সম্প্রতি প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চুরি ও অনিয়ম ধরা পড়ায় বাংলাদেশিদের ৩২৫ গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। গবেষণায় অনিয়ম ও কুম্ভিলতা নিয়ে প্রায়ই প্রতিবেদন হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেহেতু দেশে বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, তাই গবেষণার প্রতি সামষ্টিক যে আগ্রহ, সেটা খুবই আশাব্যঞ্জক।
জ্ঞান-গবেষণায় বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক মানদণ্ডে খুব সন্তোষজনক নয়। ফলে কোনো সংস্কৃতি গড়ে ওঠার প্রাক্কালে সেখানে যদি শক্ত নিয়ম না থাকে, যদি ভালোর প্রভাব বেশি না থাকে, তাহলে একটা শক্তিশালী সংস্কৃতির পরিবর্তে দুর্বল সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
জ্ঞান-গবেষণায় শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বড় বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, চিন্তক, গবেষক তৈরি হবে না। ফলে বাংলাদেশের যে পরনির্ভরশীলতা, সেটা দূর হবে না। বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, আবিষ্কারে, উদ্ভাবনে, পলিসি তৈরিতে আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবদান খুবই নগণ্য থেকে যাবে।
গবেষণায় কুম্ভিলতা বা চৌর্যবৃত্তি ধরা পড়লে একাডেমিক শাসন খুবই প্রয়োজন। যেমন শিক্ষকদের মধ্যে কেউ এ কাজে জড়িত প্রমাণিত হলে তাঁকে বরখাস্ত করতে হবে। তাঁর পদোন্নতি বন্ধ করা কিংবা উচ্চ জরিমানা করা ইত্যাদি শাস্তির বিধান থাকা এবং প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
দেশের বহু গবেষণাকাজ ও গবেষণাপ্রবন্ধের মান খুবই নিম্নমানের। এসব কাজ বস্তুত দেশের টাকার জলাঞ্জলি দেওয়া। মানুষের ট্যাক্সের টাকার অপচয়। এ ধরনের কাজগুলোর কঠোর মূল্যায়ন দরকার।
যে শিক্ষক বা গবেষকেরা একটা নির্দিষ্ট সময়ে ভালো কাজ উপহার দিতে পারবেন না, তাঁদের জন্য গবেষণার অর্থ বরাদ্দ করা বন্ধ করতে হবে। একজন মানুষের যদি ট্র্যাক রেকর্ড না থাকে, কাজের একটা শক্ত পোর্টফোলিও না থাকে, তাঁকে কেন অর্থায়ন করা হবে? এ ধরনের মানুষকে ফান্ড দিলে তারাই বরং তাড়াহুড়া করে, অভিজ্ঞতার অভাবে, পদোন্নতির তাড়নায় কিংবা সামাজিক বাহবার আশায় অন্যের কাজ নকল করবেন, নিম্নমানের কাজ করে প্রকাশ করবেন। তাঁর কাছে গুণগত মান প্রাধান্য পাবে না।
বহু গবেষণাপত্রের চৌর্যবৃত্তি হয়তো ধরা পড়ে না বলে আমরা জানতে পারি না, তবে নিম্নমানের কাজগুলোকে শুরুতেই বন্ধ করতে পারলে সেখানে চৌর্যবৃত্তি বা অন্যান্য অনিয়মের আশঙ্কা কমে আসবে।
একজন ভালো গবেষক হওয়ার অনেকগুলো শর্ত থাকে। ভালো প্রকাশনা করা একটিমাত্র শর্ত। তাঁকে ভালো প্রশিক্ষক হতে হবে ভবিষ্যৎ গবেষক তৈরির জন্য। তাঁকে ভালো উপস্থাপন করা জানতে হবে। তাঁকে অর্থায়নের দরখাস্ত লেখা জানতে হবে। তাঁকে ভালো গবেষণাপত্র লেখা জানতে হবে। কোন কাজের প্রভাব বেশি, কোন কাজের প্রভাব কম, সেটার পার্থক্য করা জানতে হবে।
প্রকাশনা করলেই গবেষণা হয়ে যায় না। দুনিয়ার বহু জার্নাল আছে, যেগুলোতে মূলত ‘রিসাইক্লিং’ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এরা চক্রাকারে সারা দুনিয়া থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। জ্ঞানকে উন্মুক্ত করার নামে বহু ওপেন অ্যাকসেস জার্নাল তৈরি হয়েছে, যাদের অন্যতম উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন। সারা পৃথিবীতেই এ চক্রকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি বন্ধের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনাও জরুরি। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা শিক্ষার্থীদের নিয়োগ কমিয়ে আনতে হবে। এটা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর বিধান দরকার। দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেই। গবেষণার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পিএইচডি-পোস্টডক থাকা প্রার্থীদের সরাসরি নিয়োগ দিলে এই চৌর্যবৃত্তি তুলনামূলক কম হবে। এর কয়েকটি কারণও আছে।
গবেষণার অভিজ্ঞতা নিয়ে যাঁরা নিয়োগ পাবেন, তাঁরা সরাসরি সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ পাবেন। প্রভাষক থেকে যাঁরা পদোন্নতির আশায় গবেষণা করেন, তাঁদের গবেষণার বেশির ভাগই মানহীন। তাড়াহুড়া করে করা। পদোন্নতির প্রত্যাশায় গবেষণাপত্র তৈরির দিকে মনোযোগ থাকে তাঁদের। যাঁরা প্রভাষক, তাঁদের তো গবেষণার তেমন অভিজ্ঞতাই থাকে না। সুতরাং তিনি কী করে ভালো কাজ করবেন?
যে ভালো কাজ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, তিনি সংক্ষিপ্ত পথ অনুসরণ করবেন। এটা খুবই স্বাভাবিক। তা ছাড়া গবেষণার অর্থায়নের জন্য যখন আবেদন করা হয়, সেসব আবেদন কয়েক স্তরে যাচাই-বাছাই করা উচিত। সাধারণত এসব আবেদন নামহীন বিশেষজ্ঞ দল দ্বারা যাচাই-বাছাই করা হয়। বাংলাদেশে সম্ভবত যথেষ্টসংখ্যক বিশেষজ্ঞ গবেষক পাওয়া যায় না এবং এই যাচাই কমিটিগুলোতে চাইলেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের যুক্ত করা যায়।
সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ হওয়ার পর এই পদে পাঁচ থেকে সাত বছর অস্থায়ী অবস্থায় রাখা উচিত। আমেরিকায় যেটাকে বলে টেনিউর ট্র্যাক পদ্ধতি। অর্থাৎ সহকারী অধ্যাপক থাকা অবস্থায় যদি তাঁর শিক্ষকতা ও গবেষণায় সন্তোষজনক কর্মদক্ষতা থাকে, তাহলে তাঁকে সহযোগী অধ্যাপকের পদে প্রমোট করা হবে, যেটা স্থায়ী পদ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে প্রভাষক পদে চাকরি পাওয়ার পর স্থায়ী হয়ে যায়, এটা বস্তুত বহু শিক্ষককে অলস ও জ্ঞানবিমুখ করে তোলে। অনেকেই শুধু পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করেন। এগুলো পরিবর্তনের সময় এসেছে। চাকরিতে নিয়োগের পর প্রশিক্ষণ করানো আর প্রশিক্ষিতদের মধ্য থেকে বাছাই করে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য তৈরি হয়।
ফলে এই পাঁচ-সাত বছর শিক্ষকেরা অনেক পরিশ্রম করেন। মোটিভেটেড থাকেন এবং এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়। ফলে পুরো চাকরির জীবন তিনি জ্ঞান-গবেষণায় নিয়োজিত থাকেন।
তাই গবেষণামুখী বা রিসার্চ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার এখনই সময়। বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত শিক্ষাদানমুখী বা টিচিং বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলোকে গড়ে তুলতে গেলে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যেটা প্রায় অসম্ভব। বছর বছর শিক্ষাদানমুখী বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি না করে বরং নতুন করে নীতির মাধ্যমে গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুললে সেগুলোকে আলাদা করে পরিচালনা করা সহজ হবে। উপমহাদেশে ভারতের আইআইটিগুলো উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে প্রভাষক পদে চাকরি পাওয়ার পর স্থায়ী হয়ে যায়, এটা বস্তুত বহু শিক্ষককে অলস ও জ্ঞানবিমুখ করে তোলে। অনেকেই শুধু পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করেন। এগুলো পরিবর্তনের সময় এসেছে। চাকরিতে নিয়োগের পর প্রশিক্ষণ করানো আর প্রশিক্ষিতদের মধ্য থেকে বাছাই করে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য তৈরি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন, ভাতা ও গবেষণার সুবিধা বাড়িয়ে দক্ষ প্রার্থীদের নিয়োগ না দিলে উচ্চতর গবেষণাসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়াও সহজ হবে না। সুতরাং নতুন করে জাতীয় নীতি তৈরি না করলে বিদ্যমান নীতির অধীন এ বিষয়গুলো বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি বা অনিয়ম সারা পৃথিবীতেই আছে। এটা সত্য। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকায় যদি পাঁচ শ খারাপ গবেষক থাকেন, সেটা আমেরিকার গবেষণার সংস্কৃতিতে তেমন কোনো প্রভাবই ফেলে না। কারণ, ওদের ভালো গবেষকের সংখ্যা অনেক। আবিষ্কার-উদ্ভাবনের সংস্কৃতি খুবই শক্তিশালী। ভালোদের স্তর ভেদ করে খারাপেরা সহজে ঢুকতে পারে না। তাই পৃথক হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের বেলায় কিন্তু ভিন্ন। বাংলাদেশে শক্তিশালী গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। কেবল গোড়াপত্তন হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে কোনো শক্ত কর্তৃপক্ষ নেই, যারা এগুলো গুরুত্বসহকারে প্রতিরোধ করবে। দেশের প্রধান বিজ্ঞান গবেষণাগার বিসিএসআইআরের চেয়ারম্যান পালিয়ে গিয়েছিলেন অন্ধকার রাতে। এ থেকেই অনুমান করা যায়, কতটা কলুষিত হয়ে আছে সবকিছু।
একটা সংস্কৃতি তৈরির সূচনাকালে যদি এমন অনিয়মকে শক্তভাবে দমন করা না যায়, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বেশি। তরুণ গবেষকেরা মনে করবেন, গবেষণা মানেই সস্তা প্রকাশনা। তরুণ গবেষকদের মধ্যেও তাড়াহুড়া, অস্থিরতা, শুধু প্রকাশনামুখী মনোভাব তৈরি হবে। যথারীতি এগুলো দেখা যাচ্ছে।
একটা প্রজন্মকে এমন ভ্রান্ত ধারণার মধ্য দিয়ে বাড়তে না দিয়ে তাদের কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে। জ্ঞান-গবেষণায় যাঁরা অনিয়ম করেন, তাঁদের প্রকৃত শাস্তি না হলে ভালো পথপ্রদর্শক তৈরির সংস্কৃতি ব্যাহত হবে।
ড. রউফুল আলম টেকসই উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক লেখক। ই–মেইল: [email protected]