আবু সাঈদের উন্মুক্ত দুই হাত ও আমাদের গণতান্ত্রিক কল্পনা

পুলিশের তাক করা অস্ত্রের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদছবি: মঈনুল ইসলাম, ১৬ জুলাই ২০২৪

ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো কোনো ভাষণের মাধ্যমে নয়; একটি দৃশ্যের মাধ্যমে জাতির স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে যায়। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক উন্মুক্ত করে, দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন সশস্ত্র রাষ্ট্রের মুখোমুখি। একটার পর একটা গুলি। তারপর মৃত্যু। কিন্তু সেই মুহূর্তের যে ছবি, তা আর কেবল একজন তরুণের ছবি থাকেনি; সেটি পরিণত হয়েছে প্রতিবাদ, সাহস, আত্মত্যাগ এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে।

দুই বছর পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক চর্চাকে পুনর্গঠনের কঠিন পথে হাঁটছে। আশা, হতাশা, বিতর্ক, রাজনৈতিক সমঝোতা, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও তার ভাঙনের মধ্য দিয়ে আমরা এক অনিশ্চিত সময় অতিক্রম করছি। কিন্তু এই সব ওঠানামার মাঝেও আবু সাঈদের ছবিটি আমাদের সামনে বারবার ফিরে আসে। কারণ, কিছু ছবি শুধু অতীতকে ধারণ করে না; তারা ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

আমরা প্রায়ই রাজনীতিকে সংসদ, নির্বাচন বা ক্ষমতার করিডরে সীমাবদ্ধ করে দেখি। অথচ রাজনীতি মানুষের কল্পনাতেও ঘটে। আমরা কী দেখি, কীভাবে দেখি এবং কী মনে রাখি—এসবের মধ্যেও ক্ষমতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আন্তোনিও গ্রামসি বলেছিলেন, ক্ষমতা শুধু জোর করে টিকে থাকে না; মানুষের সম্মতি ও কল্পনাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠী শুধু আইন নয়, মানুষের চিন্তার জগৎও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কোন ঘটনা ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’ আর কোন ঘটনা ‘দমন-পীড়ন’—এই অর্থ নির্ধারণের লড়াইটাই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের লড়াই।

আবু সাঈদের ছবিটি সেই আধিপত্যে একটি ফাটল তৈরি করেছিল। একজন নিরস্ত্র তরুণের উন্মুক্ত দুই হাত রাষ্ট্রের সহিংসতার সামনে এমন এক নৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল, যার উত্তর বন্দুক দিয়ে দেওয়া যায় না।

ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট হল বলেছিলেন, ছবি কখনো বাস্তবতার নিছক প্রতিফলন নয়; ছবি বাস্তবতার অর্থ নির্মাণ করে। অর্থাৎ আমরা কোনো ছবি দেখে শুধু একটি ঘটনা দেখি না, সেই ঘটনার ব্যাখ্যাও তৈরি করি। আবু সাঈদের ছবিটি আমাদের সামনে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করেছে।

আরও পড়ুন

আবু সাঈদের ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাঁর দেহভঙ্গি। দুই হাত প্রসারিত, বুক খোলা, সামনে এগিয়ে যাওয়া। এটি আত্মসমর্পণের ভঙ্গি নয়; আবার আক্রমণেরও নয়। এটি একধরনের নৈতিক অবাধ্যতা। দার্শনিক জুডিথ বাটলার দেখিয়েছেন, মানুষের দেহও রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠতে পারে। কোনো মানুষ যখন জনসমক্ষে নিজের দেহ নিয়ে দাঁড়ায়, তখন সে কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, একটি রাজনৈতিক দাবি নিয়েও হাজির হয়। এ কারণেই ছবিটি এত দ্রুত মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। এ ছবি সাহসের দৃশ্যমান রূপ। সাহস সংক্রামক। প্রতিবাদও সংক্রামক।

বিশ্ব ইতিহাসে কিছু ছবি যুগের নৈতিক সংকটকে ধারণ করেছে। নূর হোসেনের ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা খোলা বুক, ভিয়েতনামে নাপাম বোমায় দগ্ধ শিশুর দৌড়, তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ট্যাংকের সামনে দাঁড়ানো অজ্ঞাত তরুণ কিংবা জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ভিডিও—এসব দৃশ্য মানুষকে শুধু তথ্য দেয়নি; অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে।

ফরাসি দার্শনিক জাক রঁসিয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছিলেন, ‘কে দৃশ্যমান হবে, কার কণ্ঠ শোনা যাবে, কোন যন্ত্রণা রাজনৈতিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে’—এটাই ক্ষমতার একটি বড় প্রশ্ন। আবু সাঈদের ছবি এমন একজন তরুণকে দৃশ্যমান করেছিল, যিনি সাধারণত রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে অবস্থান করেন। সেই দৃশ্যমানতাই আন্দোলনকে নতুন নৈতিক শক্তি দেয়।

আজ আবু সাঈদের ছবির দিকে তাকালে আমার মনে হয়, এটি কেবল একজন শহীদের স্মৃতি নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কল্পনার পরীক্ষা। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ছি, যেখানে নাগরিক ভয় ছাড়াই প্রশ্ন করতে পারবে? আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করছি, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু নয়, গণতন্ত্রের সম্পদ হিসেবে দেখা হবে? আমরা কি সংস্কারের প্রতিশ্রুতিকে ক্ষমতার সুবিধার কাছে বিসর্জন দিচ্ছি?

তবে ছবির শক্তি যত বড়, তাকে ঘিরে লড়াইও তত বড়। কোনো আন্দোলনের প্রতীক কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি সেই প্রতীকের অর্থ নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করতে চায়। কে শহীদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী, কার রাজনীতি তাঁর স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করে—এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ওয়াল্টার বেঞ্জামিন একসময় লিখেছিলেন, আধুনিক রাজনীতিতে ক্ষমতা নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলে প্রতীক, আচার এবং দৃশ্যের মাধ্যমে। কিন্তু একইভাবে প্রতিরোধও নিজের ভাষা খুঁজে পায় দৃশ্যমানতার মধ্য দিয়ে। আবু সাঈদের ছবিটি ছিল প্রতিরোধের সেই নন্দনতত্ত্বের এক অসাধারণ প্রকাশ।

আবু সাঈদের ছবিকে যদি আমরা কেবল একটি দলের সম্পদে পরিণত করি, তবে ছবিটির নৈতিক শক্তি কমে যাবে। কারণ, তাঁর উন্মুক্ত দুই হাত কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের প্রতীক ছিল না; সেটি ছিল মুক্ত নাগরিকের সাহস।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামনে একটি বিরল রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, সাংবিধানিক সংস্কার, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং নাগরিক অধিকারের নতুন ভিত্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ। কিন্তু ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান নিজে গণতন্ত্র নিশ্চিত করে না। পুরোনো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলেও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রায়ই টিকে থাকে। আজ আমরা সেই বাস্তবতার মুখোমুখি।

গুলির সামনে বুক টান করে দাঁড়ানো রংপুরের সেই আবু সাঈদ। রংপুর পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি
ছবি: মঈনুল ইসলাম

আজ আমরা দেখছি, সংস্কারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। কখনো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে, কখনো ক্ষমতার বাস্তব রাজনীতির যুক্তিতে, কখনো দলীয় স্বার্থের কারণে মৌলিক সংস্কারের এজেন্ডা পিছিয়ে যাচ্ছে। সংবিধান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সংবিধানকে যদি গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ঠেকানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা সংবিধানের চেতনার সঙ্গেই বিরোধ তৈরি করে।

একই সঙ্গে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতাও স্পষ্ট হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে উগ্র ডানপন্থা ও অসহিষ্ণু রাজনীতির নানা রূপ সমাজে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছে। ইতিহাস বলে, যখন গণতান্ত্রিক শক্তি সংস্কারের প্রশ্নে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তখন চরমপন্থী শক্তি সহজ উত্তর নিয়ে সামনে আসে। তারা বৈচিত্র্যের বদলে একরূপতা চায়, নাগরিকত্বের বদলে পরিচয়ের রাজনীতি চায়, যুক্তির বদলে আবেগকে অস্ত্র বানায়।

এই প্রেক্ষাপটে আবু সাঈদের ছবির নতুন পাঠ জরুরি। এটা একটা পলিটিক্যাল টেক্সট। ছবিটি আমাদের বলে দেয় কী ঘটেছিল, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ছবিটি আমাদের বলে দেয় কীভাবে সেই ঘটনাকে মনে রাখতে হবে। তাঁর ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রের মূল শক্তি কোনো একক নেতা, দল বা মতাদর্শ নয়; মূল শক্তি হলো সাহসী নাগরিক।

আরও পড়ুন

আজ আবু সাঈদের ছবির দিকে তাকালে আমার মনে হয়, এটি কেবল একজন শহীদের স্মৃতি নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কল্পনার পরীক্ষা। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ছি, যেখানে নাগরিক ভয় ছাড়াই প্রশ্ন করতে পারবে? আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করছি, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু নয়, গণতন্ত্রের সম্পদ হিসেবে দেখা হবে? আমরা কি সংস্কারের প্রতিশ্রুতিকে ক্ষমতার সুবিধার কাছে বিসর্জন দিচ্ছি?

ইতিহাসে অনেক ছবি সময়ের সঙ্গে বিবর্ণ হয়ে যায়। আবার কিছু ছবি সময়ের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়, কারণ তারা শুধু একটি ঘটনার দলিল নয়; তারা একটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির স্মারক।

আবু সাঈদের উন্মুক্ত দুই হাত আমাদের সামনে আজও সেই প্রতিশ্রুতির প্রশ্ন তোলে। সেই প্রশ্নের উত্তর স্মৃতিচারণায় নয়, আমাদের রাজনৈতিক আচরণে। উত্তর আছে—আমরা কেমন রাষ্ট্র গড়ি, কেমন সমাজ নির্মাণ করি এবং কেমন গণতন্ত্র চর্চা করি—তার মধ্যে। কারণ, শেষ পর্যন্ত ইতিহাস শুধু শহীদ সৃষ্টি করে না; ইতিহাস বিচারও করে তাঁদের স্বপ্নের প্রতি আমরা কতটা বিশ্বস্ত থাকতে পেরেছি।

  • কাজী মারুফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব