অভিমত–বিশ্লেষণ
যে কারণে সিভিল-মিলিটারি সমন্বয় দরকার
বাংলাদেশে যে কারণে সিভিল-মিলিটারি সমন্বয় দরকার, তা নিয়ে লিখেছেন মো. মিজানুর রহমান
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামের দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সিভিল-মিলিটারি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বসহকারে উপস্থাপিত হয়েছে।
তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতামূলক কাঠামোর ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার একটি বাস্তবসম্মত ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে এই ভারসাম্য রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল। এখানে একদিকে দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, উপকূলীয় ঝুঁকি, সীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যু ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে। এসব উপাদান মিলিয়ে একটি জটিল রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান বা খাত দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা বা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
২.
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যে এ বাস্তবতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায়, যেখানে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যে সিভিল প্রশাসন ও সশস্ত্র বাহিনীর সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়, বরং পরিপূরক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমসাময়িক বিশ্বে ‘সমন্বিত শাসন মডেল’ একটি অপরিহার্য কাঠামো হিসেবে বিবেচিত, যেখানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর ঐতিহাসিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, যা কেবল সামরিক সংঘাত ছিল না; বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক, সামাজিক ও জনগণভিত্তিক জাতীয় আন্দোলন। এই যুদ্ধে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রসমাজ, কৃষক, শ্রমিক, নারী ও সর্বস্তরের জনগণ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস রচনা করে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনগণের অংশগ্রহণ পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সমন্বিত কাঠামো বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, আত্মনির্ভর ও কৌশলগতভাবে সক্ষম এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখা বজায় রেখে সমন্বিত নীতিকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা একটি কার্যকর ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
এই বাস্তবতা সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে একটি বিশেষ ধারণা তৈরি করেছে, যেখানে বাহিনীকে শুধু প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং রাষ্ট্র ও জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণা পরবর্তী সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়।
এই প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সহযোগিতার বাস্তব কাঠামো গড়ে ওঠে, যেখানে সংকটে সশস্ত্র বাহিনী সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে, তবে মূল রাষ্ট্র পরিচালনা থাকবে বেসামরিক কর্তৃত্বে।
এই ধারণা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে এই সম্পর্ক বিকশিত হয়েছে। সংকট, দুর্যোগ, জাতীয় নিরাপত্তা ও নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক সহায়তায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা এখন একটি স্থায়ী উপাদান। ফলে বাংলাদেশ একটি ‘হাইব্রিড শাসন অভিজ্ঞতা’র মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে, যেখানে বেসামরিক ও সামরিক কাঠামো পরস্পর সম্পূরকভাবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করছে।
৩.
সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা, নীতিনির্ধারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ভারসাম্য বিশ্লেষণ করা হয়। মূল প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কি সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক নেতৃত্বের হাতে থাকবে, নাকি সামরিক প্রতিষ্ঠানও নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন বলেন, একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর ভূমিকা অবশ্যই পেশাগত এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হওয়া উচিত। তাঁর মতে, ‘অবজেকটিভ সিভিলিয়ান কন্ট্রোল’ মডেলে সামরিক বাহিনীকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক রাখা এবং তাদের কেবল প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখাই সর্বোত্তম ব্যবস্থা।
এ ধরনের ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও সর্বাধিক নিশ্চিত হয়। তবে বাস্তবে উন্নয়নশীল দেশে এই বিভাজন সব সময় কঠোরভাবে অনুসৃত হয় না। দুর্যোগ, সংকট ও অবকাঠামো উন্নয়নে অনেক সময় সামরিক বাহিনীকে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে হয়। তাই বাংলাদেশের বাস্তবতাও সেখানে সশস্ত্র বাহিনী উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ফলে এখানে সম্পর্ক প্রতিযোগিতামূলক নয়, বরং আস্থা ও দায়িত্ব ভাগাভাগির কাঠামো।
আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তা এখন সীমান্ত বা সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুমাত্রিক কাঠামো, যেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সামাজিক সহনশীলতা অন্তর্ভুক্ত। সাইবার আক্রমণ, তথ্যযুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানিসংকট, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তন এখন সরাসরি নিরাপত্তার অংশ। ফলে নিরাপত্তা এখন সামরিক, বেসামরিক প্রশাসন, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির সম্মিলিত কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষাপটে ‘সমগ্র সরকার পদ্ধতি’ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সব প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করে।
৪.
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব বাস্তবতায় সিভিল ও সামরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা আধুনিক শাসনকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সিঙ্গাপুরে প্রতিরক্ষা বাহিনী কেবল নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতীয় প্রস্তুতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ফলে রাষ্ট্রীয় দক্ষতা ও শৃঙ্খলা উচ্চমাত্রায় বজায় থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা-বেসামরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে, যা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। ভিয়েতনাম দীর্ঘ সংঘাত ও অস্থিরতার পর সামরিক অভিজ্ঞতাকে প্রশাসনিক সক্ষমতায় রূপান্তর করে একটি স্থিতিশীল উন্নয়নকাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। মালয়েশিয়া আবার সামরিক বাহিনীকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে রাষ্ট্রীয় কার্যকারিতা ও প্রস্তুতির সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রমাণ করে যে আধুনিক রাষ্ট্রে সিভিল-মিলিটারি সমন্বয় কোনো পৃথক ধারণা নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত সক্ষমতা, যা শাসনদক্ষতা, সংকট মোকাবিলা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই আলোকে করণীয় হলো—প্রথমত, দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের যৌথ পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া; দ্বিতীয়ত, জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষ করে অবকাঠামো, যোগাযোগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; তৃতীয়ত, নীতি-পরিকল্পনা পর্যায়ে পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয় বৃদ্ধির মাধ্যমে তথ্য বিনিময় ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা জোরদার করা; এবং চতুর্থত, জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কাঠামো গড়ে তোলা, যা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী একটি সুপ্রশিক্ষিত, পেশাদার ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে, যা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে বেসামরিক প্রশাসন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কাঠামো হিসেবে নীতি প্রণয়ন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও জনসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে। এখানে একটি মৌলিক সীমারেখা বিদ্যমান—সশস্ত্র বাহিনী মূলত জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়োজিত একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো, আর বেসামরিক প্রশাসন হলো দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়ন ও নীতি বাস্তবায়নের কেন্দ্রীয় সিভিল কাঠামো। এই দুই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ভিন্ন হলেও লক্ষ্য এক—রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
তাই এদের সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়, বরং পরিপূরক ও সমন্বয়মূলক হওয়া উচিত, যেখানে প্রত্যেকে নিজ নিজ সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখার মধ্যে থেকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
তবে বাস্তবতায় এই সমন্বয়কাঠামো বিভিন্ন ধরনের কাঠামোগত ও কার্যক্রমগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রশাসনিক কেন্দ্রীয়করণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত ধীরগতি, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক তথ্য আদান-প্রদানে সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বয়ের ঘাটতি অনেক সময় কার্যকারিতা হ্রাস করে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের অস্পষ্টতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগে ঘাটতি আস্থার ব্যবধান তৈরি করে, যা যৌথ উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো নিরাপত্তা ও জাতীয় সংকটকালীন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা নীতি বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটায় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতাকে সীমিত করে। এসব চ্যালেঞ্জ দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার দক্ষতা ও জনসেবার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৫.
এই চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণের জন্য একটি সুসংগঠিত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বয়কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য, যেখানে সিভিল ও সামরিক প্রতিষ্ঠান তাদের সাংবিধানিক সীমারেখা বজায় রেখেই পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। তথ্যপ্রবাহের ডিজিটালাইজেশন, নিয়মিত আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় সভা, যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও সংকটকালীন সমন্বিত কমান্ড কাঠামো উন্নয়ন করলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারত্ব বৃদ্ধি পেলে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন হবে। সর্বোপরি দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানে উন্নীত করা সম্ভব হবে।
এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্র প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ও কৌশলগত সক্ষমতাসম্পন্ন কাঠামোতে রূপান্তরিত হবে, যা দুর্যোগ, নিরাপত্তাঝুঁকি ও উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। ফলে নীতি বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি পাবে, সংকট ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের প্রশাসনিক সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
এ ধরনের সমন্বয়কাঠামো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিশ্বমানের হবে, যা সীমান্ত নিরাপত্তা ও
অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জরুরি সাড়া প্রদানের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে জনজীবনের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস পাবে; উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে এবং অবকাঠামো উন্নয়ন আরও সমন্বিত ও নিরাপদ হবে। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হলে শাসনব্যবস্থা আরও জনমুখী, দক্ষ ও স্বচ্ছ হয়ে উঠবে।
সবশেষে বলা যায়, এই সমন্বিত কাঠামো বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, আত্মনির্ভর ও কৌশলগতভাবে সক্ষম এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখা বজায় রেখে সমন্বিত নীতিকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা একটি কার্যকর ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
ড. মো. মিজানুর রহমান অর্থনীতিবিদ ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব