‘হ্যাঁ’ ভোট চাওয়া যে কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তর্ক-বিতর্কে আড়ালে থাকছে একই দিনের আরেকটি নির্বাচন। সেটি হলো—গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রস্তাব সংবলিত গণভোট।

এই গণভোটের পক্ষে জনসমর্থন আদায় করা প্রসঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে গোপনে ও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।

নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকে উত্তরণের পথ নির্মাণে কাজ করছে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর দায়িত্ব পাওয়া এই অন্তর্বর্তী সরকার।

আদর্শিকভাবে সেই সরকার কেন ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত দেখতে চায়, সে অনুমানের সঙ্গে কোন নিজস্ব ‘ক্ষুদ্র স্বার্থে’ গণভোটে অবস্থান নিয়েছে সরকার এবং তা নৈতিকভাবে সঠিক কিনা, তা গুলিয়ে ফেলেছেন অতি উৎসাহীরা।

ইনিয়ে-বিনিয়ে গণভোট ও সরকারের সমালোচনার মধ্যে আরেকটি সুর লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকে বলছেন, তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে একতরফা নির্বাচন করায় পতিত শেখ হাসিনা প্রশাসনের অপরাধটা কোথায়? যেন ক্ষমতা ধরে রাখতে ভোটে কারচুপি এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে গণভোটের প্রস্তাবে জনসমর্থন প্রার্থনা একই জিনিস।

আরও পড়ুন

বোঝা যাচ্ছে সমালোচকেরা (পড়ুন নিন্দুকেরা) যথেষ্ট নিশ্চিত নন জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট আসলে কী ও কেন এবং ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের চরিত্র, এখতিয়ার, কার্য পরিধি ও বিশেষ দায়িত্ব কতটা গভীর। তাঁরা হয়তো ভিন্ন যুক্তি আমলে নেননি অথবা অপ্রিয় সত্য স্বীকার করতে দ্বিধাগ্রস্ত।

প্রথমত, গণভোটের বিবেচ্য বিষয় জুলাই সনদ ইউনূস সরকারের কোনো এজেন্ডা নয়, এটি একটি জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল।

গণমানুষের অংশগ্রহণে সংঘটিত জুলাই-২০২৪ বিপ্লবের চেতনার ভিত্তি এবং পরবর্তীতে সমস্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল স্বাক্ষরিত দলিলের পক্ষে আবারও বৃহত্তর জনগণের সম্মতি বা অনুমোদন চেয়ে কাজ করা চলমান প্রশাসনের দায়িত্ব মাত্র।

দ্বিতীয়ত, গণবিস্ফোরণে সর্বগ্রাসী ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং হত্যা, গুম, দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধের বিচার শুরুর পাশাপাশি সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ম্যান্ডেট ও দায়িত্ব পড়েছে এই সরকারের ওপর। জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়ন করা এর বড় কাজের একটি।

তৃতীয়ত, ইউনূস সরকারের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি একেবারেই অবান্তর; কেননা এটি নির্দলীয় কেয়ারটেকার (তত্ত্বাবধায়ক) সরকার নয়; আর গণভোট আয়োজন করছে এক ধরনের ঐকমত্যের মাধ্যমে গঠিত নির্বাচন কমিশন।

আরও পড়ুন

এ সরকারের অবস্থান অবশ্যই পতিত হাসিনা প্রশাসনের সমস্ত অপকর্মের বিরুদ্ধেই। বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে পরাজিত (অপ) শক্তির কোনো জায়গা নেই, গণভোটের প্রস্তাবগুলোই তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ।

সুতরাং অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ প্রতিপালন করতে গিয়ে সমালোচনার মুখে ‘শরম’ পাওয়ার কিছু নেই কর্তৃপক্ষের।

এই লেখক আগেও লিখেছেন প্রফেসর ইউনূসের সরকার দলীয় না হলেও রাজনৈতিক সরকার এবং এর সিদ্ধান্তসমূহের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অভিঘাত থাকবে, এটিই স্বাভাবিক।

অবশ্য এ সরকার গণভোটের ‘হ্যাঁ’ প্রস্তাবে ভোট দিতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করায় লজ্জা পাচ্ছেন তাঁরাই যাঁরা হাসিনা সরকারের ভেতর থেকে তিন তিনটি নির্বাচনে জনগণকে ভোটবঞ্চিত করতে কাজ করেছেন, বাইরে থেকে রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন জুগিয়েছেন এবং দূর থেকে হাত তালি দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

ইউনূস সরকারের ভূমিকার দিকে মনযোগ আকর্ষণ করে তবে কি তাঁরা গণভোটের সব ইতিবাচক প্রস্তাব/উদ্যোগ থেকে সচেতন ভোটারদের পর্যন্ত দূরে রাখতে চাইছেন?

যদি সংস্কারের পক্ষে একটি সম্ভাব্য বিদায়ী সরকারের গণমুখী অবস্থান সম্পর্কে বিরুদ্ধবাদীদের উদ্বেগ ও সন্দেহ আমলে নিই, তাহলে আমাদের হাসিনা যুগে ফিরে যেতে দোষ নেই।

এর অর্থ দাঁড়াবে রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করা ও তাঁর ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার মধ্যে কোনো অন্যায় ছিল না; গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলা, জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা, জাতীয় সম্পদ লুট করা এবং হত্যা, গুম ও বিবেকের স্বাধীনতা খর্ব করার মধ্যেও কোনো অন্যায় ছিল না। এর অর্থ দাঁড়াবে, এগুলো ইচ্ছা করলে ভবিষ্যতেও করা যেতে পারে।

নইলে গণভোটে জনগণের সম্মতি চাওয়া সংস্কার প্রস্তাবে (যেমন সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ) বিরোধিতা করার যৌক্তিকতা কোথায়!
আপনারা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত’ প্রস্তাবগুলোর প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন না করলে আপনাদের নিজস্ব এবং জাতীয় অধিকার লঙ্ঘন করার সুযোগ অবারিত হবে—এটি জনগণকে বলে দিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রচারপত্র।
ছবি: প্রথম আলো

এই ভোটে জয়-পরাজয় ইউনূস সরকারের জন্য কোনো লাভ-লোকসান বয়ে আনবে না। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন না যে, জিতলে তাঁরা ক্ষমতায় থাকবেন, আর হারলে বিদায় নেবেন।

শুধু ইউনূস সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে একটি সর্বজনীন এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রচিত বিষয়সমূহকে বিতর্কিত করার চেষ্টা কোনো সুস্থ চিন্তা নয়; জন-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে তা তো নয়ই।

মানুষের অধিকার রক্ষার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্ত থাকুক সেটা সর্বজনীন চাওয়া।

সেই আয়োজন ভেস্তে যাক সেটা কাদের চাওয়া, তা বাংলাদেশের যে কেউ বোঝে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণভোটের বিষয়বস্তু ও ফলাফল সম্পর্কে তাঁরা এমন সব কথা প্রচার করছেন যার কিছুই প্রস্তাবে লেখা নেই।

এই ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী (হতে পারে তারা ১৫-২০ শতাংশ ভোটার) জনগণের সব অধিকার হরণে হাসিনার নীল নকশা এবং নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড সমর্থন করে গেছেন অন্তত দেড় দশক ধরে।

তাদের নেত্রী পালিয়ে যাওয়ার পর গত দেড় বছরেও তারা দুঃখ প্রকাশ করার সময় পায়নি। অনুমান করি তারা ‘না’ ভোট দেবে এবং নীরবে ঘোষণা করবে, হাসিনা যা করেছেন তা ঠিকই ছিল। সুতরাং গণভোটে ওই হারের সমান ‘না’ ভোট বাদ দিয়ে গণনা করলে কি নৈতিকভাবে ভুল কাজ হবে?

জনগণ যদি সচেতনভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সেটিকে বিজয়ী করে, তাহলে এবারের গণভোট হবে একটি ঐতিহাসিক বার্তা। আর ভুলক্রমে হারলেও এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকবে এবং যে কোনো দূরদর্শী নেতৃত্ব ভবিষ্যতে সংস্কারের দায়িত্ব নেবে।তবে দায়িত্বহীনতার দায় বর্তমান প্রজন্মের জনগণকেই বহন করতে হবে।

দুঃখের বিষয়, জুলাই বিপ্লবের তাৎপর্য, তরুণদেরসহ সাধারণ মানুষের বিদ্রোহ ও আত্মত্যাগ, হাসিনার বর্বরতা এবং তার সমর্থনে দেশি-বিদেশি দোসরদের ভূমিকা, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা ভেঙে জনতার বিজয়, এবং এর পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট ও দায়িত্ব—এই সবকিছু নিয়ে সুসংহত ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেই মানুষ কুতর্ক ও মিথ্যাচারে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

জুলাই সনদ কারা রচনা করেছেন, সেটাই মুখ্য বিষয় নয়। আসল কথা হলো—এটি একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জনতার ইচ্ছার প্রতিফলন এবং ভবিষ্যৎমুখী দলিল। বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম অবশ্যই তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে ও পরিবর্তন আনবে; তবে এই বদ্বীপের জনগণের আজকের সম্মিলিত বার্তা তাদের পথচলাকে সমৃদ্ধ করবে।

জনগণ যদি সচেতনভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সেটিকে বিজয়ী করে, তাহলে এবারের গণভোট হবে একটি ঐতিহাসিক বার্তা। আর ভুলক্রমে হারলেও এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা থাকবে এবং যে কোনো দূরদর্শী নেতৃত্ব ভবিষ্যতে সংস্কারের দায়িত্ব নেবে।তবে দায়িত্বহীনতার দায় বর্তমান প্রজন্মের জনগণকেই বহন করতে হবে।

ইউনূস সরকার এবং জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা রাজনৈতিক দলগুলো কেন সেই ঐতিহাসিক দায় নেবে না? একটি গণতান্ত্রিক, ভবিষ্যৎমুখী বাংলাদেশের প্রয়াস এবং অন্ধকার ফ্যাসিবাদী যুগে ফেরার আশঙ্কা—এই দুইয়ের মধ্যে জনগণকে উত্তমটিকে বেছে নিতে বলাই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালন।

  • খাজা মাঈন উদ্দিন সাংবাদিক।

* মতামত লেখকের নিজস্ব