দীর্ঘ দেড় দশকের এক রুদ্ধশ্বাস সময় পার করে বাংলাদেশ আবার নির্বাচনী ব্যবস্থায় পদার্পণ করছে। এই নির্বাচনী ওয়াক্ত আমার বিবেচনায় এই নির্বাচন দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, ১৫ বছর ধরে স্থবির হয়ে পড়া নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পুনরায় সচল করা, অথবা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থায় পদার্পণ; দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী প্রক্রিয়াটিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য একটি টেকসই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিশ্চিত করা।
এবারের সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট এই দুটির মিশেল; এটা কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাউকে ক্ষমতায় আনা নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে লুপ্ত হয়ে যাওয়া গণতন্ত্রের ‘ন্যূনতম’ প্রবেশপথ পুনরুদ্ধার ও জিইয়ে রাখার সংগ্রামের ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অধ্যায় হলো ভোটাধিকারের মতো একটি মৌলিক অধিকার এখানে দুর্লভ বস্তুতে পরিণত হয়েছে। আমরা আজ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো স্বীকৃত পথ বের করতে পারিনি। ফলে, যিনি বা যাঁরা ক্ষমতায় যান, তাঁরা আইনকানুনের মারফত এমন সব ফন্দিফিকির করেন যে তাঁদের নামাতে হয় টেনেহিঁচড়ে অথবা রাজপথ নাগরিকের রক্তে রঞ্জিত করে।
অভ্যুত্থানের পর সংস্কার কমিশন তৈরি এবং এর ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সমাজের সমঝোতার প্রচেষ্টা এবং রাজনৈতিক পরিপক্বতার বীজ বপন করার চেষ্টা হয়েছে, এই নির্বাচন তার একটি ধাপমাত্র—চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।
আমাদের নাগরিক সমাজে ‘প্রকৃত গণতন্ত্র’ খোঁজার নামে একধরনের ‘নির্বাচনবিরোধী’ বয়ান প্রায়ই শোনা যায়। এক পক্ষ মনে করে, নির্বাচন দিয়ে আদৌ জনগণের নসিবের কোনো হেরফের হয় না, জনগণের মুক্তি সম্ভব হয় না। তাদের কাছে সংসদ হলো ‘শুয়োরের খামার’।
অন্য পক্ষ মনে করে, স্রেফ নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র টেকসই হয় না; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। দুটি পক্ষই চিন্তার বাজারে ‘লিবারেল ডেমোক্রেসি’র চালু ক্রিটিকগুলোকে এস্তেমাল করে তাদের এই ‘নির্বাচনবিরোধী’ বক্তব্য পেশ করে। তাদের বক্তব্যের মর্মকথা বোঝা সহজ; কিন্তু যে দেশে এই ‘নির্বাচন’টাই গায়েব হয়ে যায় বা গায়েব করে দেওয়ার যাবতীয় বন্দোবস্ত বিরাজ করে, সেখানে এই ধরনের বক্তব্যগুলো স্বৈরতন্ত্র ব্যবহার করে। বিশেষত শেখ হাসিনার ১৫ বছর ধরে এ ধরনের যুক্তির হরদম ব্যবহার আমরা দেখেছি।
’১৪, ’১৮ বা ’২৪ সালের ভোট কারচুপির ‘নির্বাচনী লীলাখেলা’র পর লেখা বা বলা হতো, ‘নির্বাচনই কি গণতন্ত্র?’, তখন এ ধরনের যুক্তির দেখা মিলত। অর্থাৎ গত ১৫ বছরের ‘ভয়ংকর নির্বাচনী লীলাখেলার’ সময় যখন এই যুক্তিগুলো দিয়ে ভোটাধিকারকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণের চেষ্টা চলত, তখন তাদের নিয়ত বোঝা কঠিন ছিল না।
এই লড়াইয়ের ব্যাপারে ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড জিনকে স্মরণ করা যেতে পারে। তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি ভোট দেন কি না। তিনি বলেছিলেন, বুথের ভেতরে মাত্র এক মিনিটের জন্য তিনি কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করেন; কিন্তু বুথ থেকে বের হওয়ার পর তাঁর আসল কাজ শুরু হয় মানুষকে সংগঠিত করার। তাঁর মতে, যদি আপনার কোনো শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন থাকে, তাহলে পদের দায়িত্বে কে রয়েছেন সেটি অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।
‘নির্বাচন’ মাধ্যমে শাসক ছাড়া কিছুই বদলাবে না—এই অমোঘ ও ক্রিটিক বাণী স্মরণ ও বরণ করেও আমাদের বলতে হবে, আমাদের ‘নির্বাচন’ই লাগবে। এটি গণতন্ত্রের প্রবেশদ্বার। এই দরজা বন্ধ হয়ে গেলে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতার পথ প্রশস্ত হয়। তাই হাজারো সীমাবদ্ধতার পরও আমাদের বলতে হবে, ‘আমাদের নির্বাচনই লাগবে।’ নির্বাচনের পর হয়তো অনেকে বলবেন, ‘দেখলেন তো, কিছুই বদলায়নি!’ কিন্তু তবুও আমাদের এই প্রক্রিয়া জিইয়ে রাখতে হবে।
এবারের নির্বাচন আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার শুরু মাত্র। নির্বাচনের পর দুটি বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে হাজির হবে। প্রথমত, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন ও ১৮০ দিনের অগ্নিপরীক্ষা। এই সনদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো ঐকমত্য হয়নি।
গত দেড় বছর বিবদমান পক্ষগুলোকে টেবিলে বসানোর জন্য একধরনের ‘নিরপেক্ষ’ মধ্যস্থতাকারী থাকত; কিন্তু এবার নির্বাচিত সরকার নিজেই হবে একটি পক্ষ। ফলে সমঝোতার পথ হবে কণ্টকাকীর্ণ। দ্রুত সংসদ ছেড়ে রাজপথে গড়াবে সনদের লড়াই। এক পক্ষ বলবে, সনদের ব্যতিরেক হচ্ছে; আরেক পক্ষ বলবে জনগণের ম্যান্ডেট আছে। ফলে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার মিডলগ্রাউন্ড খোঁজা কষ্টকর হবে। তখন সমঝোতা কীভাবে হবে, নাকি আদৌ হবে না—এটা একটা বড় প্রশ্ন ও ঝুঁকি আকারে রয়ে যাচ্ছে আমাদের সামনে।
এই ১৮০ দিনই ঠিক করে দেবে আমাদের রূপান্তর মসৃণ হবে নাকি আমরা আবার পুরোনো সংঘাতের আবর্তে তলিয়ে যাব। মনে রাখা দরকার, হালজমানায় এই ধরনের গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক রূপান্তর যতটা ভাবা হয়, বাস্তবে সেটি বহু কষ্টার্জিত। রূপান্তরটা যে সুষ্ঠুভাবে হয়নি, উল্টো যাত্রা করেছে, এমন ভূরি ভূরি নজির রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের পরপর আমাদের অ্যাকটিভিস্ট ও নাগরিক সমাজের জন্য সামনে রয়েছে বিশাল চ্যালেঞ্জ। একদিকে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের পুরোনো অংশ হারিয়ে গিয়েছে, গত রেজিমে জন্ম নেওয়া নতুন জাগ্রত অংশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ভিড়েছেন। ফলে, এই শূন্যাবস্থা কাটাতে এখানে নতুন রাজনৈতিক সমাজ বিনির্মাণের লড়াই শুরু করতে হবে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ। আমাদের প্রজন্মের রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজমের পুরোটাই ঘটেছে ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরতান্ত্রিক রেজিমের আমলে। যে রাজনৈতিক ভাষায় আমি বা আমরা স্বৈরাচারকে জবাব দিয়েছি, গণতান্ত্রিক রূপান্তরকালে বা গণতান্ত্রিক পর্যায়ে, আমাদের সেই ভাষা কেমন হবে বা হওয়া উচিত, সেটিও আমাদের নির্মাণ করতে হবে। নাকি একই ধরনের ভাষায় হবে? এটা দীর্ঘমেয়াদি লড়াই। প্রায়ই আমাদের রাজনৈতিক ভাষাও ঠিক করে দেয় আমাদের দিশা।
আসন্ন নতুন পরিস্থিতি নিয়েই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করব। পাঁচ বছর পরপর যেন আমি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারি, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে পারি, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় আর যেন কোনো নাগরিকের রক্ত ঝরাতে না হয়—এটা নিশ্চিত করার যে লড়াই, তাতে আমরা প্রবেশ করব। পাশাপাশি যে সংস্কারের জিকির রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো হরদম জপে যাচ্ছেন, সেটিকে বাস্তবায়নের জন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সক্রিয়তা দরকার।
এই লড়াইয়ের ব্যাপারে ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড জিনকে স্মরণ করা যেতে পারে। তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি ভোট দেন কি না। তিনি বলেছিলেন, বুথের ভেতরে মাত্র এক মিনিটের জন্য তিনি কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করেন; কিন্তু বুথ থেকে বের হওয়ার পর তাঁর আসল কাজ শুরু হয় মানুষকে সংগঠিত করার। তাঁর মতে, যদি আপনার কোনো শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন থাকে, তাহলে পদের দায়িত্বে কে রয়েছেন সেটি অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।
জিনকে উসিলা ধরলাম কেবল নির্বাচনোত্তর আমাদের সক্রিয়তার জরুরত বোঝানোর জন্য। আমাদের ক্ষেত্রেও তা-ই। নির্বাচনের পরপর আমাদের ক্রমাগত সক্রিয়তা জারি রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যাত্রায় নির্বাচন কেবল যেন সেই প্রবেশদ্বার, এরপর ক্রমাগত সক্রিয়তার মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে মসৃণ করতে হবে। এদিক থেকে আজকের নির্বাচনের পর আমাদের লড়াই শুরু হবে।
সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব