খামেনি এক ‘ভয়ংকর ফাঁদে’ আটকে পড়েছেন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

ইরানে চলমান সর্বশেষ প্রতিবাদের ঢেউ শুরু হওয়ার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে দেশটি টানা ১০ দিনের বেশি সময় ধরে বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। শুধু ইন্টারনেটই নয়, ল্যান্ডফোন ও মুঠোফোন সংযোগও কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তবু স্টারলিংক স্যাটেলাইট সংযোগের মাধ্যমে টুকরা টুকরাভাবে পাঠানো যেসব অল্প কিছু ছবি বাইরে এসেছে, সেগুলোয় বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সামরিক কায়দার দমন-পীড়ন দেখা যাচ্ছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, রাস্তায় রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে আর শোকাহত মায়েরা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

এ অবস্থায় দেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন এবং পরিস্থিতি কি শেষ পর্যন্ত বড় কোনো যুদ্ধে গড়াবে?

আরও পড়ুন

বিক্ষোভ শুরুর পর খামেনি যে দুটি ভাষণ দিয়েছেন, তাতে তাঁর অবস্থান ছিল কঠোর ও অনড়। তিনি স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই আন্দোলনের পেছনে দায়ী করেছেন। তিনি তাদের ‘পরিণতি ভোগ করতে হবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ ও ‘সরল মানুষ’ আখ্যা দিয়েছেন, যাঁরা নাকি বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় ভুল পথে পরিচালিত হয়েছেন।

ইরানিদের কাছে এই ভাষা খুবই পরিচিত। ১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন, ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট কিংবা ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন—প্রতিবারই খামেনি প্রায় একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

এসব ভাষণ সাধারণত প্রতিবাদকারীদের থামাতে পারে না। আসলে এর মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপত্তা বাহিনীকে আশ্বস্ত করা যে সর্বোচ্চ নেতা এখনো দৃঢ়ভাবে ক্ষমতায় আছেন।

খামেনি এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যা টিকে থাকে কেবল দমন-পীড়নের মাধ্যমে। কিন্তু সেই রক্তক্ষয়ী দমনই রাষ্ট্রের শেষ অবলম্বন, ইরানি দেশপ্রেমকে ধ্বংস করে দিয়েছে। যে নেতা কখনো পিছু হটতে রাজি হননি, তিনি এখন এমন এক সংকটে পড়েছেন, যার কোনো সহজ বা পরিষ্কার পথ নেই।

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, খামেনিই সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং বাসিজ নামের আধা সামরিক বাহিনী। নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণই দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ক্ষমতার মূল ভিত্তি।

বছরের পর বছর ধরে খামেনি অবিশ্বস্ত সদস্যদের সরিয়ে দিয়েছেন এবং একেবারে অনুগত এক সামরিক এলিট শ্রেণি গড়ে তুলেছেন। এমনকি এসব বাহিনীর সদস্যদের পরিবারও কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকে। তাঁদের অনেককে আলাদা আবাসন এলাকায় রাখা হয়—যার উদ্দেশ্য একদিকে নিরাপত্তা, অন্যদিকে নজরদারি।

এর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের ওপরও খামেনির সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিছু তথাকথিত বেসরকারি টিভি চ্যানেল চালু হলেও সেগুলোও কঠোর সেন্সরের আওতায়।

আরও পড়ুন

সত্যি বলতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তথ্য নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তুলেছে। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট বিস্তারের ফলে প্রতিবাদ আন্দোলনের ধরন বদলে গেছে। কিন্তু ইরান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। অধিকাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেখানে বন্ধ, কেবল ভিপিএন ব্যবহার করলেই ঢোকা যায়।

তার ওপর সংকটের সময় সরকার বারবার পুরো ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০১৯ সালের নভেম্বরের আন্দোলন। তবে এবার সেই ইন্টারনেট বন্ধ আরও দীর্ঘ হয়েছে এবং কবে সংযোগ ফিরবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

আন্দোলনের চূড়ান্ত সময়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে সরকার একদিকে খবরের বয়ান নিয়ন্ত্রণ করছে, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে উঠতে দিচ্ছে না। মাত্র হাতে গোনা কিছু মানুষ, যাঁদের স্যাটেলাইট সংযোগ আছে, তাঁরা দমন-পীড়নের ভয়াবহতা ও ব্যাপ্তি বাইরে জানাতে পেরেছেন।

খামেনির আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছিল স্বাধীন রাজনৈতিক ও নাগরিক শক্তিগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া। গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তি এখন কারাগারে, অথবা সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে। অনেকের পায়ে ইলেকট্রনিক ট্র্যাকার পর্যন্ত লাগানো। বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী নাসরিন সুতুদেহ দীর্ঘ কারাবাসে গুরুতর অসুস্থতায় ভুগেছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নার্গেস মোহাম্মদিকে বারবার গ্রেপ্তার করে আবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

এর ফলাফল হলো একটি শোকস্তব্ধ দেশ। আবারও দেখা গেল, তরুণদের সঙ্গে তাঁদের বাবা-মায়েরাও রাস্তায় নেমেছেন আর তার মূল্য দিতে হয়েছে নিহত হওয়া, আহত হওয়া কিংবা কারাবরণ দিয়ে। আটক ব্যক্তিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াতে পারছেন না। কারাগারের চিকিৎসকদের আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেকে আঘাতে মারা যাচ্ছেন। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে লাশ নিতে হলে গুলির দাম পর্যন্ত দিতে হচ্ছে, তারপর কঠোর নজরদারির মধ্যে দাফন করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

তবে এবার পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে অনেক ইরানি (যাঁরা সরকারবিরোধী) তা–ও ইসরায়েলের সমালোচনা করেছিলেন এবং যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। দেশে একধরনের দেশপ্রেমের জোয়ার এসেছিল। ইসরায়েল বলেছিল, তারা শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু ও সরকার–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, কিন্তু তবু জনগণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি। সেই নাজুক দেশপ্রেমের অনুভূতিই এবার ভেঙে গেছে।

আরও পড়ুন

অভূতপূর্ব দমন-পীড়ন এবং প্রায় ১২ হাজার মানুষ নিহত হওয়ার খবর মানুষের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। অনেক ইরানি এখন মনে করছেন, নিরস্ত্র আন্দোলন দিয়ে আর এই স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়; বাইরের হস্তক্ষেপই হয়তো একমাত্র পথ। তাঁদের যুক্তি, যদি দেশের ভেতরেই ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করা যায়, তাহলে লক্ষ্যভিত্তিক বিদেশি হামলার ক্ষতি হয়তো এর চেয়ে বেশি হবে না।

এই নির্মম দমন-পীড়ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে জনমত আরও কঠোর করেছে। একই সঙ্গে এই দমন-নির্যাতন ইরানিদের মধ্যেও আগের সেই স্বতঃস্ফূর্ত দেশপ্রেমের জায়গা দুর্বল করে দিয়েছে।

এই অর্থে খামেনি নিজেই নিজের জন্য এক ফাঁদ তৈরি করেছেন। ভেতরে তিনি ভয়াবহ শক্তি প্রয়োগ করে আপাতত নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছেন, ব্যবস্থা ভেঙে পড়া ঠেকিয়েছেন। কিন্তু এর ফলে তাঁর সামনে পথ সংকুচিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে যদি আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে তিনি এমন এক সমাজের মুখোমুখি হবেন, যারা আর রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী নয়; বরং বাইরের সংঘাতের মূল্য মেনে নিতেও প্রস্তুত।

খামেনি এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যা টিকে থাকে কেবল দমন-পীড়নের মাধ্যমে। কিন্তু সেই রক্তক্ষয়ী দমনই রাষ্ট্রের শেষ অবলম্বন, ইরানি দেশপ্রেমকে ধ্বংস করে দিয়েছে। যে নেতা কখনো পিছু হটতে রাজি হননি, তিনি এখন এমন এক সংকটে পড়েছেন, যার কোনো সহজ বা পরিষ্কার পথ নেই। খামেনিকে এখন হয় নিজের জনগণের বিরুদ্ধে লাগাতার যুদ্ধ করতে হবে, নয়তো বাইরের শক্তির যুদ্ধ মোকাবিলা করতে হবে; যদিও তা করতে গেলে তাঁর শাসনব্যবস্থার পচন ও ভঙ্গুরতাকে একেবারে উদোম করে দেবে।

  • পেগাহ বানিহাশেমি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সাংবিধানিক আইন–গবেষক এবং মানবাধিকার আইন প্রশিক্ষক

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ