ট্রাম্পের অপমান ইরানিদের প্রতিরোধ হয়ে উঠছে

দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিমান হামলায় নিহত শিশু শিক্ষার্থীদের স্মরণে তেহরানের ভ্যালিয়াসর স্কয়ারে মাটিতে জুতা ও স্কুল ব্যাগ রাখা হয়েছে। পেছনে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি-এর বিশাল বিলবোর্ড। এই যুদ্ধ ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।ছবি: এএফপি

ইরানকে বোঝার জন্য তার আধুনিক ইতিহাসের দিকে তাকালেই একটি স্পষ্ট ছবি দেখা যায়। সেখানে বারবার অপমান আর সেই অপমান থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিরোধের ইতিহাস দেখা যায়।

উনিশ শতকের শেষ দিকে ইরানে একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা এ প্রবণতাকে প্রথম বড় করে সামনে আনে। বিদেশি একটি কোম্পানিকে তামাকের ব্যবসার একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয়।

এতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, এমনকি ধর্মীয় নেতারাও ক্ষুব্ধ হন। ১৮৯২ সালে নজাফ থেকে এক ধর্মীয় নেতার জারি করা ফতোয়া গোটা দেশকে থামিয়ে দিয়েছিল। সেই নেতার আহ্বানে হঠাৎ করে সারা দেশে মানুষ তামাক ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। বাজারে, ঘরে, এমনকি রাজদরবারেও কেউ তামাক ছোঁয় না। বিষয়টি শুধু তামাক ছিল না, এটি ছিল অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

আরও পড়ুন

রাজনীতির একটি সহজ নিয়ম আছে, যা সাম্রাজ্যগুলো বারবার বুঝতে ব্যর্থ হয়। তা হলো অপমান আনুগত্য তৈরি করে না; বরং প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। এটি ধীরে ধীরে জমে, গভীরে প্রোথিত হয় এবং সময়ের সঙ্গে আরও তীক্ষ্ণ ও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। এটি ভুলে যাওয়া যায় না। এটি জমতে থাকে আর পরিণত হলে তা আনুগত্য নয়; বরং অস্বীকৃতি হয়ে ফিরে আসে।

ইরানের আধুনিক ইতিহাস আসলে এই জমে ওঠা প্রতিরোধের ইতিহাস। তামাক বর্জন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি দেখিয়েছিল, মর্যাদাহানির বোধে একত্র মানুষ দেশীয় শাসন ও বিদেশি নিয়ন্ত্রণ—উভয়কেই চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।

সেই সময় থেকেই একটি গভীর পরিবর্তন শুরু হয়। ধর্মীয় নেতৃত্ব, ব্যবসায়ীশ্রেণি ও সাধারণ মানুষের যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা বিলীন হয়নি; বরং তা বিকশিত হয়েছে।
১৯০৬ সালে সেটিই রূপ নেয় সাংবিধানিক বিপ্লবে, যা পারস্য ভাষায় মাশরুতে বিপ্লব নামে পরিচিত। এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম গণ–আন্দোলনগুলোর একটি, যেখানে জবাবদিহিমূলক শাসনের দাবি উঠেছিল।

প্রথমবারের মতো কাজার শাসনামলে একটি পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এখানেই একটি বড় পরিবর্তন ঘটে—প্রতিরোধ ধীরে ধীরে কাঠামোবদ্ধ রাজনীতিতে রূপ নিতে শুরু করে।

আরও পড়ুন

এরপর আসে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের অধ্যায়। ১৯৫১ সালে তিনি ইরানের তেল জাতীয়করণ করেন, যা ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটায়। সে সময় মনে হয়েছিল, সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব। কিন্তু সেই সময় স্থায়ী হয়নি। মাত্র দুই বছর পর, ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সহায়তায় একটি অভ্যুত্থানে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে পুনর্বহাল করা হয়। বার্তাটি ছিল পরিষ্কার—স্বাধীনতা সহজে মেনে নেওয়া হবে না।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবও কোনো হঠাৎ বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের ফল। এটি ছিল অপমানের পর অপমান, হস্তক্ষেপের পর হস্তক্ষেপ। এটিকে যদি শুধু কয়েকজন ‘উন্মাদ মোল্লা’র কাজ বলে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে তা ইতিহাসকে বিকৃত করা ছাড়া কিছুই নয়।

এই একই অগভীর দৃষ্টিভঙ্গি আজকের মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেও দেখা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায় ইরানকে প্রায়ই ‘পাগল’ বা ‘উন্মাদ’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অজ্ঞতা নয়; বরং ইতিহাস সম্পর্কে একধরনের অন্ধত্ব।

ইরান একা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেই একই ধারা দেখা গেছে। ঔপনিবেশিক শাসন কখনোই স্থায়ী আনুগত্য তৈরি করেনি; বরং বারবার প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছে।

উনিশ শতকে যে অতিরিক্ত সহিংসতা প্রয়োগ করে এ অঞ্চলকে দমন করা হয়েছিল, তা আনুগত্য নয়; বরং বিদ্রোহের ঢেউ তৈরি করেছিল। এ প্রক্রিয়া হঠাৎ করে ঘটেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি গড়ে উঠেছে, প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন স্মৃতি।

যারা রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিল, তারাও এ প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। সুফি আন্দোলন চাপের মুখে বাহিরমুখী হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

আলজেরিয়ায় আমির আবদেলকাদের ফরাসি দখলদারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। একজন সুফি চিন্তাবিদ হয়েও তিনি যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

সুদানে মুহাম্মদ আহমদ মাহদি আন্দোলনের মাধ্যমে খার্তুম দখল করেন এবং সাম্রাজ্য-সমর্থিত শাসনকে উৎখাত করেন। লিবিয়ায় সেনুসি তরিকা আধ্যাত্মিক নেটওয়ার্ককে প্রতিরোধের শক্তিতে রূপান্তর করে ইতালীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই চালায়।

মরক্কোর উত্তরে আবদেলকরিম এল খাত্তাবি রিফ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। তিনি ১৯২১ সালে স্প্যানিশ বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং একটি প্রজাতন্ত্র গঠন করেন; যদিও পরে স্পেন ও ফ্রান্সের যৌথ আক্রমণে তা ভেঙে পড়ে।

মধ্য এশিয়ায় নকশবন্দি তরিকা রুশ সাম্রাজ্যের বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মাধ্যম হয়ে ওঠে। এভাবেই আধ্যাত্মিক ধারাগুলো ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিরোধে রূপ নেয়।
ইরানেও কোম ও নজাফের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একই পথ অনুসরণ করে। শিক্ষাকেন্দ্র থেকে তারা ধীরে ধীরে জনসমাবেশের শক্তিতে পরিণত হয়। এর চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে।

ট্রাম্প অবাক হয়ে দেখছেন, সামরিক শক্তি, যুদ্ধজাহাজ, হুমকি—এই সবকিছুই কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। এর উত্তর খুব সহজ। তিনি এ অঞ্চলকে চেনেন না, এর ইতিহাস জানেন না। তিনি শক্তি দেখেন, কিন্তু স্মৃতি দেখেন না।

এ ইতিহাসই আজ উপেক্ষিত। বারবার অপমানিত একটি সমাজ কোনো হুমকিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখে না। তারা তা নিজেদের স্মৃতির অংশ করে নেয়।

ট্রাম্প ভেবেছিলেন, তিনি ইরানকে বিভক্ত করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি দেখেছেন উল্টোটা। তিনি দেখেছেন, এতে একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ বাইরের আগ্রাসনের মুখে আরও সংহত হয়েছে।

দশকের পর দশক চাপের মুখে থেকেও ইরান সহজে নতি স্বীকার করে না। ট্রাম্প বুঝতে পারেননি, আলী খামেনির মতো একজন নেতাকে লক্ষ্য করা মানে শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে নয়; বরং লাখ লাখ মানুষের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আঘাত করা। ইসলামের পবিত্র মাসে এমন হামলা শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়; বরং গভীর অবমাননার অনুভূতি তৈরি করে।

ট্রাম্প মনে করেন, সহিংসতা ও হুমকি দিয়ে আনুগত্য আদায় করা যায়। কিন্তু তিনি ভুল করছেন। যেসব আরব শাসক তাঁর কাছে নতি স্বীকার করে, তারা নিজেদের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। এই অঞ্চলে অপমানের প্রতিক্রিয়া আনুগত্য নয়; বরং তার বিপরীত।

ট্রাম্প অবাক হয়ে দেখছেন, সামরিক শক্তি, যুদ্ধজাহাজ, হুমকি—এই সবকিছুই কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। এর উত্তর খুব সহজ। তিনি এ অঞ্চলকে চেনেন না, এর ইতিহাস জানেন না। তিনি শক্তি দেখেন, কিন্তু স্মৃতি দেখেন না।

এ অঞ্চলে এ পার্থক্যটাই সবকিছু। একটি ছোট অবরুদ্ধ ভূখণ্ড। এখানে বোমাবর্ষণ চলছে। এখানে খাদ্যের অভাব, বিচ্ছিন্নতা আছে। তবু মানুষ আত্মসমর্পণ করছে না। লেবাননের মতো ছোট দেশও অসমশক্তির মুখে টিকে আছে, তাকে পুরোপুরি দমন করা যাচ্ছে না।

লিতানি নদী শুধু ভৌগোলিক লক্ষ্য নয়, এটি প্রতীক। এখানে অপরিসীম শক্তিও কখনো স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

এ প্রতিরোধ কোনো অতিরিক্ত অস্ত্রের কারণে নয় বা অন্ধ উন্মাদনার ফলও নয়। আসল শক্তি অন্য জায়গায়। সেটি হলো মর্যাদা।

তিউনিসিয়ার কবি আবু আল–কাসিম আল–শাব্বি একবার ফরাসি উপনিবেশবাদীদের সতর্ক করে লিখেছিলেন—

‘সাবধান! ছাইয়ের তলে কিন্তু আগুন লুকিয়ে থাকে
যে কাঁটা বোনে, ফল হিসেবে সে ক্ষতই ফেরত পায়।’

  • সুমাইয়া ঘানুশি ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ।
    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া
    অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ