অপ্রতিমের তো এভাবে ফেরার কথা ছিল না!

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমছবি: সংগৃহীত

অপ্রতিমের জন্য কাঁদছে সবাই। অপ্রতিম যে আমাদের সবার সন্তান। বাচ্চা হারিয়ে গেলে শুধু বাবা–মায়েরাই পাগলপারা হয়ে যান না—আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি কারও ঘুম থাকে না। সোশ্যাল মিডিয়াকে কি এখন ডিজিটাল পাড়ামহল্লা বললে ভুল হবে? কে কী পেল বা হারাল, কার সুখ কিংবা শোক—এখানে সবারই জানা হয়ে যায়, সবাইকে ছুঁয়ে যায় কমবেশি। এরপরও আমরা কত কিছু এড়িয়ে যাই।

কিন্তু অপ্রতিমের মতো কী সুন্দর একটা বাচ্চার নিখোঁজ সংবাদে তার মায়ের পোস্ট কি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব? ফলে রাত থেকে সকাল হতে হতে সেই পোস্ট আমাদের সবার টাইমলাইনে ছেয়ে গেল। যেন দেশের সব মানুষের একটাই আকুতি—অপ্রতিম নিরাপদে ফিরে আসুক মায়ের কোলে।

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগম। আমাদের অনেকেরই চেনা। কথাসাহিত্যিক নাহিদা নাহিদ। সাহিত্যচর্চা ও শিক্ষকতার মধ্য প্রতিনিয়ত আনন্দ খুঁজে বেড়ান, আনন্দ ছড়িয়ে বেড়ান। সারা রাত ধরে তন্নতন্ন করে একমাত্র বাচ্চাকে খুঁজে না পেয়ে কী বেদনায় ফেসবুকে লিখলেন: ‘আমার ছেলেরে আমি কই খুঁজব, জঙ্গলে নাকি পানিতে। ও কি বেঁচে আছে?’

আরও পড়ুন

হায়, নিখোঁজের এক দিন পর ঠিকই অপ্রতিমকে খুঁজে পাওয়া গেল, জঙ্গলেই পাওয়া গেল তাকে। কিন্তু ও বেঁচে নেই। আমাদের সম্মিলিত আকুতির জিকিরেও তার ফেরা হলো না, বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিদিন বিকেলে খেলা শেষে দৌড়ে কিংবা ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে মায়ের কোলেই ফিরে আসে, সেই অপ্রতিমের আর ফেরা হলো না।

সিলেটের কানাইঘাটের শিশু মুনতাহার কথা মনে আছে? যার সন্ধান পেতে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ টাকা, সোনা কত কিছু উপহার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ফেসবুকে। চট্টগ্রামের বন্দরটিলার শিশু আয়াতের কথা? যার নিখোঁজ সংবাদের পোস্টার ছেয়ে গিয়েছিল শহরজুড়ে।

মুনতাহার লাশ পাওয়া গিয়েছিল ঘরের পাশের ডোবায়। আয়াতের ছোট দেহ খণ্ড খণ্ড করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ রকম কত বাচ্চা সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আমাদের সবার বাচ্চা হয়ে গিয়েছিল। নিরাপদে ফিরে আসার আমাদের সম্মিলিত আকুতির সাগরে ঢেউ তুলেও তাদের কাউকে ফেরানো যায়নি। তাদের নামের সঙ্গে যুক্ত হলো এবার অপ্রতিমও।

দুই দিন পরেই আমরা এই অপ্রতিমকে ভুলে যাব। আবার হয়তো অপেক্ষায় থাকব আরেক অপ্রতিমের হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। সুখ নয়, আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে এখন শোক উদ্‌যাপনের। হায়, এ কেমন বদনসিব আমাদের!

শুক্রবার পাঞ্জাবি পরে জুমার নামাজে গিয়েছিল অপ্রতিম। বাবা-চাচা কিংবা সমবয়সীদের সঙ্গে কাছের মসজিদে জুমার নামাজে যাওয়ার স্মৃতি আমাদের কার ছেলেবেলা আলোকিত করে নেই! বাচ্চাদের কী নির্মল এক স্বাধীন দিন। পবিত্র দিনের পবিত্র আবহে বাবা–মায়েরাও নির্ভার থাকেন। যে কারণে শুক্রবার, শবে বরাত, ঈদের দিন ইত্যাদি ধর্মীয় দিনগুলোতে বাবা-মায়েরা বাচ্চাবেলায় আমাদের ছেড়ে দিতেন। আর আমরাও কী আনন্দে চরকির মতো ঘুরতাম, আচ্ছামতো খেলে বেড়াতাম। এমন শুক্রবারেই বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ফেরা হলো না অপ্রতিমের।

নাহিদা নাহিদ তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেছেন, অপ্রতিম সবার অলক্ষ্যে মায়ের আইফোনটাও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছে, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে। এ লাইনটা দেখে আচমকা ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। আইফোনের মতো দামি ফোনের কারণে ছিনতাই, খুন, আত্মহত্যা—কত কিছু ঘটে যাচ্ছে। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও। সেখানে ১৩ বছরের একটা বাচ্চা এমন দামি ফোন নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবে যে কারও দুশ্চিন্তা হবে।

প্রাথমিকভাবেও ধারণা করা হচ্ছে, আইফোনের কারণেই ঘাতক তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু আইফোনটাই যদি নিয়ে নিতে হয় ফুটফুটে বাচ্চাটাকে কেন মেরে ফেলতে হবে! কেন এই নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতার শিকার হতে হয় আমাদের শিশুদের?

মা–বাবার সঙ্গে অপ্রতিম
ছবি: নাহিদা নাহিদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত

সম্প্রতি গত সাত মাসে সাড়ে পনেরো হাজার শিশু নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুরুর দিকে এ খবর গুজব বা সমস্যাজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কারণ, ১৮ কোটির দেশে প্রতিদিন অসংখ্য বাচ্চা নানাভাবে হারিয়ে যায়।আবার অনেক বাচ্চাই ফিরে আসে, অনেকের খোঁজ পাওয়া যায়। কিন্তু থানায় সাধারণ ডায়েরি করলেও সেসব আর তোলা হয় না। ফলে হারিয়ে যাওয়ার খবরটাই নথিভুক্ত থেকে যায়, ফিরে পাওয়ার বিষয়টা চাপা পড়ে যায়। সেখান থেকেই সাড়ে পনেরো হাজার শিশু নিখোঁজের সংখ্যাটি প্রকাশ পায়।

স্বাভাবিকভাবেই এত বিপুল বাচ্চা হারানোর এই খবর চরম উদ্বেগ তৈরি করে। আমরা আতঙ্কিত হই। পরে পুলিশ এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়। প্রতি বছরই এমন সংখ্যক শিশু হারিয়ে যায়। আমরা জানতে পারি, গত সাত মাসেও সাড়ে পনেরো হাজার শিশু হারিয়ে গিয়েছিল, এটি সত্য। তবে সাড়ে তেরো হাজারের বেশি শিশু ফিরেও এসেছে। এটা জানার পর অনেকের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।

কিন্তু আমরা ভুলে গেলাম ফিরে না আসা বা নিখোঁজ বাকি দুই হাজারের বেশি শিশুর কথা। এতগুলো শিশু কোথায় গেল? এই হারিয়ে যাওয়া শিশুদের মধ্যেই কি ছিল চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার ১২ বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ রায়হান। সাত মাস আগে সে হারিয়ে গিয়েছিল। পরে স্থানীয় এক মাহফিলে পা কাটা অবস্থায় ভিক্ষাবৃত্তি করা অবস্থায় রায়হানকে ফিরে পাওয়া যায়। চুল কাটাতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল সে, কিন্তু এত দিন কোথায় ছিল সে, কীভাবে তার পা কাটল? ধারণা করা হচ্ছে, ভিক্ষাবৃত্তির অপরাধী চক্র তাকে অপহরণ করে পা কেটে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে ভিক্ষার জন্য।

আরও পড়ুন

সবার আশা ছিল, দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে, একটা গণতান্ত্রিক সরকার এলে আইনশৃঙ্খলা ঠিকঠাক হয়ে যাবে। মানুষের নিরাপত্তাহীনতা কাটবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলো, গণতান্ত্রিক পরিবেশও দেখলাম আমরা—সেটি কেবল রাজনীতিতে কিংবা সংসদ অধিবেশনে। এর সুফল কি সমাজে মিলল? প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যাকাণ্ড, মব করে পিটিয়ে হত্যা, ধর্ষণ, বলাৎকার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখলবাজির ঘটনা দেখতে দেখতে আমরা ক্লান্ত। সরকার যায় সরকার আসে, আমাদের নিরাপত্তাহীনতা কাটে না।

আমাদের শিশুরা আমাদের নারীরা বর্বরতার শিকার হতেই থাকে। আমরা আরও বেশি অনুভূতিহীন হই, আরও বেশি নির্বিকার। মাঝেমধ্যে একজন অপ্রতিম এসে আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়ে যায় শুধু, তা–ও একটা মায়ের বুক খালি হয়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে শিগগিরই হয়তো আমরা দেখব, অপরাধী ধরা পড়ার সাফল্যের কথা বলতে মিডিয়ার সামনে এসেছেন। কিন্তু সমাজের এই নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে তিনি বা সরকার কী করছেন?

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সাংবাদিক রুদ্র ইকবাল ফেসবুকে কোনো এক রমজানে একটা ইফতার আয়োজনের ছবি দিয়েছেন। যেখানে দেখা যাচ্ছে নাহিদা নাহিদ ও তাঁর বাচ্চা অপ্রতিমকেও।

একমাত্র সন্তান অপ্রতিমকে হারিয়ে মা নাহিদা বেগমের আহাজারি
ছবি: প্রথম আলো

রুদ্র লিখেছেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে (কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে) কয়েক বছর ধরে রমজানে ১০ টাকায় ইফতার বিক্রি হয়। এ ছবি ১০ টাকায় ইফতার বিক্রির সময় তোলা। এক স্টুডেন্ট এ উদ্যোগ নেয়। এ কাজে বড় একটা কন্ট্রিবিউট করেন বাংলা বিভাগের শিক্ষক নাহিদা ম্যাম। যে ছেলে এ উদ্যোগ নেয়, নাহিদা ম্যাম তারে বলতেন, তোমরা যখন ইফতার বিক্রি করো, তখন আমার ছেলেকে রাইখো। যেন সে কিছু শেখে। ছোটো বয়স থেকে কিছু শিখলে সেটা তার বেড়ে উঠায় ভালো প্রভাব ফেলবে। যেন সে এসব ভালো কাজে আগ্রহী হয়। সন্তানকে মানুষ হিসেবে বড় করতে মায়ের কত আয়োজন, কত চিন্তা, কত পরিকল্পনা। অথচ বাচ্চাটাকে হায়েনারা বাঁচতেই দিল না।’

এটা দেখে ভেতরটা আরও বেশি ভারী হয়ে আসে। ভাবতে এ–ও খারাপ লাগে, দুই দিন পরেই আমরা এই অপ্রতিমকে ভুলে যাব। আবার হয়তো অপেক্ষায় থাকব আরেক অপ্রতিমের হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। সুখ নয়, আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে এখন শোক উদ্‌যাপনের। হায়, এ কেমন বদনসিব আমাদের!

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব