংবাদিক ও লেখক পিয়ার্স মরগানকে বলেন, ‘ইরানের সরকারকে বলতে চাই, আমি হব তোমাদের সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন।’

নেতানিয়াহুর এই কৌশলগত ব্যর্থতার পরও ইসরায়েলের আঞ্চলিক কৌশলের কিছু অংশ টিকে আছে। এর মধ্যে রয়েছে গাজা, দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ার দখল করা ভূখণ্ড, আবুধাবির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং সোমালিল্যান্ডকে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার। এই প্রকল্প আবারও চালু করা সম্ভব; কিন্তু নেতানিয়াহু যা হারিয়েছেন, তা হলো বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন; আর শিগগিরই এমন আরেকজন প্রেসিডেন্ট আসার সম্ভাবনা কম।

বিষাক্ত জোট

গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যা যদি পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েলকে শান্তিকামী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখার ধারণা ভেঙে দিয়ে থাকে, তবে ইরানের ওপর হামলা ওয়াশিংটনে সামরিক মিত্র হিসেবে ইসরায়েলের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। মতামত জরিপে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি রাজনৈতিক প্রচারণার ভাষাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ আইপ্যাক এখন ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে উঠছে। কম সংখ্যক নতুন রাজনীতিক এখন ইসরায়েলের অর্থ নিতে আগ্রহী। রিপাবলিকানদের মধ্যেও এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে যে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, যা আগে শুধু ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হিসেবে দেখা হতো।

এ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ইসরায়েলি লবি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক ও গোয়েন্দা জোটকে আইনের মাধ্যমে আরও স্থায়ী করার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আইনত ইসরায়েলের ‘গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব’ নিশ্চিত করতে হয়। এখন ইসরায়েলি লবি কংগ্রেসে এমন দুটি নতুন ব্যবস্থা যুক্ত করতে চাইছে, যা মার্কিন নীতিনির্ধারণে ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার দেবে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টে এমন একটি ধারা যোগ করা, যা মার্কিন সরকারের সব বিভাগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমন্বয়ের জন্য একটি নির্বাহী কাঠামো তৈরি করবে। আরেকটি আইন ইনটেলিজেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে ইসরায়েল ও যেসব আরব দেশ তার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে, তাদের মধ্যে ব্যাপক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

তৃতীয় কৌশল হলো এমন অস্ত্র ও প্রযুক্তি সরবরাহের ব্যবস্থা তৈরি করা, যা মার্কিন কংগ্রেকে পাশ কাটিয়ে করা যাবে।

এসবই মূলত এমন একটি সামরিক সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা, যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয়ের কাছেই নজরদারি ও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ফাইল ছবি: রয়টার্স

হেরে যাওয়ার টিকিট

আবারও দেখা গেল, ইসরায়েলকে সমর্থন করা এখন একধরনের চাপ প্রয়োগের রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ যেসব বিষয় মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা, সেখানে সামরিক অভিযানের যুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। ইসরায়েলকে সমর্থনের রাজনৈতিক দায় যত বাড়ছে, আমেরিকাকে নিজের পাশে রাখতে ইসরায়েলের জবরদস্তির প্রয়োজনও তত বাড়ছে; কিন্তু যেভাবেই দেখা হোক, ইসরায়েল এখন ‘হেরে যাওয়ার টিকিটে’ উঠে বসেছে।

ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে এবং তার কৌশলগত সক্ষমতা আরও বেড়েছে। তারা তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ধরে রাখতে পেরেছে, যদিও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ ছাড়তে হয়েছে। যেহেতু ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কখনোই পারমাণবিক বোমা তৈরির কর্মসূচি ছিল না এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বারাক ওবামার আমলে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যান, তার পরেই ইরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত শুরু করে। তাই এটি ইরানের জন্য বড় কোনো ছাড় নয়।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প হয়তো বারবার দাবি করবেন যে তিনিই তেহরানকে পারমাণবিক বোমা অর্জন করা থেকে থামিয়েছেন; কিন্তু ট্রাম্প বা মোসাদ কেউই কখনো ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে থামাতে পারবে না। প্রতিবছর যে সংখ্যক পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ইরান তৈরি করছে, তা এমন এক শক্তি, যাকে আর ‘বোতলে ভরা জিনের’ মতো আটকে রাখা সম্ভব নয়। ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারও ধরে রেখেছে, যা প্রতিরোধের ক্ষমতা হিসেবে কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ও নির্ভুল বোমা হামলাও এই সক্ষমতাকে ধ্বংস করতে পারেনি।

ইরানের আঞ্চলিক অরাষ্ট্রীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক এখন সম্ভবত আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী। যুদ্ধ এই জোটকে আরও কার্যকর যুদ্ধ ইউনিটে পরিণত করেছে, যারা সমন্বিতভাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে সক্ষম। নিরস্ত্রীকরণ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্ন; কিন্তু লেবাননের ক্ষেত্রে তা বাস্তবতা থেকে ততটাই দূরে, যতটা দূরে ইরান নিয়ে ট্রাম্পের ধারণা ছিল।

ইরান দেখিয়েছে, তাদের মিত্ররা কেবল ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার নয়, যাদের তেহরানের নির্দেশে চালু বা বন্ধ করা যায়; বরং ইরান তাদের মিত্রদের রক্ষায় সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইরান ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ক পারস্পরিক। এই সপ্তাহে দক্ষিণ বৈরুতের দাহিয়া এলাকায়, যা হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানে বড় করে লেখা ‘ধন্যবাদ’ বার্তাসহ আলী খামেনির পোস্টার টানানো হয়েছে।

বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬।
ছবি: রয়টার্স

উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর অনিশ্চয়তা

এসবের ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। তাদের সম্পদ ও অজেয় থাকার যে বুদ্‌বুদ ছিল, তা ফেটে গেছে। গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিল এখন কার্যত অর্থহীন। উপসাগরীয় নিরাপত্তাকাঠামো—যেখানে সামরিক ঘাঁটি, আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে নিরাপত্তার গ্যারান্টার হিসেবে তুলে ধরেছিল, তা ইরানি ড্রোনের বিরুদ্ধে খুব সীমিত প্রতিরক্ষা দিতে পেরেছে। এখন মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লাভের চেয়ে বোঝা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

যুদ্ধের সময় কাতারে বিতর্ক শুরু হয়েছিল দুই মেরুতে—মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান তদারককারী মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, নাকি হামাসকে বের করে দেওয়া হবে। তবে ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতারের ভূমিকা আপাতত এই কঠিন সিদ্ধান্তের আশঙ্কা কমিয়েছে। দেখা গেছে, কাতারের জন্য ইরানকে আক্রমণ না করার বিনিময়ে মূল্য দেওয়া অনেক সহজ ছিল—যে পথ বেছে নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া উপসাগরীয় সব রাষ্ট্রকেই বাস্তবতায় ফিরিয়ে এনেছে। বাহরাইন ও কুয়েতে আরব বসন্ত আমলের মতো বৈধতার সংকট এখনো রয়েছে; বিশেষ করে তাদের নিজস্ব শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ইরানের পুনরুত্থান এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ওমান ও কাতারের মতো কিছু দেশ, যারা এই চুক্তির মধ্যস্থতা করেছে, তারা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে; কিন্তু সবার একই কৌশলগত দুশ্চিন্তা—এখন তারা কার দিকে ঝুঁকবে? চীন, ভারত নাকি পাকিস্তান? তাদের বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি এখন নির্ভর করছে ইরানের সদিচ্ছার ওপর, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার বিষয়ে।

সব নজর এখন গাজায়

যদি ট্রাম্প নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন; অথবা ইসরায়েল আবার হামলা চালায়, তাহলে ইরান খুব সহজেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিশ্বের তেল, গ্যাস ও জ্বালানি পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ পথের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ইরান তার মূল্য আদায় করবেই। অনেক কিছু নির্ভর করবে ইরান কীভাবে তার প্রতিবেশীদের ওপর এই শক্তি প্রয়োগ করে। তাদের জন্য ভালো হবে যদি তারা ইসরায়েলের মতো ‘বিজয়ীই সব পাবে’ নীতি অনুসরণ না করে।

হতাশ নেতানিয়াহু আঞ্চলিক ক্ষমতা হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও তীব্র করতে পারেন। ফিলিস্তিনের জনগণ ইতিমধ্যেই ভয়াবহ বর্ণবাদী আচরণের শিকার। যেখানে ইসরায়েলি সেনারা ইচ্ছেমতো চেকপয়েন্টে তাদের হত্যা করছে। ফলে নেতানিয়াহু তার ভূমি খালি করার প্রকল্প আরও নির্মমভাবে এগিয়ে নিতে পারেন।

ইসরায়েল এখন ফিলিস্তিনিদের ধারাবাহিক হত্যাকারীতে পরিণত হয়েছে এবং যত বেশি হত্যা করছে, তত বেশি হত্যার চক্রে আটকে যাচ্ছে। ট্রাম্প কিংবা ব্যঙ্গাত্মকভাবে নাম দেওয়া তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ কেউই নেতানিয়াহুকে গাজা উপত্যকার আরও বড় অংশ দখল করা থেকে থামাতে পারবে না।

ইসরায়েলি হামলায় গাজা পরিণত হয়েছে এক ধ্বংসস্তূপে
ছবি: রয়টার্স

হামাস যেমন নিরস্ত্র হবে না, তেমনি হিজবুল্লাহ বা ইরানও হবে না। এমনকি ইসরায়েল পুরো গাজা পুনর্দখল করলেও মূল সমস্যা একই থাকবে। গাজা দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের সামাজিক বন্ধন এতটাই শক্তিশালী যে নজিরবিহীন দমন-পীড়নও তা ভাঙতে পারেনি। গাজা ভেঙে পড়বে না। প্রতিটি পরিবার এখন তাদের দাফন না হওয়া স্বজনদের কবরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁরা এই ভূমি ছাড়বে না।

যদি নেতানিয়াহু আবার গাজায় হামলা শুরু করেন, তাহলে বিশ্ব জনমত আবারও বিস্ফোরিত হবে। ইসরায়েলের অর্থনীতি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক বর্জন মোকাবিলার মতো অবস্থায় নেই।

মধ্যপ্রাচ্য সত্যিই বদলে গেছে; কিন্তু নেতানিয়াহু যেমন চেয়েছিলেন, তেমনভাবে নয়। ইরানের ওপর হামলা গত ২৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বড় কৌশলগত বিভাজন তৈরি করেছে। এর ফলে ইরানের ‘সফট পাওয়ার’ বেড়েছে। ফিলিস্তিন, লেবানন এবং পুরো অঞ্চলে প্রতিরোধের মনোভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে, যদিও সিরিয়া আর ইরানের বলয়ে নেই।

অবিরাম যুদ্ধ ও সম্প্রসারণবাদী মতাদর্শ নিয়ে ইসরায়েল খুব দ্রুতই একা নিজের সামরিক শক্তির সীমায় পৌঁছে যাবে। তখন পিছু হটা অনিবার্য হবে—সিরিয়ায় যেমন, শেষ পর্যন্ত লেবাননেও তেমন। এমন একটি প্রকল্পে যাত্রা শুরু করাটাই হয়তো শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে প্রমাণিত হবে।

  • ডেভিড হার্স্ট মিডলইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক।

মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত এবং কিছুটা সংক্ষেপিত