হামে শিশুর মৃত্যু: আতঙ্ক, দোষারোপের রাজনীতি ও বাস্তবতা

হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যর্থতা, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়, এ নিয়ে রাজনীতি এবং বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ নিয়ে এ বিশ্লেষণ লিখেছেন রাফসান গালিব

হামে আক্রান্ত শিশুদের কাউকে কাউকে করতে হচ্ছে নেবুলাইজ। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত ৬টি শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে এ হাসপাতালে। এ নিয়ে এখানে হামে আক্রান্ত মোট ভর্তি শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫–এ। ৩১ মার্চ, মঙ্গলবারছবি: প্রথম আলো

করোনা মহামারির পর জনস্বাস্থ্য নিয়ে আবারও একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মহামারি বা অতিমারির মতো কিছু না হলেও হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে আমরা এ কারণেই শঙ্কিত যে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে আমাদের শিশুরা মারা যাচ্ছে। এ পর্যন্ত মৃত শিশুর সংখ্যা অর্ধশতাধিক। মূলত ঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের দিকে বেশি প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও এ সংক্রামক রোগ এখন দেশের অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে জনস্বাস্থ্যের গুরুতর একটি সংকট হিসেবে হাজির হয়েছে। এটি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটির তুলনায় সরকার থেকে এবং নাগরিক পরিসরে শুরুতে দোষারোপের রাজনীতি দেখা গেল।

দায় এড়ানো-চাপানো

করোনা মহামারির সময় আমরা দেখেছি, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর ও অব্যবস্থাপনাপূর্ণ। আর এই সবকিছুর সঙ্গে বেরিয়ে আসে স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতি।

আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে স্বভাবতই এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই ব্যর্থতার আঙুলটা ওঠে সরাসরি সরকারের দিকে। বর্তমান বিএনপি সরকার একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে দুই মাসও হয়নি। সরকার পরিচালনার শুরুতেই হামের এ প্রাদুর্ভাব তাদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে এসেছে বলতে হবে। কিন্তু সেই পরীক্ষা দিতে গিয়ে বরাবরের মতো দায় এড়ানোর নিরাপদ অবস্থানকেই যেন বেছে নিতে চাইল তারা। শুধু দায় এড়ানো নয়, অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার যে দীর্ঘ সংস্কৃতি, সেটির চর্চা দেখা গেল।

রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। এরপর কোনো সরকারই ভ্যাকসিন দেয়নি।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্য নিয়ে নাগরিক সমাজে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অনেক অভিভাবক তাঁদের শিশুর টিকা কার্ডের ছবি প্রকাশ করে দেখিয়েছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য যথার্থ নয়। যেকোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবে সঠিক তথ্যের নিশ্চয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে প্রথম বাধাটা আসে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে। এখনো হাসপাতালভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যা ও কোন বয়সী শিশু মারা যাচ্ছে, তা পুরোপুরি জানা যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন

স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, অনিয়ম ও জনবলসংকট পাওয়া যাচ্ছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও। বিশেষ করে টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অভিযোগ জোরালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। নাগরিক সমাজ অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী মহলও অন্তর্বর্তী সরকারকে তুলাধোনা করতে ছাড়েনি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, স্বাস্থ্য খাতে এবং টিকা–সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার বিষয়টি। আবার তাঁদের কারও মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতে যে দুর্নীতি ও অনিয়ম ছিল, সেখানে সংস্কার আনতে গিয়ে উল্টো এ সংকট তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, এমন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নিজেদের দায় এড়ানোর জন্যও নানা যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।

দেখা যাচ্ছে, জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুতর সংকট এখন রাজনৈতিক দোষারোপের ইস্যু হয়ে উঠেছে। এতে অভিভাবক ও সাধারণ জনগণের মধ্যেও নানা বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

দেশে অতীতের হামের প্রাদুর্ভাব

চলুন, এবার দেশে অতীতের হামের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে জানা যাক। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার ও বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোর ঐকান্তিক ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিশ্বে টিকাদান কর্মসূচিতে সুনাম অর্জন করেছে। যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই—এর মতো ভীতিকর স্লোগানও এখন অতীত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ বিদেশি অনেক আর্থিক ও কৌশলগত সহায়ক শক্তি এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে।

টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্য থাকলেও নানা সময়ে হামের প্রাদুর্ভাবের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় একটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে ৯টি শিশু মারা গিয়েছিল। তখন দুর্গম অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সীতাকুণ্ডের সেই ধাক্কা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়নি, যার কারণে ২০২০ সালের মার্চ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময়ও সেখানে দুটি জাতিগোষ্ঠীর ৯টি শিশু মারা গিয়েছিল (ডেইলি স্টার বাংলা ৩১ মার্চ ২০২০)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ডেটাবেস বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার হার ছিল প্রতিবছর ৯৭ শতাংশ। এরপরও গত এক যুগে এ কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালে ৪ হাজার, ২০১৯–এ প্রায় ৬ হাজার আর বাকি দুই বছরে দুই সহস্রাধিক করে।

এ বছরের প্রাদুর্ভাবের পুরো চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। সঠিক তথ্যেরও যথেষ্ট ঘাটতি আছে। গত বছর টিকাদানের হার আগের বছরগুলোর তুলনায় ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে প্রকাশ পেলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কর্তৃপক্ষের দাবি, এ তথ্য সঠিক নয়; এটি এখনো পুরোপুরি আপডেট হয়নি।

আরও পড়ুন

হামের বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব দুই-তিন বছরে ফিরে আসার প্রবণতা ছিল। তবে টিকাদান কর্মসূচির উন্নতির ফলে সেই ব্যবধান এখন অঞ্চলভেদে ৫-১০ বছরে দাঁড়িয়েছে এবং প্রাদুর্ভাবগুলোর মাত্রাও ছোট হয়ে এসেছে। তবে এবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় মাত্রায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে ভারতে হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব চলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটিতে ১২ হাজারের বেশি কেস পাওয়া গেছে। পাকিস্তানেও হামের বিস্তার ঘটেছে (প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কেস)। ইন্দোনেশিয়াতেও শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ বেড়েছে (প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কেস)। আফ্রিকা মহাদেশে অ্যাঙ্গোলা, ইয়েমেন, ক্যামেরুন ও সুদানের মতো দেশে হামের বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

আফ্রিকাতে আক্রান্ত শিশুদের ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত মারা যাচ্ছে। ইয়েমেন ও আফগানিস্তানে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার ৫ শতাংশের ওপরে। মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ এবং রোমানিয়া, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রিয়ায় ছোট ছোট ক্লাস্টারে হাম ছড়িয়ে পড়েছে।

হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের প্রকাশনা ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’ ৯ মার্চ ২০২৬ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এ শিরোনামে—‘মিজল্‌স ইজ ম্যাকিং আ কামব্যাক: ক্যান উই স্টপ ইট?

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে এবারের হামের প্রাদুর্ভাব মূলত বিগত করোনা মহামারির প্রভাবের কারণে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৫-এর শুরুতে ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফ একটি যৌথ প্রতিবেদনে জানায় যে করোনার কারণে টিকাদান কর্মসূচির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছিল।

ডব্লিউএইচওর টিকাদান বিভাগের প্রধান ড. ক্যাথরিন ও’ব্রায়েন ২০২৪ সালের শুরুতে জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, করোনা মহামারির সময় প্রায় ৬ কোটি শিশু তাদের নিয়মিত হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার শূন্যতা এখন একটি বৈশ্বিক মহামারির রূপ নিচ্ছে।

এবার টিকা দেওয়ার বয়সের আগে শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইপিআই উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, দেশে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও এখন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। অথচ এই বয়সে তাদের টিকা নেওয়ার কথা নয়; অর্থাৎ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে।

তাঁর মতে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোসহ একই পরিস্থিতি বিশ্বের আরও দেশে দেখা যাচ্ছে। এ নিয়ে গবেষণা চলছে। হামের টিকার নির্ধারিত সময় আরও এগিয়ে আনা যায় কি না, সেটিও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও হাম ছড়িয়ে পড়লেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে হামে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। টিকাদানে ঘাটতি ও ব্যর্থতার পাশাপাশি এ মৃত্যুহারের সঙ্গে যুক্ত আমাদের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। আমাদের পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা নাই, জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে আছে দীর্ঘসূত্রতা এবং একসঙ্গে অনেক মুমূর্ষু রোগীকে দ্রুত যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সামর্থ্যের অভাব ও জনবলসংকট আছে। জায়গা না থাকলেও দ্রুত স্থানান্তর করার ব্যবস্থাও নাই। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রেও গাদাগাদি করে রোগীকে রাখতে হয় হাসপাতালে।

টিকাদান কর্মসূচিতে গলদ ও ব্যর্থতা

১৯৯৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সহায়তায় দেশে পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচএনপিএসপি) চালু হয়। এর আগপর্যন্ত শতাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের কার্যক্রম চলত। সেগুলো এইচএনপিএসপির অধীনে নিয়ে আসা হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে চতুর্থ ধাপের এইচএনপিএসপি শেষ হয়।

২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজকের পত্রিকা এক প্রতিবেদনে বলছে, ‘ওই বছরের জুলাই মাসেই পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ১ লাখ ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম এইচপিএনএসপি শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে সময় তা অনুমোদন করেনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।’ যদিও তারা কাগজপত্র তৈরির প্রস্তুতি শুরু করেছিল বলে জানা যায়।

এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইপিআইয়ের সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. তাজুল ইসলাম এ বারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, পঞ্চম ধাপের এইচএনপিএসপির কার্যক্রমের প্রস্তুতি শুরু হলেও অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাতিল করে দুই বছর মেয়াদের একটি ডিপিপি কর্মসূচি হাতে নেয়। এর অধীনে প্রথম বছরের জন্য ১৪৫১ কোটি টাকা বরাদ্দও করা হয়। কিন্তু সময়মতো সেই টাকা ছাড় হয়নি। ফলে টিকা কেনার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হয়। ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর সর্বশেষ টিকার জন্য বরাদ্দ রিলিজ করা হয়েছিল। এরপর আর হয়নি।

আরও পড়ুন

এমন পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে এ কর্মসূচির অধীনে থাকা হাজার হাজার কর্মীর বেতন বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি যেসব কর্মী (পোর্টার) উপজেলা থেকে টিকাকেন্দ্রে টিকা নিয়ে যান, তাঁদের বেতনও বর্তমানে ৯ মাস ধরে বন্ধ।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এইচপিএনএসপি কার্যক্রম নিয়ে নানা আপত্তি ওঠে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনে। অভিযোগ ওঠে, পূর্ববর্তী কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়নে দুর্নীতি, সমন্বয়হীনতা ও সম্পদের অপচয় ছিল প্রকট এবং বিশাল বাজেটের আড়ালে কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক সিন্ডিকেট একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। উন্নয়ন বাজেট ও রাজস্ব বাজেটের মধ্যেও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সেখানে সংস্কার আনতে বিদেশি সহায়তা ও সহযোগিতানির্ভর না থেকে নিজস্ব অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় এ কার্যক্রম শুরু করতে চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু নানা কারণে তারা সংস্কার আনতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ায় এখনকার সংকট তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং ইউনিভার্সিটি অব সিডনির হেলথ ল সেন্টারে স্বাস্থ্য আইনে পিএইচডি গবেষক সাঈদ আহসান খালিদ বলেন, ‘এইচএনপিএসপি ও এর আওতায় ইপিআইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে এবং কোটি মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত হয়। তবে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও যেভাবে এবং যে সময়ে এই কাঠামো বাতিল করা হয়, তা ছিল অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে একটি বড় ‘ট্রানজিশনাল গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি।’

সাঈদ আহসান খালিদ আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে টিকাদান রাষ্ট্রের “কোর অবলিগেশন” হিসেবে স্বীকৃত। তাই ভ্যাকসিন সরবরাহে বিলম্ব “রাইট টু লাইফ”-এর ওপর সরাসরি আঘাত। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু রাষ্ট্রের “ডিউ ডিলিজেন্স”-এর ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করে। সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। একটি শিশুর টিকা না পাওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবাধিকারগত ব্যর্থতার প্রতীক। এখন প্রয়োজন আইন, মানবাধিকার ও কার্যকর বাস্তবায়নের সমন্বয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা।’

টিকা কর্মসূচিতে সংস্কার আনতে ব্যর্থতা ও বর্তমান সংকট তৈরির জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী বলেন, ‘শুরু থেকেই স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে ঘিরে বিস্তর সমালোচনা ছিল। তাঁর অনুপস্থিতি, অদক্ষতা, দুর্বল নেতৃত্ব এবং সংকট মোকাবিলায় অযোগ্যতা নিয়ে জনপরিসরে বারবার কথা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়, সমালোচনাকে গুরুত্ব না দিয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কারণে স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে সরাননি, বিকল্প কোনো যোগ্য মানুষকেও সেখানে আনেননি।’

টিকাদান কর্মসূচি ব্যহত হওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনও গুরুতর প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালে এক বছরেই সারা দেশের স্বাস্থ্য সহকারীরা তিন দফায় কর্মবিরতিতে যান। এ সময়ে সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

ওই বছরের ডিসেম্বরে টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা স্বাস্থ্য সহকারীদের একটি আন্দোলনে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সেই কর্মবিরতির কারণে কয়েক দিন সারা দেশে ১ লাখ ২০ হাজার অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ থেকেছে। ফলে প্রতিদিন অনুষ্ঠিত ১৫ হাজার টিকাকেন্দ্র স্থগিত থাকায় প্রায় দেড় লাখ মা ও শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে (বাংলানিউজ২৪, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫)। আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকে কয়েক দফা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) পরিবর্তন হন। সেটির প্রভাবও পড়ে। আর ছিল বিগত আমল থেকে চলমান বড় জনবলসংকট।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, টিকা কেনায় অর্থায়নের বন্দোবস্ত না হওয়ায় কেন্দ্রীয় গুদামে হামসহ ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে টিকার স্বল্পতা, জনবলঘাটতি, কর্মীদের আন্দোলনের কারণে শিশু ও মায়েরা ঠিক সময়ে টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

শুধু হাম নয়, অন্যান্য টিকাদান কর্মসূচি ও ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইনেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভবিষ্যতেও। এখন নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, এ সংকট কীভাবে মোকাবিলা করবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে টিকাদান কর্মসূচির এ ব্যর্থতা ও বিপুল শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? আমরা চাই না, বারবার আমাদের শিশুর জীবন এভাবে অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে হুমকির মুখে পড়ুক।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী।

    -মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব