সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে কিউবা। এই সংকট মোকাবিলায় দেশটি এখন প্রবাসী ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকে ঝুঁকছে। যখন কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন—কিউবা বর্তমানে ‘গভীর সংকটে’ রয়েছে এবং দেশটি প্রায় সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দখল’ নিতে পারে, আবার নাও নিতে পারে। তবে এই তথাকথিত বন্ধুত্বপূর্ণ দখল কীভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। ট্রাম্পের ভাষায়, কিউবা সরকারের সময় প্রায় শেষ।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘কিউবা একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র, তারা এখন সমঝোতা করতে চায়। খুব শিগগির হয়তো আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, আর চুক্তি না হলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
কিউবার চলমান সংকট শুরু হয় গত জানুয়ারি মাসে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটকের পর দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার জন্য জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে কিউবা তৎক্ষণাৎ তীব্র জ্বালানি ঘাটতির মুখে পড়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিউবার অর্থনীতি ধারাবাহিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি ঘাটতি, খাদ্যের অভাব এবং নানা ধরনের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার ফলে কিউবার অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটেই সরকার নীতিগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদেশে বসবাসরত কিউবানদের ব্যবসার মালিকানা গ্রহণ এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে নতুন মূলধন আকর্ষণ করা এবং উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা।
প্রবাসী কিউবানরা যদি এখন দেশে ফিরে ব্যবসা পরিচালনা করতে চান, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রবাসীদের বিনিয়োগ, ভ্রমণ ও ব্যবসার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে। তবে বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত এসব নিষেধাজ্ঞা আদতে শিথিল করা হবে কি না কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে কোনো সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সরকার আশা করছে, প্রবাসী কিউবানদের বিনিয়োগ দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া কমিউনিস্ট সরকার শিগগিরই বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অর্থনীতিকে আংশিকভাবে উন্মুক্ত করতে পারে বলে কিউবার কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এক সাক্ষাৎকারে কিউবার উপপ্রধানমন্ত্রী অস্কার পেরেজ ওলিভা ফ্রাগা জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়তে তাঁরা আগ্রহী। তবে এই উদ্যোগ কতটা কাজ করবে এবং ওবামা প্রশাসনে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্কের উষ্ণতার সময় নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে এর কতটা মিল রয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সম্প্রতি কিউবার বিদ্যুৎ গ্রিড পুরোপুরি অচল হয়ে যায়, যা ছিল বড় একটি ব্ল্যাকআউটের অংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থা অবশ্য জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে এবং চালু ইউনিটগুলোতে কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি পাওয়া যায়নি। কিউবার কর্মকর্তারা এই বিদ্যুৎ–সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছেন।
কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত তেলের ওপর নির্ভরশীল। তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দেশটির অনানুষ্ঠানিক বাজারে গ্যাসোলিনের দাম এখন লিটারপ্রতি প্রায় ৯ ডলার। একটি গাড়ির ট্যাংক ভরতে ৩০০ ডলারের বেশি প্রয়োজন হয়, যা অনেক কিউবান নাগরিকের বার্ষিক আয়ের চেয়েও বেশি।
এমন প্রেক্ষাপটেই কিউবা নতুন বিনিয়োগের পথ খুঁজছে। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী অস্কার পেরেজ ওলিভা ফ্রাগা বলেছেন, কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এবং পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কিউবান নাগরিক ও তাঁদের উত্তরসূরিদের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক ও গতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।
সরকার আশা করছে, প্রবাসী কিউবানদের বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে। পর্যটন, অবকাঠামো, জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই এই নতুন নীতির মূল লক্ষ্য। উপপ্রধানমন্ত্রী অস্কার পেরেজ ওলিভা ফ্রাগা এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতের পাশাপাশি পুরোনো ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোতে বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণে সরকার আগ্রহী।
এর আগে বারাক ওবামার প্রশাসন কিউবার বেসরকারি খাতে ব্যবসার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করলেও তা বাস্তবায়নের গতি ছিল ধীর। অন্যদিকে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ওবামা প্রশাসনের নেওয়া অধিকাংশ নীতিগত পদক্ষেপই বাতিল করেছেন।
কিউবার উপপ্রধানমন্ত্রীর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে মার্কিন পুঁজি সহজে দেশে আসবে না। ফ্লোরিডাসহ বিভিন্ন জায়গায় বসবাসরত প্রবাসী কিউবান সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরেই সরকারকে চাপ দিচ্ছেন, যেন প্রবাসীদের দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট আলোচনার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষিত পরিবর্তনগুলো সত্যিকার অর্থেই কাঠামোগত ও অর্থবহ নাকি কেবলই প্রতীকী, সরকার তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ট্রাম্প প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দিতে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ইস্যু করা হবে কি না। কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় সূত্রটি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চেয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান এবং কিউবান বংশোদ্ভূত কার্লোস গিমেনেজ লিখেছেন, দ্বীপে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন না এলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিনিয়োগ আসবে না। ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছে। কিউবা যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার না করে, তবে তাদের পরিণতি ভেনেজুয়েলা সরকারের মতো হতে পারে।
অন্যদিকে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ কানেল এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, অচলাবস্থা নিরসনে তাঁদের সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
জনসংখ্যা বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ২০ লাখের বেশি নাগরিক কিউবা ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ কানেল বলেছেন, প্রবাসী কিউবানদের স্বাগত জানানো, তাঁদের কথা শোনা এবং দেশের অর্থনীতি ও সমাজে প্রবাসীদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।
কিউবার কর্মকর্তারা এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নতুন ঘোষণায় প্রবাসীরা স্বাধীনভাবে দেশে ফিরে আসতে পারবেন এবং ছোটখাটো ব্যবসাও শুরু করতে পারবেন।
২০২১ সালে অনুমোদিত ক্ষুদ্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে কিউবার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান পণ্য আমদানি, নানা ধরনের সেবা প্রদান এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। বেসরকারি সুপারমার্কেটগুলোতে পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও সেখানে খাদ্যপণ্যের বেশ বৈচিত্র্য দেখা যায়।
প্রবাসী কিউবানরা যদি এখন দেশে ফিরে ব্যবসা পরিচালনা করতে চান, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রবাসীদের বিনিয়োগ, ভ্রমণ ও ব্যবসার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে। তবে বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত এসব নিষেধাজ্ঞা আদতে শিথিল করা হবে কি না কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে কোনো সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সানজিদা বারী ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণারত। ই-মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব