ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ইতিমধ্যে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বৈশ্বিক জ্বালানি-সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানির ভর্তুকি কমানো, রেশনিং এবং সাশ্রয়ী ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। আমাদের মতো প্রায় ৬৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি পারমাণবিক চুল্লি থেকে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটি ইউনিট চালু হলে অন্তত আংশিকভাবে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। ফলে জ্বালানি-সংকট মোকাবেলায় রূপপুর প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত ১৫ মার্চ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পরিচালক (প্রশাসন) স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে আগামী ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।
প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিবেদনে জানা যায়, এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ফুয়েল লোডিংসহ রিঅ্যাক্টরকে ক্রিটিক্যাল করতে প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যাল করা মানে হলো প্রায় শূন্য পাওয়ারে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা।
এরপর ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে রিঅ্যাক্টরের মোট সক্ষমতার প্রায় ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটম ও রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রথম ইউনিট এবং ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ উদ্বোধনের সময় বলা হয়েছিল, প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০২২ সালে প্রথম ইউনিট এবং ২০২৩ সালে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে নানা কারণে প্রকল্পের সময়সূচি পিছিয়ে গেছে। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণে বিলম্বের কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ গত বছর প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্মাণাধীন দুটি ইউনিট দ্রুত চালু করা, প্রযুক্তি দক্ষতার সঙ্গে আয়ত্ত করা এবং রিঅ্যাক্টর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমিয়ে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা।
যদি প্রথম ইউনিট ২০২৬ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৭ সালে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে, তাহলে প্রকল্পটি মূল সময়সূচির তুলনায় চার বছরের বেশি পিছিয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রাথমিক পরিকল্পনার তুলনায় প্রায় নয় বছর পর দুই ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
আন্তর্জাতিক তুলনায় দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে নির্মিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় আট বছরে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে পেরেছিল। অন্যদিকে রাশিয়া বেলারুশে প্রায় সাত বছরে একই পর্যায়ে পৌঁছায়। সেই তুলনায় বাংলাদেশ এখনো বেলারুশের তুলনায় প্রায় দুই বছর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনায় প্রায় এক বছর পিছিয়ে রয়েছে।
প্রকল্প বিলম্বের কারণে শুধু মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবেই রাশিয়ার ৯০ শতাংশ ঋণভিত্তিক বিনিয়োগের ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলধনের সঙ্গে সুদের হিসাব যোগ করলে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
রূপপুর প্রকল্পে দুটি চুল্লির নকশা, নির্মাণ, স্থাপন ও চালুকরণ, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানির পরিচালন ব্যয়, জনবল নিয়োগ ও বেতন–ভাতা এবং রোসাটমের কর্মীদের আবাসনের জন্য গ্রিন সিটি নির্মাণসহ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ১৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া প্রকল্পকে ঘিরে কয়েকটি সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনের সুবিধার্থে রূপপুরসংলগ্ন পদ্মাসহ নদীপথের নাব্যতা বাড়াতে প্রায় ৯৫৬ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা, টেলিযোগাযোগ উন্নয়নে প্রায় ৫২৫ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণে প্রায় ৬ হাজার ৫৬ কোটি টাকার কাজ শেষ পর্যায়ে। পাশাপাশি পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করতে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রায় ৩ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকার ফিজিক্যাল প্রটেকশন সিস্টেম স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
ফুয়েল লোডিংয়ের পর রিঅ্যাক্টর চালু করা এবং প্রথম কয়েক বছর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রোসাটমের সঙ্গে আলাদা চুক্তির আওতায় আরও উল্লেখযোগ্য ব্যয় হবে। প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে সরবরাহকৃত জ্বালানি সাধারণত রিঅ্যাক্টর চালুর প্রায় তিন বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে নতুন জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি করতে হবে। এ ছাড়া ব্যবহৃত জ্বালানি দণ্ড চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্যও উল্লেখযোগ্য ব্যয় হবে।
একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ুষ্কাল সাধারণত প্রায় ৬০ বছর। এই সময়ে উৎপন্ন নিম্ন ও মধ্যমাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি কেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল শেষে ডিকমিশনিং বা নিষ্ক্রিয়করণেও মোট বিনিয়োগের প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। তাই শুরু থেকেই এ জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্বতন্ত্র কোম্পানি প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা দরকার। একই সঙ্গে রিঅ্যাক্টর চালুর আগেই উৎপাদন থেকে সঞ্চালন পর্যন্ত সব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে একটি স্পষ্ট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করা জরুরি।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্মাণাধীন দুটি ইউনিট দ্রুত চালু করা, প্রযুক্তি দক্ষতার সঙ্গে আয়ত্ত করা এবং রিঅ্যাক্টর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমিয়ে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা। বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলীসহ প্রায় ১ হাজার ১০০ জনকে দেশে ও রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে নিজস্ব জনবল দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার সক্ষমতা দ্রুত অর্জন করা সম্ভব হওয়া উচিত।
তবে মনে রাখতে হবে, ফুয়েল লোডিং মানেই সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত মাইলফলক মাত্র। এর পরেও রিঅ্যাক্টর কমিশনিংয়ের বিভিন্ন ধাপে বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয় এবং সবকিছু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ করে করতে হয়।
সাধারণত ধাপে ধাপে পূর্ণ সক্ষমতার দিকে অগ্রসর হয়ে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় এবং একই সঙ্গে সঞ্চালনব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতাও পরীক্ষা করা হয়। পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে পৌঁছাতে সাধারণত ১০ থেকে ১২ মাস সময় লাগতে পারে। তাই দ্বিতীয় ইউনিটের ফুয়েল লোডিংয়ের সময়সূচিও দ্রুত নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ইতিমধ্যেই এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হতে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব হয়েছে এবং এর ফলে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো বিলম্ব না হয়, সেদিকে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এই প্রকল্প যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়। নবগঠিত সরকার প্রকল্পের দুর্বল দিকগুলো খতিয়ে দেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা, আর্থিক নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
ড. মো. শফিকুল ইসলাম অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর, নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র। ই–মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব