শিক্ষার্থীরা কেন প্রথম দিনই সব বই হাতে পাবে না

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। স্কুলে স্কুলে পৌঁছে যাচ্ছে নতুন বই। বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় চত্বরেফাইল ছবি: সোয়েল রানা

২০১০ সাল থেকে স্কুলগুলোতে বই বিতরণের উৎসব উদ্‌যাপিত হয়ে আসছে। বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন এক সেট পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হয়। দিনটি শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দের। এ দিন স্কুলগুলোতেও উৎসবের আমেজ থাকে।

দেখা গেছে, জানুয়ারির ১ তারিখ শুক্রবার পড়লেও বই উৎসব থেমে থাকেনি। কিন্তু বিভিন্ন কারণে কয়েক বছর ধরে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সময়মতো বই প্রকাশ করতে পারছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ্যবই বিতরণের উৎসব সত্যিকার অর্থে সফল হচ্ছে না।

কোভিড মহামারির কারণে ২০২১ ও ২০২২ সালে সব বই যথাসময়ে ছাপা ও বিতরণের কাজ শেষ করা যায়নি। এরপর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হওয়ার দরুন বই লেখা ও সম্পাদনাতে বেশি সময় লেগে যায়; ফলে তখনো শিক্ষার্থীদের বই পেতে দেরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ২০২৫ সালে পুরোনো শিক্ষাক্রমের বই দেওয়া হবে। কিন্তু সেসব বই ব্যাপক আকারে সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়। এ জন্য সব বই পেতে কোনো কোনো শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মার্চ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। 

বই উৎসবের জন্য ডিসেম্বরের মধ্যেই পাঠ্যবই ছাপানো এবং স্কুলগুলোতে পৌঁছানোর কাজ শেষ করতে হয়। কিন্তু এবার শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও বছরের প্রথম দিনে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পায়নি মাধ্যমিকের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। সব শিক্ষার্থীর হাতে অন্তত একটি-দুটি করে বই তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এনসিটিবি সেখানেও ব্যর্থ হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাধ্যমিকের ৭৩ শতাংশের চেয়েও কম বই মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যেও হয়তো সব বিষয়ের বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এনসিটিবি বলছে, ওয়েবসাইটে সব বইয়ের কপি রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বইয়ের সেসব সফট কপি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়নি।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৮ কোটি ৬০ লাখের মতো পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণ করা হয়েছে। আর মাধ্যমিক স্তরের মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ২১ কোটি ৪৩ লাখের বেশি। মানতে দ্বিধা নেই, এত বিপুলসংখ্যক বই যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া কঠিন। কিন্তু এ বছরের দেরি দেখে অনুমান করা যায়, এনসিটিবির কর্মপরিকল্পনায় যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। কেননা, ২০২৬ সালে কোনো বই–ই নতুনভাবে তৈরি করা হয়নি। 

বই ছাপাতে দেরি হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার ক্ষেত্রেও ক্ষতির মুখে পড়ে। গত কয়েক বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছে। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সে কারণেও শিক্ষা কার্যক্রম খানিকটা বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সুতরাং এনসিটিবির আরও বেশি সতর্ক ও গতিশীল ভূমিকা রাখার দরকার ছিল।

নতুন বই প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই সময় বেশি লাগে। সে ক্ষেত্রে আগে লেখক-সম্পাদক নির্ধারণ করা এবং তা অনুমোদন করিয়ে আনার দরকার হয়। নতুন করে বই লেখা ও সম্পাদনার কাজেও যথেষ্ট সময় লাগে। এরপর থাকে বইয়ের অলংকরণ ও পৃষ্ঠাবিন্যাসের কাজ। আবার বই চূড়ান্ত করার আগে বিষয় বিশেষজ্ঞ ও শ্রেণিশিক্ষকদের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন করতে হয়। এগুলো সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল বই ছাপানোর জন্য দরপত্র আহ্বান করা যায়। বই ছাপা ও বাঁধাই হয়ে গেলে পিডিআই বা সরবাহ-পূর্ব পরিদর্শন করা হয়। তারপর সেগুলো স্কুলে স্কুলে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। 

আরও পড়ুন

সন্দেহ নেই, বই প্রণয়ন থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। তবে রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে এনসিটিবি এর আগে অনেকবার যথাসময়ে বই পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। এ বছরের সব বই–ই পুরোনো; কেবল সংশোধন ও পরিমার্জন করে ছাপানো হচ্ছে। সুতরাং অতিরিক্ত সময় লাগার কোনো কারণ ছিল না। এর একটি কারণ হয়তো এই, এনসিটিবির চেয়ারম্যান ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে গত দেড় বছরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে শূন্যতা দেখা গেছে। সেটি হয়তো দেরি হওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। কয়েক মাস আগে এটাও দেখা গেছে, প্রাথমিকের পাঠ্যবই ছাপানোর দায়িত্ব এনসিটিবির হাতে থাকবে না প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে যাবে, তা নিয়ে দড়ি–টানাটানি চলছে! 

বই ছাপাতে দেরি হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার ক্ষেত্রেও ক্ষতির মুখে পড়ে। গত কয়েক বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছে। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সে কারণেও শিক্ষা কার্যক্রম খানিকটা বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সুতরাং এনসিটিবির আরও বেশি সতর্ক ও গতিশীল ভূমিকা রাখার দরকার ছিল। শিক্ষার্থীরা সব বই একসঙ্গে হাতে পেলে তাদের নিজেদের বিবেচনা থেকে ওই শ্রেণির পুরো সিলেবাস সম্পর্কেও একটা সাধারণ ধারণা পেয়ে যায়। 

আরও পড়ুন

বই উৎসব কেন্দ্রীয়ভাবে উদ্‌যাপিত হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে। আবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আলাদাভাবে প্রাথমিক শ্রেণির পাঠ্যবই বিতরণের উৎসব করা হয়। এই বই উৎসবের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বই উৎসবকে কেন্দ্র করে স্কুলগুলো এদিন কিংবা তার আগে-পরে শিক্ষার্থী ভর্তির কাজ শেষ করে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবক থাকার কারণে শিক্ষক-অভিভাবকের মধ্যেও সরাসরি সাক্ষাৎ ঘটে। তা ছাড়া বিনা মূল্যে বই নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা বছরের প্রথম দিন থেকেই স্কুলমুখী হয়। সুতরাং নিঃসন্দেহে বই উৎসব শিক্ষার্থীদের স্কুলগামী করতে এবং তাদের ঝরে পড়া ঠেকাতে ভূমিকা রাখছে। 

শিক্ষা কার্যক্রমে পাঠ্যবইয়ের গুরুত্ব ঠিকমতো উপলব্ধি করতে আমরা হয়তো ব্যর্থ হয়েছি। যে কারণে বইয়ের মধ্যে বানান ও তথ্যগত ভুল থাকে, ছাপা ও কাগজের মান খারাপ হয়, আর বই লেখা ও ছাপার কাজে যথেষ্ট সময় দেওয়া হয় না। পরবর্তী শিক্ষাবছরে নতুন করে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কথা শোনা যাচ্ছে। অতএব, শুরু থেকেই পূর্ণ পরিকল্পনা নিয়ে না এগোলে আগামী বছরও হয়তো সফলভাবে বই উৎসব করা কঠিন হয়ে পড়বে। 

তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

*মতামত লেখকের নিজস্ব