বড়দের রাজনীতি, ছোটদের মৃত্যু

হামসহ অন্যান্য জটিলতার কাছে হার মানতে হয়েছে সাদমানকে। শিশুটির মরদেহ এভাবে চাদরে ঢেকে বাড়ির পথে তার এক স্বজন। আলোচিত এই ছবি রাজধানীর মহাখালী এলাকা থেকে তোলেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকার।

২০২২ সালে বিল গেটস একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন—হোয়াই ডু চিলড্রেন ডাই? প্রবন্ধের এক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন, ‘হ্যাঁ, এটা সত্য, এখনো বিশ্বে শিশুরা নানা রকম রোগবালাইয়ে মারা যায়, কিন্তু এটা একটা খণ্ডিত সত্য। আসল সত্য হলো শিশুরা যে এসব রোগে মারা যায়, তার কারণ নিহিত রয়েছে তারা কোন দেশে জন্মেছে তার ওপর!’

বাংলাদেশের হতভাগ্য শিশুরা এই নির্মম সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শুধু এই দেশে জন্মেছে বলেই এ বছর মার্চ–এপ্রিলে হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগে ঝরে গেল দুই শর কাছাকাছি শিশুর প্রাণ।

সাম্প্রতিক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯ হাজার ১৬১ সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত রোগী পাওয়া গেছে ২ হাজার ৮৯৭টি। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬৬টি শিশুর। (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো)

এভাবেই কলমের এক খোঁচায় মৃত্যুদণ্ড লেখা হয়ে যায় আমাদের শিশুদের। শিশুরা তা কখনো জানতেই পারেনি, পারবেও না। হ্যাঁ, এই শিশুদের অপরাধ যে তারা জন্মেছে এই দেশে।

অথচ এ দেশের বাবা–মায়েরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন শেষ কবে হামের কারণে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছিল এভাবে। ১৯৯০ সালে বিশ্বজুড়ে শিশুমৃত্যুর চতুর্থ কারণ ছিল হামজনিত মৃত্যু, দুনিয়াতে বছরে পাঁচ লাখ শিশু মারা যেত হামজনিত জটিলতায়। কিন্তু এর পরের ৩০ বছরে এই মৃত্যু স্রেফ ৮৭ শতাংশ কমে গেল। কোন জাদুতে এই ঘটনা ঘটেছিল? এই জাদুর নাম টিকা।

২০০০ সালে গ্যাভি ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স বিশ্বজুড়ে ৫০০ মিলিয়ন শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার এক মহাযজ্ঞ শুরু করে। রুটিন টিকা কার্যক্রমের পাশাপাশি শুরু হয় বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন। দেশে দেশে শুরু হয় এই যজ্ঞ, ধনী দেশগুলো এগিয়ে আসে দাতা হিসেবে, দরিদ্র ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সরকার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো ব্যাপক হারে টিকা প্রস্তুত ও সরবরাহ করতে শুরু করে। ফলাফল—নাটকীয়ভাবে কমে যেতে থাকে হামজনিত মৃত্যু।

বিগত দুই দশকের মধ্যে হামের কারণে সর্বোচ্চ মৃত্যু বাংলাদেশ দেখেছে ২০১৭ সালে—১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল সে বছর, সেটা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ত্রিপুরা পল্লিতে। ২০১৬ সালে হামজনিত মৃত্যু ছিল মাত্র একটি। ২০১৮–তে ৬টি। আর ২০২৬ সালে কেবল মার্চ–এপ্রিল মাসেই হামজনিত শিশুমৃত্যু ছাড়িয়ে গেছে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ১৫ গুণ! এদের অধিকাংশের বয়স দুই বছরের কম। কেন? কী অপরাধ এই শিশুদের? বিল গেটসের ভাষায় বলতে হয়—এদের অপরাধ একটাই। তারা জন্মেছে বাংলাদেশে!

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর ভিড় বাড়ছে। আলীকদম, বান্দরবান, ২৩ এপ্রিল
ছবি: মং হাই সিং মারমা

ইউনিসেফ এর আগে ২০২৪ সালকে শিশুদের জন্য সবচেয়ে খারাপ বছর ঘোষণা দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কারণ, সে বছর হাইতি, লেবানন, ইউক্রেন, ফিলিস্তিন, মিয়ানমার, সুদান ও বাংলাদেশে হাজার হাজার শিশু বড়দের রাজনীতি ও বড়দের দ্বারা সৃষ্ট যুদ্ধবিগ্রহের কারণে প্রাণ হারিয়েছিল। হাজার হাজার শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে, গৃহহীন হয়েছে, স্কুল থেকে ঝরে গেছে, অপুষ্টি আর দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছে।

ইউনিসেফের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিশুদের জন্য এত খারাপ সময় পৃথিবীতে আর কখনো আসেনি। কেন? কারণ, বড়রা যখন নানাভাবে নানা সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন, তখন বেঘোরে প্রাণ হারাতে হয়েছে শিশুদের, যাদের এসব সংঘাতে কোনো ভূমিকা ছিল না। বাংলাদেশেও তা–ই হয়েছিল।

চব্বিশের অভ্যুত্থানে ১৪০টি শিশু–কিশোরকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। জুলাই ২০২৫–এ বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট এ নিয়ে একটি সম্পাদকীয়ও প্রকাশ করে—চিলড্রেন অ্যাজ আ ভিকটিম অব ডেডলি পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স। এই সম্পাদকীয়তে বিশ্বের সব সরকার, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি আহ্বান জানানো হয় যেন সব ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত থেকে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া হয়, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে যে এই প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। হামপ্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ২০০০ সালে ছিল ৮৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ১১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ দেশব্যাপী চালুর পর ২০১২ সালে কভারেজ ছিল ২২ শতাংশ।

২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১২১ শতাংশ। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর হার দ্রুত কমে এসেছিল। তবে ২০২৪-২৫ সালে দেশে এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতির কারণে টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ বা এমআর১ ও এমআর২ কভারেজ কমে যায়।

আরও পড়ুন

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালে ২৭ বছর ধরে চলে আসা স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির (এইচএনপিএসপি) অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা বহুজাতিক ঋণদাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত হতো। ফলে বন্ধ হয়ে যায় স্বাস্থ্য খাতের ৩৪টি উন্নয়ন কর্মসূচি। এর মধ্যে অন্যতম হলো সংক্রামক রোগ, অসংক্রামক রোগ, প্রাথমিক স্বাস্থ্য, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য।

বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো। একের পর এক তালা ঝুলেছে কমিউনিটি হাসপাতালগুলোতে। অন্তঃসত্ত্বা নারীরা পাননি জরুরি ফলিক অ্যাসিড ও আয়রন ট্যাবলেট। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ঘাটতি পড়েছে।

এভাবেই কলমের এক খোঁচায় মৃত্যুদণ্ড লেখা হয়ে যায় আমাদের শিশুদের। শিশুরা তা কখনো জানতেই পারেনি, পারবেও না। হ্যাঁ, এই শিশুদের অপরাধ যে তারা জন্মেছে এই দেশে। যে দেশে বড়দের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর বড়দের পারস্পরিক বিদ্বেষের বলি হয়ে তাদের মরে যেতে হয় দলে দলে।

পাঁচ বছরের জন্মদিন পালন করার আগেই ভোরের শিউলি ফুলের মতো ঝরে যায় তারা। আর তাদের চাদরমোড়া লাশ কোলে নিয়ে স্বজনেরা প্রকাশ্য রাজপথে যখন ছোটাছুটি করেন, তখন সেই বড়রা তার কাছেই সংসদে নিজেদের জন্য নতুন গাড়ি নতুন অফিস বাড়ির বায়না ধরে হাসি তামাশায় মেতে ওঠেন। বড়দের রাজনীতিতে শিশুরা এভাবেই বলি হতে থাকে।

  • তানজিনা হোসেন চিকিৎসক ও কথাসাহিত্যিক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব