ডিজিটাল ঋণ যেভাবে দূর করতে পারে বেকারত্ব

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ এখন একসঙ্গে দুটি বড় অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি, কর্মসংস্থান–সংকট এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার আস্থাহীনতা। দেশে বেকারত্ব ও আংশিক বেকারত্ব বাড়ছে। অসংখ্য তরুণ স্থায়ী কাজ পাচ্ছেন না। কেউ গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন, কেউ ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এগুলোর বেশির ভাগই অনিশ্চিত ও অস্থায়ী আয়ের উৎস। মূল সমস্যা হলো, আমরা পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছি না।

অন্যদিকে দেশের ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস সেক্টর গত এক দশকে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করলেও তার একটি বড় অংশ ফেরত আসছে না। নন–পারফর্মিং লোন বা এনপিএল বেড়েছে, খেলাপি হার বেড়েছে এবং মানুষের আস্থা কমেছে। একদিকে ব্যাংকগুলোয় আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে তারা ভালো ঋণগ্রহীতা খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ একই সময়ে দেশের কোটি কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত।

বাকের আলীর গল্প

সমস্যাটি বোঝার জন্য একটি সাধারণ উদাহরণ ধরা যাক। বাকের আলী একটি ইউনিয়ন বাজারে ছোট একটি বেকারি পরিচালনা করেন। তিনি বিস্কুট, রুটি এবং কেক তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন এবং আশপাশের দোকানগুলোতেও সরবরাহ করেন। ব্যবসা মোটামুটি ভালো চলছে। তাই তিনি ব্যবসা বড় করতে চান। একটি বড় দোকান নেবেন, কিছু যন্ত্রপাতি কিনবেন এবং পণ্য সরবরাহের জন্য দুটি ভ্যান কিনবেন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তাঁর প্রায় ১০ লাখ টাকার বিনিয়োগ দরকার।

কিন্তু ব্যাংক শেষ পর্যন্ত তাঁকে ঋণ দিতে রাজি হয় না। কারণ, তিনি আগে কখনো ব্যাংকঋণ নেননি, অর্থাৎ তাঁর তথাকথিত ‘থিন ফাইল’ সমস্যা আছে। তাঁর কাছে বন্ধক দেওয়ার মতো সম্পদ নেই। ছোট ঋণের জন্য ব্যাংকের কার্যকর ও কম খরচের কোনো প্রক্রিয়াও নেই। ফলে ব্যাংকের কাছে এ ধরনের ঋণ দেওয়া ঝামেলাপূর্ণ এবং অলাভজনক মনে হয়। শেষ পর্যন্ত বাকের উচ্চ সুদের হারে (২৪ থেকে ৩০ শতাংশ) মাইক্রোফিন্যান্স বা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। শুধু বাকের একা নন, বাস্তবে, বাকেরের মতো লাখো উদ্যোক্তা প্রতিদিন একই সমস্যার মুখোমুখি হন।

যদি সরকার ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার গড়ে তুলে ক্ষুদ্র ব্যবসাকে অর্থায়নের মূলধারায় আনতে পারে, তাহলে কোটি কোটি উদ্যোক্তা অর্থনীতির নতুন শক্তিতে পরিণত হবে। তখন আজকের বাকের আলীর মতো উদ্যোক্তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবেন। এটাই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি।

বাংলাদেশে এক কোটির বেশি মাইক্রো ও ক্ষুদ্র ব্যবসা আছে এবং এই খাতে তিন কোটির বেশি মানুষ কাজ করেন। কৃষির বাইরে এটিই দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত। তাই এই সেক্টরকে যথার্থই দেশের কর্মসংস্থানের ইঞ্জিন বলা যায়।
তবু এই ব্যবসাগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পায় না। মাত্র ৪ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণ পায়, আর ৩৬ শতাংশ মাইক্রোফিন্যান্স প্রতিষ্ঠান বা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। অথচ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণঝুঁকি খুব বেশি নয়।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় এই খাতে ঋণের এনপিএল মাত্র ২ শতাংশের মতো। অর্থাৎ সমস্যা ঝুঁকির নয়, সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকের ঋণ বিতরণের পদ্ধতি। প্রচলিত পদ্ধতিতে ছোট ঋণের জন্য অনেক কাগজপত্র লাগে, যাচাই–বাছাই জটিল হয় এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের বারবার মাঠে যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটিই বেশি হয়। ফলে এ ধরনের ঋণ ব্যাংকের কাছে লাভজনক মনে হয় না।

যদি ব্যাংকগুলো কার্যকরভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে পারে, তাহলে একসঙ্গে দুটি বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব। ব্যাংকিং সেক্টরের স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং একই সঙ্গে দেশে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাস্তবিক অর্থে এই খাত থেকেই নতুন এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়।

ডিজিটাল সমাধান

এ সমস্যার মূল সমাধান লুকিয়ে আছে ডিজিটাল অবকাঠামোতে। যদি প্রতিটি নাগরিক ও ব্যবসার জন্য সহজে ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট খোলা যায় এবং অধিকাংশ লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে হয়, তাহলে ব্যবসার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে যায়। তখন ব্যাংক সহজেই বিক্রি, নগদ প্রবাহ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিশ্লেষণ করতে পারে।
একটি আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় এটি নিম্নোক্ত ধাপে কাজ করতে পারে:
১. জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে দ্রুত ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট বা ওয়ালেট খোলা।
২. কিউআর কোডের মাধ্যমে সহজে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ।
৩. দৈনন্দিন লেনদেন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আর্থিক প্রোফাইল ও ক্রেডিট স্কোর তৈরি।
৪. আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডিজিটাল প্রসেসিং ব্যবহার করে দ্রুত ঋণ মূল্যায়ন ও অনুমোদন।
৫. ব্যবসার বিক্রির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ কিস্তি আদায়।
ভারত ও চীনের মতো দেশে এই মডেল ইতিমধ্যেই সফলভাবে প্রয়োগ হচ্ছে।
ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই)

এ ধরনের ব্যবস্থার ভিত্তি হলো ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই)। ডিপিআই বলতে এমন কিছু মৌলিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বোঝায়, যা বিদ্যুৎ, রাস্তা বা টেলিকম নেটওয়ার্কের মতো সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য একটি ভিত্তি তৈরি করে। এ অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েই ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে ওঠে। ভারত, ব্রাজিল, এস্তোনিয়া ও রুয়ান্ডার মতো দেশে ডিপিআই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন

ডিপিআইয়ের মূল স্তম্ভ তিনটি। এগুলোকে একত্রে আমরা কোর ডিপিআই বলতে পারি। যেমন ১. ডিজিটাল আইডেন্টিফিকেশন ও অথেন্টিকেশন ২. ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ৩. সম্মতিভিত্তিক ডেটা শেয়ারিং। প্রথম স্তম্ভ ডিজিটাল আইডেন্টিফিকেশন ও অথেন্টিকেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক যাচাই এবং ছবি যাচাইয়ের মাধ্যমে এখন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব হচ্ছে, যা ডিজিটাল আর্থিক সেবার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এনপিএসবি সুইচের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট টু অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার এবং কিউআরভিত্তিক রিটেল পেমেন্ট চালু হয়েছে। সব ব্যাংক ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের অংশগ্রহণে এই অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে ক্যাশলেস ডিজিটাল পেমেন্টকে জনপ্রিয় করা সম্ভব।

তৃতীয় স্তম্ভ সম্মতিভিত্তিক ডেটা শেয়ারিং এখনো গড়ে তোলার পর্যায়ে আছে এবং এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতির জায়গা। ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরের জন্য এই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সুরক্ষিত ফিন্যান্সিয়াল ডেটা এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারে, যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিরাপদ ডেটা শেয়ারিং সক্ষম করবে।

ধরা যাক, বাকেরের একটি ব্র্যাক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং একটি রকেট ওয়ালেট আছে। এখন সে সিটি ব্যাংকে একটি ঋণের জন্য আবেদন করে। বাকের সিটি ব্যাংক অ্যাপ ব্যবহার করে ডেটা এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্মে সম্মতি দেয়, যাতে ব্র্যাক ব্যাংক ও রকেট অ্যাকাউন্টের লেনদেনের তথ্য সিটি ব্যাংকের সঙ্গে শেয়ার করা হয়। এর ফলে সিটি ব্যাংক তার লেনদেন বিশ্লেষণ করে সহজেই ক্যাশ ফ্লো বুঝতে পারে, ঋণঝুঁকি নিরূপণ করতে পারে এবং দ্রুত ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

কোর ডিপিআই ছাড়াও বিভিন্ন সেক্টরে বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত অবকাঠামো প্রয়োজন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ডিজিটাল ক্রেডিট ব্যবস্থার জন্য প্রাইভেট ক্রেডিট ব্যুরো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার মাধ্যমে প্রত্যেক ঋণগ্রহীতার ক্রেডিট স্কোর নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। আনন্দের বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে প্রাইভেট ক্রেডিট ব্যুরোর লাইসেন্স প্রদান করেছে এবং আশা করা যায় ২০২৬ সালের মধ্যেই এগুলো কার্যক্রম শুরু করবে। ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস সেক্টরে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য এটি একটি অপরিহার্য উপাদান।

কীভাবে এগোতে হবে

এই অবকাঠামোর অনেক অংশ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন এগুলোকে একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামোর আওতায় আনা। এ জন্য বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শক্ত সমন্বয় অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল অ্যাকসিলারেশন সেল গঠন করা যেতে পারে, যা জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামোর রোডম্যাপ তৈরি করবে এবং বাস্তবায়নে সমন্বয় নিশ্চিত করবে। আইসিটি ডিভিশন মূল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করবে আর বাংলাদেশ ব্যাংক নেতৃত্ব দেবে ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম গঠনে, যার মধ্যে থাকবে ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট, ক্রেডিট ডেটা শেয়ারিং, ক্রেডিট স্কোরিং এবং ডেটা ড্রিভেন ঋণদান কাঠামো।

এই পরিবর্তনটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের সূচনা। বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখন একটি অনন্য সুযোগ এসেছে। যদি সরকার ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার গড়ে তুলে ক্ষুদ্র ব্যবসাকে অর্থায়নের মূলধারায় আনতে পারে, তাহলে কোটি কোটি উদ্যোক্তা অর্থনীতির নতুন শক্তিতে পরিণত হবে। তখন আজকের বাকের আলীর মতো উদ্যোক্তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবেন। এটাই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি।

  • ড. শাহাদাত খান প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, টালিখাতা ও টালিপে
    * মতামত লেখকের নিজস্ব