১৮৮৫ সালে বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ড আফ্রিকার খনিজসমৃদ্ধ দেশ কঙ্গো আক্রমণ করে নিজ দখলে নিয়ে আসেন। কেন এই আক্রমণ, তার যুক্তি হিসেবে বলেছিলেন, দেশটি একদিকে অসভ্য, অন্যদিকে অরক্ষিত। দেশটিকে সভ্য ও খ্রিষ্টান বানাতে এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। ১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত এই কঙ্গো ছিল কিং লিওপোল্ডের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এরপর আরও ৫০ বছর দেশটি বেলজিয়ামের কলোনি ছিল।
কঙ্গোর মানুষ এই দখলদারি মেনে নেয়নি। প্রায় ৭৫ বছর একটানা লড়াইয়ের পর ১৯৬০ সালে তারা বেলজিয়ামের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। তাদের সেই লড়াইয়ের এক নায়কের নাম প্যাট্রিক লুমুম্বা। অন্যদিকে পৃথিবীর মানুষের কাছে কিং লিওপোল্ডের একটাই পরিচয়—তিনি একজন কসাই।
সেই ঘটনার প্রায় ১৫০ বছর পর আরেক খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ওপর নজর পড়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপ, যা সীমানার হিসাবে তিনটি টেক্সাসের সমান, বর্তমানে ডেনমার্কের অন্তর্গত একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। খনিজ সম্পদে কঙ্গোর চেয়েও ধনী। গ্রিনল্যান্ডের মানুষ আমেরিকার অংশ হতে চাক বা না চাক, ট্রাম্পের সে অঞ্চল চাই-ই চাই। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই তাঁর গ্রিনল্যান্ড দরকার। আমেরিকা এটা দখলে না নিলে চীন বা রাশিয়া সেখানে থাবা বসাতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড কেনার ভাবনাটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মাথায় ঢোকান তাঁর এক বন্ধু, প্রসাধন কোম্পানি অ্যাস্টো লাউডারের অন্যতম উত্তরাধিকারী রোনাল্ড লাউডার। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ট্রাম্পের প্রধান পরিচয় ছিল একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হিসেবে। ঘরবাড়ি, হোটেল, গলফ কোর্স বানাতে তাঁর জুড়ি নেই।
রোনাল্ড লাউডার তাঁকে বোঝালেন, ‘হোটেল-ফোটেল দিয়ে ইতিহাসে নাম লেখানো যাবে না। তার চেয়ে তুমি গ্রিনল্যান্ড কিনে নাও, এমন দামি রিয়েল এস্টেট পৃথিবীতে দুটো নেই।’ প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই তিনি গ্রিনল্যান্ড কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর কথা শুনে ডেনমার্কের রাজা মৃদু হেসেছিলেন। আরও জোরে হেসেছিলেন গ্রিনল্যান্ডের হাজার পঞ্চাশেক মানুষ। ট্রাম্প ডেনমার্ক সফরে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে দেশের মানুষের এমন দুর্ব্যবহার দেখে রেগেমেগে সে সফর বাতিল করে দিয়েছিলেন।
২০২৫ সালে ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট। এবার অবস্থা ভিন্ন। এবার শুধু হোয়াইট হাউস নয়, কংগ্রেসের উভয় কক্ষ এবং মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট—সবই তাঁর নিয়ন্ত্রণে। তাঁর নিজ দলের বড় বড় নেতা তাঁর কথায় ওঠে–বসে। তিনি আবার গ্রিনল্যান্ড নিজ দখলে আনার প্রস্তাব তুললেন। হয় কিনে নেবেন, তাতে রফা না হলে দখল করে নেবেন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ও গ্রিনল্যান্ডের মানুষ এবারও সাফ জানিয়ে দিলেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।
গ্রিনল্যান্ড দাবি করায় শুধু ডেনমার্ক নয়, সামরিক জোট ন্যাটোর সব সদস্যই বিপদে পড়েছে। ৩১টি দেশ নিয়ে ন্যাটো, যুক্তরাষ্ট্র তার নেতা। সেই যুক্তরাষ্ট্রই যদি আরেক মিত্রের দিকে হাত বাড়ায়, তাহলে জোট টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। তদবিরের জন্য ওয়াশিংটনে ছুটে এলেন ডেনমার্ক ও সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী, সম্ভবত পায়ে ধরা ছাড়া আর সবই করলেন। কাজ হলো না। আলোচনা শেষে তাঁরা জানালেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের মৌলিক মতভেদ রয়েছে।
বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের খটমটানি আগে থেকেই লেগে ছিল। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হলো গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি। নিজেদের শিরদাঁড়া আছে, তা বোঝাতে ইউরোপের আট দেশ মিলে প্রথমে নরম–গরম কথা বলল, ঘোষণা দিয়ে জানাল, জান দিয়ে হলেও গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে তারা। শুধু কথায় নয়, কাজেও তারা অনড় প্রমাণের জন্য এই আট দেশ গ্রিনল্যান্ডে কিছু সৈন্য পাঠাল, আর মুখে বলল, দেশটির ওপর চীন বা রাশিয়ার হামলা ঠেকানোর প্রস্তুতি হিসেবেই তাঁদের পাঠানো হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বোকা নন, তাঁর আইকিউ বিশ্বে এক নম্বর, এ কথা কার না জানা। ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি ঠিক করলেন, এই আট দেশের ওপর অতিরিক্ত বাণিজ্য শুল্ক বসাবেন, প্রথমে ১০ শতাংশ। তাতে কাজ না হলে জুন থেকে আরও ২৫ শতাংশ। গ্রিনল্যান্ড তাঁর চাই-ই চাই। কী একটা অবস্থা ভাবুন!
অনেকেই বলছেন গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে ট্রাম্পের আবদার উনিশ শতকীয় উপনিবেশবাদের নতুন রূপ। তারা একে অপরের সীমানা দখলে নেবে না, সে কথা ইউরোপের ‘সভ্য’ দেশগুলো সেই ১৬৪৮ সালে তাদের স্বাক্ষরিত ‘ওয়েস্টফালিয়া শান্তি চুক্তি’র মাধ্যমে মেনে নিয়েছে। তারপরও অবশ্য দুটো মহাযুদ্ধ হয়েছে। সেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ১৯৪৫ সাল থেকে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তার মোদ্দাকথা হলো, ছোট–বড় কোনো দেশই আক্রান্ত না হলে অন্যের ওপর চড়াও হবে না। অন্যের জায়গা বা সম্পদের ওপর নজরও দেবে না।
১৯৪৫ সালে ৫১টি স্বাধীন দেশ মিলে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করে, তার সনদের প্রথম ধারাতেই প্রতিটি দেশকে আঞ্চলিক অখণ্ডতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। ডেনমার্কের অংশ হলেও গ্রিনল্যান্ড একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, এর বাসিন্দাদের সম্মতি ছাড়া তা বেদখল বেআইনি। ১৯৭০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ তার ২৬২৫ নম্বর সিদ্ধান্তে সে কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলে, যত ধনী বা বলবান হও না কেন, অন্য অঞ্চল দখলের কোনো অধিকার কারও নেই।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন, তাতে একে জন–অধ্যুষিত কোনো অঞ্চল নয়, স্রেফ একটি ‘রিয়েল এস্টেট’ হিসেবে ভাবা হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে অন্য দেশকে দেশ না ভেবে সম্পত্তি ভাবা হতো। সে দেশের মানুষ নয়, তার সোনাদানাই মুখ্য। এখানেও তা–ই। পৃথিবীর এক নম্বর দেশ, আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার প্রধান রক্ষক যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই এমন দাবি যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনি অনৈতিক।
এত গেল আইনের কথা, এর বাইরে রয়েছে নৈতিকতার প্রশ্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন, তাতে একে জন–অধ্যুষিত কোনো অঞ্চল নয়, স্রেফ একটি ‘রিয়েল এস্টেট’ হিসেবে ভাবা হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে অন্য দেশকে দেশ না ভেবে সম্পত্তি ভাবা হতো। সে দেশের মানুষ নয়, তার সোনাদানাই মুখ্য। এখানেও তা–ই। পৃথিবীর এক নম্বর দেশ, আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার প্রধান রক্ষক যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই এমন দাবি যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনি অনৈতিক।
বিষয়টি জটিল ও বিব্রতকর—কথাটা মাথায় রেখে ডেনমার্ক ভেবেচিন্তে পা ফেলার কথা ভাবছে। তারা জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তাই যদি ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হয়, তাহলে দ্বীপটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সে ও ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলো প্রস্তুত। ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে যে নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তাতে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক স্থাপনা নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাপক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। তারা চাইলে সেখানে ১৪টি সামরিক ছাউনি বসাতে পারে।
ট্রাম্পের অতি অনুগত ‘মাগা-বেইস’ ছাড়া অধিকাংশ ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ মার্কিন প্রেসিডেন্টের আবদারের প্রতিবাদ জানিয়েছে। বর্ষীয়ান রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটোতে ভাঙন ধরাবে, যা আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী। একই কথা বলেছেন ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস মার্ফি। মার্কিন সিনেটে একদল রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক সদস্য একযোগে একটি প্রস্তাব এনেছেন, কংগ্রেসের সমর্থন ছাড়া সৈন্য পাঠিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা হলে সে কাজে আইনত কোনো অর্থ বরাদ্দ করা হবে না।
তবে গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে ট্রাম্পের একগুঁয়েমিতে খুশি রাশিয়া ও চীন। ফলে ন্যাটো দুর্বল হবে, ইউরোপ বনাম আমেরিকার বিবাদ বাড়বে। রাশিয়ার নজর প্রতিবেশী ইউক্রেন ও চীনের নজর তাইওয়ানের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র যদি জোর করে অন্য দেশ দখল করে, তাহলে তাদের বেলায় সেই একই কাজে আপত্তি ধোপে টিকবে না, এমন আশা তারা করতেই পারে। শুধু চীন বা রাশিয়া কেন, ভারতের মতো ছোটখাটো পরাশক্তিও সেই একই কৌশলগত নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে যদি তার প্রতিবেশী দেশের ওপর থাবা বসায়, তাহলে কারও ধমক ভারত মাথায় নেবে কেন?
তবে সম্মতি ছাড়া অন্য দেশ দখলের ফল ভালো নয়, সে কথা খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে সতর্ক করেছিলেন গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইডস। তিনি লিখেছেন, খ্রিষ্টপূর্ব ৪১৬ সালে এথেন্সের শাসক দল প্রতিবেশী ক্ষুদ্র দ্বীপ মেলস আক্রমণ করে বসে। স্পার্টার বিরুদ্ধে লড়াইতে তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে রাজি করাতে এই আক্রমণ। মেলসের রাজন্যবর্গ এথেন্সের হাত-পা ধরে বলল, ‘আমরা দুর্বল, আমাদের ছেড়ে দাও, তোমাদের ঝগড়ায় আমাদের জড়িয়ো না।’ এথেন্সের পক্ষ থেকে সাফ বলা হলো, শক্তিশালী দেশের যা খুশি করার অধিকার রয়েছে। দুর্বল দেশের তা মেনে নেওয়া ভিন্ন কোনো পথ নেই।
এথেন্স মেলস দখল করেছিল, সে কথা ঠিক। কিন্তু মাত্র ১২ বছর যেতে না যেতেই স্পার্টার হাতে পরাস্ত হয় এথেন্স, ভেঙে পড়ে তাদের মহাপরাক্রমশালী সাম্রাজ্য। সে ঘটনা উল্লেখ করে থুসিডাইডস লিখেছেন, অন্য কেউ নয়, এথেন্স নিজেই নিজের পতন ডেকে আনে। এর জন্য দায়ী তার নিজের ঔদ্ধত্য।
● হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
