৩ দিন অনলাইন ক্লাসে কত লিটার ডিজেল বাঁচবে?

ডিজেল পেতে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি। কুমারপাড়া, রাজশাহী, ১ এপ্রিলপ্রথম আলো

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যে অভাবনীয় এক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গত বছরের জুনে প্রথম দফা যুদ্ধ ছিল সংক্ষিপ্ত আর সেই যুদ্ধটা সীমাবদ্ধ ছিল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে। এবারের যুদ্ধ এক মাস পেরিয়ে গেছে। দুই পক্ষই সামরিক স্থাপনার সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা, পাল্টা হামলা করছে।

আধুনিক মিসাইল, ড্রোন আর এআইনির্ভর এই যুদ্ধের ‘গোলাবারুদ’ আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশেও। যত দিন গড়াচ্ছে জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় প্রভাব বেড়ে চলেছে।

জ্বালানি পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় বোরো ধানের সেচ দেওয়ার জন্য কৃষকেরা ঠিকমতো ডিজেল পাচ্ছেন না; পেলেও সেটা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ডিজেল না মেলায় সমুদ্র ও মোহনায় মাছ ধরার নৌকাগুলো তীরে অলস বসে আছে।

গ্রীষ্ম মৌসুমে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা এমনিতেই চার-পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বেড়ে যায়। এর সবচেয়ে বড় কারণ অফিস, বাসাবাড়ি, মার্কেটে এসির যথেচ্ছ ব্যবহার। গত কয়েক দশকে গণপরিবহনের বদলে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। মোটরসাইকেলের মতো যান গণপরিবহনে পরিণত হয়েছে।

সরকার অবশ্য দাবি করে চলেছে, এই মুহূর্তে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। বিপিসির তথ্যও বলছে, সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিক রয়েছে। এরপরও কেন এমন সংকট? প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কের কেনাকাটার পাশাপাশি মজুতদারি ও তেল পাচারের কথা বলা হচ্ছে।

গত কয়েক দিনের অভিযানে গোয়ালঘর, বাগান, খাটের তলা থেকে মজুত করা তেলের সন্ধান মিলছে। ‘তেল নাই’—লেখা পাম্প থেকে উদ্ধারের খবর আসছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে জমানো ডলার দিয়ে যে তেল আনা হচ্ছে, সেই তেল যখন মজুতদারদের কাছে মিলছে, তার থেকে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! এর বিপরীতে সরকারের মজুতবিরোধী অভিযান যথেষ্ট কঠোর নয় বলেই প্রশ্ন উঠেছে।

যুদ্ধ শুরুর পরপরই সংকটের আঁচ ধরতে পেরে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের নীতি ঘোষণা করে। তেল বিক্রিতে প্রথমে রেশনিং চালু করলেও ঈদের আগে সেটা তুলে নেয়। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

ইরান বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এটা নিশ্চিত করে একটা স্বস্তির খবর। এ ছাড়া রাশিয়ার তেল কেনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছে সরকার।

প্রতীকী ছবি

যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেকটাই বেড়েছে। এ বাস্তবতায় সরকার এপ্রিল মাসে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাও জনজীবন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বস্তিদায়ক সিদ্ধান্ত।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে, যেটা নাগরিকদের জন্য স্বস্তিদায়ক না–ও হতে পারে। তবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের আপৎকালীন জ্বালানি কৌশলপত্র নেওয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, সেটা এই নীতির আলোকেই নেওয়া উচিত। সরকারের বয়স সবে দেড় মাস পেরিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান যুদ্ধ জ্বালানি নিয়ে অভাবনীয় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। ফলে সরকারের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে নীতির ঘাটতির সঙ্গে নমনীয়তা আর সমন্বয়হীনতাও দেখা দিচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনলাইনে ক্লাস চালুর উদ্যোগ নিয়ে সে কারণে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতবিনিময় সভায় সপ্তাহে তিন দিন অনলাইনে ও তিন দিন সশরীর ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে বা মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।

আরও পড়ুন

এ উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে মহানগর এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয় বাদে বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটা চালু করতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে করোনা মহামারিকালের তিক্ত অভিজ্ঞতা অভিভাবকদের মধ্যে অনলাইনে ক্লাস চালুর উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

করোনা মহামারির সময় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। অনলাইন ও টেলিভিশনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হলেও সেটা ফলপ্রসূ হয়নি। কেননা অনেক অভিভাবকই সন্তানদের জন্য স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ কিনে দেওয়া সামর্থ্য নেই। ইন্টারনেটও বাংলাদেশে ব্যয়বহুল।

একটা প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ওপর করোনার সময় স্কুল বন্ধের অভিঘাত পড়েছে মারাত্মক। শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে গ্রাম, মফস্‌সল ও দরিদ্র্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ব্যাপক শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে। সব মিলিয়ে মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার শিশুরা হলেও আমাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে কখনই হেলদোল দেখা যায় না। বরং যেকোনো দুর্যোগ, দুর্বিপাকে স্কুল, কলেজ বন্ধ করে দেওয়াটাই একটা সহজ সমাধান হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে।

শিশুর অনলাইন ক্লাস
ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনলাইন ক্লাসের উদ্যোগ নিয়ে একজন চিকিৎসক অভিভাবক মুঠোফোনে তাঁর উদ্বেগের কথা জানাচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন,, করোনা মহামারিকালে তাঁর দুই সন্তান কীভাবে মুঠোফোনে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন, সেই গল্প।

সন্তানদের শ্রেণিকক্ষে ও বইয়ের পাতায় ফেরাতে তাঁর দীর্ঘ প্রচেষ্টার কথা শোনাচ্ছিলেন। নতুন করে অনলাইনে ক্লাস চালু হলে আবারও সন্তানদের মধ্যে মুঠোফোনের প্রতি আসক্তি জন্ম নেবে বলে তাঁর উদ্বেগ। তাঁর প্রশ্ন, ঢাকার স্কুল, কলেজে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালু করলে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও কত লিটার জ্বালানি বাঁচবে? যে সময় অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হবে সেসময় বিদ্যুৎ থাকবে সেই নিশ্চয়তা কি পাওয়া যাবে?

গ্রীষ্ম মৌসুমে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা এমনিতেই চার-পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বেড়ে যায়। এর সবচেয়ে বড় কারণ অফিস, বাসাবাড়ি, মার্কেটে এসির যথেচ্ছ ব্যবহার। গত কয়েক দশকে গণপরিবহনের বদলে ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। মোটরসাইকেলের মতো যান গণপরিবহনে পরিণত হয়েছে।

কর্মসংস্থান না থাকায় রাজধানী শহর থেকে শুরু করে গ্রাম—সবখানেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সুনামির মতো বেড়েছে। ফলে সমস্যার গোড়ায় হাত না দিয়ে স্কুল-কলেজে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্তে নেওয়া হলে নগদ লাভ হিসাবে জ্বালানি কিছুটা সাশ্রয় হলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে আমাদের শিশুরা।

এখন গ্রীষ্মকাল। প্রাকৃতিকভাবেই একটা দীর্ঘদিনের আলো পাই আমরা। ফলে অফিস, স্কুলের সময় এগিয়ে এনে; সন্ধ্যার মধ্যে মার্কেট বন্ধ রেখে, জোড়-বিজোড় নাম্বার প্লেটের প্রাইভেট গাড়ি এক দিন চালু রেখে এক দিন বন্ধ রেখেও অনেকটা জ্বালানি ও বিদ্যুতের সাশ্রয় করা যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার কী, সেটাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।

  • মনোজ দে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

    মতামত লেখকের নিজস্ব