জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশে চলছে একটি উৎসবের আমেজ। বিশেষ করে ছোট ছোট চায়ের দোকানে ঢুকলে নির্বাচনের আমেজ যে এখন সাধারণ মানুষের চিন্তাজগতের পুরোটা জুড়ে আছে, সেটা বেশ ভালোভাবেই বোঝা যায়। নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত এবং ছাত্রছাত্রীদের একটি অংশ এখনো চায়ের কাপে রাজনীতির ঝড় তুলতে বেশ অভ্যস্ত। যে সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে যেন আড্ডার একটা বড় অংশজুড়ে থাকত।
ছোট দোকানিরা এই চায়ের কাপে রাজনীতির আলাপ পছন্দ না করলেও তাঁদের চায়ের কাটতির জন্য তাঁরা আমাদের এই অত্যাচার সহ্যই করতেন। আবার কেউ কেউ দোকানের ভেতরে আঁকাবাঁকাভাবে লিখে রাখতেন, ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ’। এরপরও এই রাজনৈতিক আলাপেই যেন এক ভীষণ তীব্রতা অনুভব করতাম।
একটা দীর্ঘ সময় আমরা নির্বাচনের সেই উৎসব থেকে বঞ্চিত হলেও ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন আবারও আমাদের মধ্যে ধীরে ধীরে সেই হারিয়ে যাওয়া উৎসবের স্বাদ নিয়ে এসেছে। নির্বাচন নিয়ে অনেকের মধ্যে কিছু হতাশা ও রাজনৈতিক সহিংসতার আতঙ্ক থাকলেও বেশির ভাগের মধ্যে সেই উৎসবের আমেজ দৃশ্যমান।
এবার আওয়ামী লীগের নির্বাচনে না থাকা তাদের সমর্থকদের জন্য হতাশারও বটে। এ সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যে নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে আকৃষ্ট করতে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা। বাংলাদেশের বর্তমানের দুটি বড় রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় নিজ নিজ দলের পক্ষ থেকে দেশের মানুষের প্রতি তাদের কী কী ধরনের প্রতিজ্ঞা রয়েছে, সেগুলো দিয়ে তাদের মন জয় করার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়।
নির্বাচনী প্রচারণায় ভোটারদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের যেন কোনো কার্পণ্য থাকে না। সামর্থ্য ও সমাজের চাহিদা অনুযায়ী চলত ভোটারদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা। মনে পড়ে, ছোটবেলায় গ্রামীণ নির্বাচনে প্রার্থীদের সৌজন্যে ফ্রি গুড়ের চায়ের ব্যবস্থা থাকত। সেই চায়ের স্বাদ ও আমেজ আজও স্মৃতিতে রয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমানের নির্বাচনী প্রচারণা সময়ের সঙ্গে অনেক বদলে গেছে, যা আর আগের মতো নেই বরং এটাই স্বাভাবিক।
আধুনিক প্রযুক্তি এবং গ্লোবালাইজেশন নির্বাচনী প্রচারণায় বদলের বড় কারণ। ডিজিটাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণার ক্ষেত্রে এক বিরাট সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, বিশেষ করে তরুণদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে। তাই হয়তো প্রথাগত পেশিশক্তির বিপরীতে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের আকৃষ্ট করার প্রবণতা দেখতে পাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন হয়ে উঠছে জনপ্রিয়তার বয়ান তৈরির একটি মাধ্যম।
এসব নানা কারণে রাজনৈতিক প্রচারণায় টাকার খেলা যেন বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক প্রাসঙ্গিক। আর তাই তো কোন প্রার্থী কত বেশি খরচ করছেন, তা নিয়েও প্রার্থীদের মধ্যে শুরু হয় নির্বাচনী প্রতিযোগিতা। টাকা ছাড়া নির্বাচন সম্ভব না বলেই হয়তো জুলাই–পরবর্তী সময়ে অনেক নতুন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে জনগণের কাছ থেকে টাকা তোলার হিড়িক দেখা যায়, যা দিয়ে তাঁরা তাঁদের রাজনৈতিক ব্যয় নির্বাহ করবেন বলে প্রচার করছেন। এ যেন ‘কইয়ের তেলে কই ভাজা’।
নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করার বিষয়টি যেন একটি লম্বা রেসের মতো, যেখানে প্রতিদিনের প্রচারণা এবং ধারাবাহিকতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যে দল তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়ে জনগণের মন জয় করতে পারবে, তারাই যেন শেষ হাসি হাসবে।
একে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন নির্বাচনী মডেলের আবির্ভাব বলা যায়। এটা কতটা নৈতিক এবং যৌক্তিক, সে বিষয়ে খুব আলাপ না হলেও এটা যে একটা ট্রেন্ড তৈরি করতে পেরেছে, সেটা বলাই বাহুল্য। ঠিক এসব কারণে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যে আমজনতার কাজ নয়, সেটি আমরা সবাই অনুধাবন করতে পারি। রাজনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে এখানে অর্থনৈতিক সক্ষমতাও জরুরি।
প্রার্থীদের এসব নানা নির্বাচনী প্রচারণা ভোটারদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা প্রভাবক হিসেবে কাজ করে সেটি একটি প্রশ্ন। ভোটারদের ভোটের সিদ্ধান্তের ধরন নিয়ে পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডে নানা গবেষণা হলেও, আমাদের দেশে এ নিয়ে খুব একটা আলাপ–আলোচনা দেখা যায় না। আমরা বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে নির্বাচনের আগে আগে কিছু জরিপভিত্তিক গবেষণার তথ্য–উপাত্ত নিয়ে মিডিয়ায় নানা আলাপ ও আলোচনা দেখি। এখানে মূলত সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়।
অনেক সময় এই জরিপগুলো তাদের গবেষণাপদ্ধতির সীমাবদ্ধতার কারণে সমালোচিতও যে হয়, তার নমুনা আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি। এমন জরিপ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ইতিবাচক বয়ান তৈরির একটা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তবে নির্বাচনে ভোটের ধারণাগত জরিপের ফলাফল শেষ পর্যন্ত ভোটের সময় ভিন্ন হতে পারে, কেননা একজন প্রার্থীকে মানুষের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তে বদলে যেতে পারে, যা এ ধরনের জরিপ তুলে আনতে পারে না।
তবে আমরা দেখেছি, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ একজন প্রার্থীর চেয়ে রাজনৈতিক দলকে সামনে রেখে সেই দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে থাকে। যে কারণে আমরা অনেক সময়ই দেখি, একজন ভালো বা যোগ্য প্রার্থী কেবলমাত্র ভিন্ন রাজনৈতিক দল বা ছোট বা কম জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হতে পারেন না।
তবে অঞ্চলভেদে এর কিছু তারতম্য আমরা লক্ষ করি, বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় এখনো আমাদের দেশে জ্ঞাতি সম্পর্কের ভিত্তিতে ভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে একটি গ্রামের মানুষ তার জ্ঞাতি–গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত একজন প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এমন প্রেক্ষাপটে দলের থেকে প্রার্থীর গুরুত্ব তাঁদের কাছে বেশি থাকে। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় গ্রামপ্রধান বা গ্রামের মাতব্বরদের সিদ্ধান্তও একটি গ্রামের মানুষ শুনে থাকেন, যা আমাদের গ্রামীণ সমাজের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সম্পর্কের প্রতিফলন।
ভোট কেবল একটি অধিকার নয়, এটি ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতা কিংবা দলের সঙ্গে জনতার একটি অস্থায়ী দর–কষাকষির একটি সুযোগ। আমাদের মতো শ্রেণি বিভাজিত সমাজে শুধু এ সময়টাতেই ভোটাররা বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করেন। তাই হয়তো নির্বাচনের সময়, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণে দলগুলোর আগ্রহ যেন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি থাকে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গুরুত্ব এই সময় অনেক বেড়ে যায় এবং রাজনৈতিক নেতারা নমনীয় হয়ে জনগণের কথা শোনার আগ্রহ প্রকাশ করেন, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অতটা থাকে না। সেটা আমরা অতীতের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। ভোটাররা তাঁদের এই শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বলেই আমরা নির্বাচনে ফলাফলের তারতম্য দেখি।
এর পাশাপাশি আমরা দেখি দেশের প্রান্তিক এবং গ্রামীণ সমাজের ধর্মীয় সহানুভূতি অর্জনের ধারণাকে কেন্দ্রে রেখে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো, যা আমাদের নির্বাচনী প্রচারণার সংস্কৃতির অংশ। যেমন ধর্মভিত্তিক দলে বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিলে ‘জান্নাতে যাওয়ার’ প্রচারণা সাম্প্রতিক সময়ে জনমনে বেশ বিতর্ক তৈরি করে। আবার অনেক রাজনীতিবিদের একটি চলমান কৌশল হলো ইসলামকে সাধারণ অর্থে প্রতিনিধিত্ব করে তেমন পোশাক পরিধান করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো। যেমন মাথায় টুপি পরা, পাজামা–পাঞ্জাবি পরা বা মেয়েদের মাথায় কাপড় দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো।
নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করার বিষয়টি যেন একটি লম্বা রেসের মতো, যেখানে প্রতিদিনের প্রচারণা এবং ধারাবাহিকতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যে দল তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়ে জনগণের মন জয় করতে পারবে, তারাই যেন শেষ হাসি হাসবে।
বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব
