আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে দেশে নির্বাচন প্রকৃত অর্থে জনগণের মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারেনি।
বিরোধী দলের অংশগ্রহণের অভাব, ভোট কারচুপির অভিযোগ এবং আনুষ্ঠানিক ভোট আয়োজনের কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হয়।
একটি পুরো প্রজন্ম ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। ফলে রাজনীতিতে মানুষের আগ্রহ কমেছে, জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এই নির্বাচন সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে।
তবে শুধু নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। আগামী সরকার একটি দুর্বল ও চাপে থাকা অর্থনীতি পাবে, যেখানে বহু বছর ধরে নীতিগত উদাসীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে।
গত ১৬ বছরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর অর্থনৈতিক অবস্থা প্রকৃত অর্থে সবার জন্য ভালো রাখার চাপ কম থাকায় অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতি কমেছে। প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি অনেক দিন ধরে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে আছে। বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ কম, সরকারি বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ ও অপচয়মুখী, সরকারি ঋণ বেড়েছে, মানুষের প্রকৃত আয় কমছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি অনেক কমে গেছে। এসব কারণে অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে।
এই কঠিন বাস্তবতায় নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সুশাসন জোরদার করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের সংস্কার কর্মসূচি নিতে হবে। করণীয় অনেক, তবে তিনটি বিষয় সবচেয়ে জরুরি এবং একটি অপরটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই নির্বাচিত সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। গত কয়েক বছরে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি ছিল। নিম্ন আয়ের মানুষের মোট ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি যায় খাদ্যে। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
খাদ্যবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে, সিন্ডিকেট ও মজুতদারি বন্ধ করতে হবে, সংরক্ষণ ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করতে হবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। জ্বালানির দাম নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি চালু করা দরকার, যাতে দামের ক্ষেত্রে হঠাৎ বড় ধাক্কা না আসে।
মজুরি বাড়ার হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, সঞ্চয় কমেছে এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুষ্টিতে খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। এতে ব্যবসায় অনিশ্চয়তা বাড়ে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কমে, টাকার ওপর চাপ পড়ে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এখন।
মূল্যস্ফীতির পেছনে বৈশ্বিক কারণের পাশাপাশি দেশের নীতিগত দুর্বলতাও দায়ী। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি খরচ বেড়েছে। জ্বালানির দাম দীর্ঘদিন কম রাখা হলেও গত কয়েক বছরে অনেক বাড়ানো হয়েছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ায় সেটিও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি প্রতিযোগিতার অভাব, মজুত ও পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতা খাদ্য সরবরাহে বাধা তৈরি করেছে।
নতুন সরকারকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। সুদের হার ও মুদ্রানীতি বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। সরকারের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমাতে হবে এবং রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে।
খাদ্যবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে, সিন্ডিকেট ও মজুতদারি বন্ধ করতে হবে, সংরক্ষণ ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করতে হবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। জ্বালানির দাম নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি চালু করা দরকার, যাতে দামের ক্ষেত্রে হঠাৎ বড় ধাক্কা না আসে।
দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি; কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মান ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগও প্রতিবেশী দেশের তুলনায় কম। নীতিগত অনিশ্চয়তা, জটিল নিয়মকানুন, চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, অবকাঠামোর সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্বল ব্যাংক খাত বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে।
ব্যাংক খাত এখন বিনিয়োগের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারছে না। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন এবং বারবার ঋণ পুনঃ তফসিলের কারণে ঋণ ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে। দেখা গেছে, ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পায় না, অথচ প্রভাবশালীরা সহজে ঋণ পায়।
এ জন্য ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করতে হবে, খেলাপি ঋণ আদায় নিশ্চিত করতে হবে, ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই সম্পন্ন করতে হবে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলো সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে হবে, সরকারি সেবা ডিজিটাল করতে হবে এবং করব্যবস্থা সহজ করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নে শুধু বড় প্রকল্প নয়, দক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিদ্যুৎ, বন্দর, কাস্টমস ও লজিস্টিকসে দুর্বলতা থাকলে ব্যবসার খরচ বাড়ে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে।
তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই দশকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু সে অনুযায়ী চাকরি তৈরি হচ্ছে না। যুব–বেকারত্ব জাতীয় গড়ের দ্বিগুণের বেশি। অধিকাংশ নতুন চাকরি অনানুষ্ঠানিক, কম আয়ের এবং কম উৎপাদনশীল। শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, যা শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বড় ব্যবধানের প্রতিফলন।
চাকরি সৃষ্টি নির্ভর করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মজুরি কমিয়ে দেয় এবং নিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে। তাই স্থিতিশীল অর্থনীতি ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ জরুরি। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বড় সম্প্রসারণ দরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ দিতে হবে এবং নিয়মকানুন সহজ করতে হবে।
সবশেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু কে দেশ শাসন করবে, সেই প্রশ্ন নয়। কীভাবে দেশ শাসিত হবে, সেটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নতুন সরকারের সিদ্ধান্তই একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। সাহস ও দায়িত্ব নিয়ে দেশ পরিচালনা করলে বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা, সুযোগ ও আস্থার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
ফাহমিদা খাতুন নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
মতামত লেখকের নিজস্ব
