যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আবার সংঘাতে, শান্তি চুক্তির কী হবে এখন

পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের কুহেস্তাক বন্দরের একটি এলাকা থেকে ধোঁয়া উড়ছে, ৮ জুলাই ২০২৬। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও চিত্র থেকে নেওয়া স্থিরচিত্রছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে আবার যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে। বুধবার ভোরে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক হামলা পরিস্থিতিকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে তেহরানের হামলার জবাব হিসেবেই এই আঘাত হানা হয়েছে। কিন্তু এই পাল্টা–আঘাতের পরই প্রশ্ন উঠছে—যে শান্তি-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ কি তবে অনিশ্চিত?

হামলার পর তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক কার্যত শেষ। যদিও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেননি, তবু তাঁর মন্তব্যে স্পষ্ট হতাশা। তিনি ইরানের নেতৃত্বকে কড়া ভাষায় আক্রমণও করেন।

এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলার, ইউরোপের শেয়ারবাজারে পতন ঘটেছে, ডলারের দর বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তার ছায়া পড়েছে।

এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছিল। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর জানাজা চলাকালেই এই আলোচনার প্রক্রিয়া এগোচ্ছিল। এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক সম্মতির পর এটিই সবচেয়ে বড় আঘাত।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর জানিয়েছে, তারা পাল্টাহামলা চালিয়েছে। বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ওই দেশগুলোতে সাইরেন বাজতে শোনা গেছে। মার্কিন বাহিনীর একজন সদস্য ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন বলেও আমেরিকার দিক থেকে জানানো হয়েছে।

এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি। মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকম জানিয়েছে, তারা ইরানে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ছিল বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কমান্ড কাঠামো, উপকূলীয় রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা। একই সঙ্গে বিপ্লবী গার্ডের ৬০টির বেশি ছোট নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে—একটি মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী, একটি সৌদি আরবের এবং একটি লাইবেরিয়ার। ইরান অবশ্য দাবি করেছে, ওই জাহাজগুলো তাদের নির্ধারিত নিরাপদ পথ অমান্য করেছিল। প্রণালিতে ইরানের নির্ধারণ করা মানচিত্র অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ওই জাহাজগুলো তা উপেক্ষা করেছিল।

তেহরানের বিশ্লেষকদের মতে, ওই অঞ্চলে মাইন অপসারণের কাজ চলছিল। জাহাজগুলোর গতিবিধি সেই কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়েছিল।

এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর পুনরায় তেল নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আগে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল, যাতে জ্বালানি–সংকট কমানো যায়। জুন মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা অনুযায়ী ৬০ দিনের জন্য ইরানকে তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করা হলো।

ইরানের অর্থনীতির জন্য এই নিষেধাজ্ঞা বড় ধাক্কা। কারণ, দেশটির প্রধান আয় তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানি থেকে আসে। ফলে শান্তি আলোচনার অন্যতম ভিত্তিই এখন নড়বড়ে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের ধারা উল্লেখ করে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের কথাও জানিয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সমঝোতা স্মারকের গুরুতর লঙ্ঘন। তাঁর বক্তব্য, চাপ সৃষ্টি করে কিছুই অর্জন করা যাবে না।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও জানিয়েছেন, এই হামলার ফলে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির মূল কাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে দ্রুত। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, ইরানের কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রতিক্রিয়া প্রয়োজনীয় ছিল।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের মহাসচিব জাসেম আলবুদাইউই ইরানের হামলার নিন্দা করেছেন। কুয়েত, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিসর—সবাই এই পরিস্থিতিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে এবং সংযমের আহ্বান জানিয়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ট্রাম্পের মন্তব্যে পরিষ্কার, তিনি নিজে আলোচনায় আস্থা হারাচ্ছেন। তবে এখনো দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

আসলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সীমিত পরিসরে ছিল। এতে মনে হচ্ছে, তারা সম্পূর্ণ যুদ্ধ চায় না। অবশ্য অনেকেই আবার বলছেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে চাইছে।

ধারণা করি, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষই সময় নিতে চাইছে। তাদের মধ্যে আগস্টের সময়সীমার আগে আরও দর–কষাকষির সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা চলছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তবু শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই হয়তো সংঘাত নয়, সমাধানের পথেই ফিরতে চাইবে—এই আশাই এখন সবচেয়ে বড় ভরসা।

  • শোলা লাওয়াল আন্তর্জাতিক বিষয়ক সাংবাদিক। আল-জাজিরা থেকে নেওয়া।

    ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত।