বাংলাদেশে যখন বড় পরিসরে মুসলিম বিশ্ব নিয়ে কথা হয়, তুরস্কের নামটা সব সময় আলাদা করে উঠে আসে। তুরস্ক শুধুই আরেকটা ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ নয়; আমাদের ইতিহাসের বইপত্র, ধর্মীয় স্মৃতি, জনপ্রিয় সংস্কৃতি আর এখন ক্রমে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনার ভেতরও সেটি একধরনের ‘ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র’ হিসেবে থাকে। তাই সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতিতে তুরস্ককে যেভাবে টানা হচ্ছে, সেটি নিয়ে ঢাকা ও আঙ্কারা দুই পক্ষেরই একটু ভেবে দেখা দরকার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি মোড়। এই ভোটের মধ্য দিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার কথা।
মানুষ চায়, বিশ্বাসযোগ্য ভোটের মাধ্যমে একটি বৈধ সরকার। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এ নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েছে। ফলে মূল লড়াইটা দাঁড়িয়েছে—একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী জোট, যেখানে দু–একটি ইসলামি দলও আছে; অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও বিভিন্ন ইসলামি দল নিয়ে গড়া ইসলামি জোটের মধ্যে, যেখানে মধ্যপন্থী দলও আছে। ২০২৪ সালের শেষ আর ২০২৫ সালে করা বিভিন্ন জরিপের ইঙ্গিতও—সম্ভাব্য আসনে বিএনপি জোট এগিয়ে; কিন্তু ইসলামি শিবিরও ধারাবাহিকভাবে শক্তি বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি ৫৪ বছর ধরে মূলত তিনটি শিবিরকে ঘিরে ঘুরছে—বাঙালি জাতীয়তাবাদী শিবির, যার ঐতিহাসিক বাহক আওয়ামী লীগ; মধ্যপন্থী বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী শিবির, যার প্রতিনিধিত্ব করে বিএনপি; আর ইসলামপন্থী শিবির, যেখানে জামায়াত ও অন্য ইসলামি দলগুলো। মতাদর্শ, ইতিহাস আর জাতীয়তাবাদের ধরন, এসব ক্ষেত্রে পার্থক্য স্পষ্ট; কিন্তু একটি জায়গায় তিন শিবিরেরই অভ্যাস প্রায় এক—পররাষ্ট্র সম্পর্ককে ঘরোয়া রাজনীতির কাজে লাগানো।
বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রশ্নকে ব্যবহার করেছে নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখতে এবং সমালোচকদের কোণঠাসা করতে। অন্যদিকে ইসলামি দলগুলো ক্রমেই বেশি করে তুলে ধরছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথা, যেন বোঝানো যায় ‘ভ্রাতৃরাষ্ট্রগুলো’ তাদের পেছনে আছে। ফলে পররাষ্ট্রনীতি পরিণত হচ্ছে প্রচারের ভাষায়, পোস্টার-ব্যানারের স্লোগানে।
স্বল্প মেয়াদে এটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দিতে পারে। দলগুলো সহজেই সমর্থকদের বলতে পারে, ‘দেখুন, আমরা একা নই, আমাদের পাশে বড় বড় বন্ধুরাষ্ট্র আছে।’ কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এর বিপদ মারাত্মক। এতে একদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্ক জটিল হয়; অন্যদিকে সেই বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর নামও ধীরে ধীরে বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিতে তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্বাস্থ্যকর রূপরেখা খুব সহজ—এই সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হতে হবে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলীয় নেটওয়ার্কভিত্তিক নয়। এখন পর্যন্ত তুরস্ককে বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট দলের ‘ঘনিষ্ঠ মিত্র’ হিসেবে দেখা হয় না। এই ধারণা অক্ষুণ্ণ থাকাই বাঞ্ছনীয়।
ভারতের উদাহরণটা খুবই পরিষ্কার। দেশের ভেতর দলীয় প্রতীক হিসেবে ভারতের নামকে বারবার ব্যবহার করার ফলে সমাজের একটি বড় অংশে শক্ত ভারতবিরোধিতা মনোভাবও তৈরি হয়েছে। এখন বাণিজ্য, পানি ভাগাভাগি বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে সহযোগিতা করতে গেলেই সেই মনোভাব দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। আজকের আশঙ্কা, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল তুরস্কসহ অন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর নাম নিয়েও একই পথ ধরতে চাইবে কি না।
তুরস্কের অবস্থান কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মনে কোনো আঞ্চলিক ‘বড় ভাই’ রাষ্ট্রের মতো নয়। ভৌগোলিক দূরত্ব আছে, আবেগের দূরত্ব নেই। খেলাফত তুলে দেওয়ার প্রশ্নে যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অটোমান তুরস্ককে অপমান করছিল, তখনই বাংলার মুসলমানরা খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছিল। তারা তখন ব্রিটিশের প্রজা; কিন্তু হৃদয় ছিল ইস্তাম্বুলের পক্ষে।
তারও আগে শত শত বছর ধরে তুর্কি ও তুর্কিক বংশের সুফি সাধক, ব্যবসায়ী আর সেনারা হিন্দুকুশ পেরিয়ে উত্তর ভারত ঘুরে বাংলার বদ্বীপে এসে বসতি গড়েছেন। তাঁদের হাত ধরে গড়ে উঠেছে আমাদের অনেক ধর্মীয় অনুশীলন, খাবারের ধরন, এমনকি নৈতিক ভাষা আর কল্পনার জগৎ। আজকের বাংলাদেশে যেসব দরগাহকে ঘিরে মানুষ ভিড় করে, তাঁদের অনেকেরই তুরস্ক থেকে আসা।
সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের ইতিহাসভিত্তিক টিভি ধারাবাহিকগুলো বাংলাদেশি দর্শকের এক নতুন প্রজন্ম তৈরি করেছে। অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে এগুলো একধরনের সমন্বিত অভিজ্ঞতা—বিশ্বাস, ইতিহাস আর সমকালীন রাজনৈতিক কল্পনা একসঙ্গে চলে।
তুরস্ক এখানে একটি জীবন্ত গল্পের দেশ, যেটি তাদের নিজের অতীতবোধ আর মুসলিম পরিচয়ের মর্যাদাবোধের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে। মজার ব্যাপার হলো, এই ভালোবাসা দলীয় বিভাজনের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদী, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী, ইসলামপন্থী—প্রায় সবার মুখে তুরস্কের নাম সাধারণত সম্মান আর স্নেহের সুরেই শোনা যায়।
তুরস্কের সরকারি আচরণও এত দিন ছিল মূলত রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ফ্রেমে। বন্ধুসুলভ, গঠনমূলক, ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক—কিন্তু দলীয় রাজনীতির ভেতরে নাম টেনে আনা নয়। এই কাঠামো অটুট রাখা খুবই জরুরি। কারণ, একবার যদি কোনো দেশের নাম দলীয় রাজনীতির নিত্য ব্যবহৃত উপকরণে পরিণত হয়, তাহলে শুরুতে যে উষ্ণতা থাকে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিই সহজে ভুল–বোঝাবুঝি বা অস্বস্তিতে ঘুরে যেতে পারে।
বাংলাদেশ এখন নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে, তাই রাজনৈতিক মেরুকরণ আর উত্তেজনা বাড়বেই। এই সময়ে বিদেশি সম্পর্ক নিয়ে ইঙ্গিত, মন্তব্য, অভিযোগ ও প্রত্যাশা জন–আলোচনায় আসবেই। এতে স্বল্পমেয়াদে দলীয় উপকার হতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাড়া মিলতে পারে; কিন্তু যদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে দলীয় গল্পের ভেতর গুলিয়ে ফেলা হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সংবেদনশীলতা বাড়ে, বিশ্বাস কমে। তাই আঙ্কারা আর ঢাকার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো সহযোগিতাকে পরিষ্কারভাবে রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রের স্তরে ধরে রাখা, যেন তা ‘কোন দল কার বন্ধু’ এই লেন্স দিয়ে দেখার অভ্যাস না গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিতে তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্বাস্থ্যকর রূপরেখা খুব সহজ—এই সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হতে হবে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলীয় নেটওয়ার্কভিত্তিক নয়। এখন পর্যন্ত তুরস্ককে বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট দলের ‘ঘনিষ্ঠ মিত্র’ হিসেবে দেখা হয় না। এই ধারণা অক্ষুণ্ণ থাকাই বাঞ্ছনীয়।
সম্ভাবনার ক্ষেত্র কিন্তু অনেক বড়। কঠিন এক দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনৈতিক পরিবেশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ নিরাপত্তা আর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রগুলোকে বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ইতিমধ্যে নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ কেড়েছে। প্রতিরক্ষা ছাড়াও শিল্প বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ, বৃত্তি ও একাডেমিক বিনিময়—সবই বাস্তবসম্মত ক্ষেত্র।
মানুষে-মানুষে যোগাযোগও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর। তুরস্কে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা বাণিজ্য, পর্যটন আর সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সেতুবন্ধ হতে পারেন। তবে শর্ত হচ্ছে— বাংলাদেশি প্রবাসী কমিউনিটিকে যেন তুরস্কের মাটিতে বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির নতুন ফ্রন্ট বানানো না হয়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তুরস্ককে যেভাবে দেখে, সেটি এখনো বিস্তৃত, শক্তিশালী এবং দলনিরপেক্ষ এক ভালোবাসার জায়গা। এই চরিত্র নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখা সবারই স্বার্থে।
বাংলার যেসব ইতিহাসের পাতাকে আমরা ‘অত্যাচারী’ কিংবা ‘দমনমূলক’ অধ্যায় হিসেবে মনে রাখি, সেখানে তুরস্কের নাম নেই; বরং আমাদের স্মৃতিতে তুরস্ক বেশি দেখা দেয় সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়নের শিকার এক দেশ হিসেবে, আবার একই সঙ্গে মুসলিম প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে। ব্রিটিশ শাসনের প্রজা হয়েও বঙ্গীয় মুসলমানরা একসময় অটোমান খেলাফতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল—এই স্মৃতিটা আজও টিকে আছে।
এখন স্বাধীন বাংলাদেশ চায় এই আবেগঘন উত্তরাধিকারকে আধুনিক অংশীদারত্বে রূপ দিতে, যেখানে ভিত্তি হবে বাণিজ্য, প্রযুক্তি আর নিরাপত্তা সহযোগিতা; কোনো নির্বাচনী মঞ্চের স্লোগান নয়। এর জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের সংযমী রাখতে হবে, তুরস্কের নামকে যেন তারা ভবিষ্যতে প্রচারের পতাকা না বানায়।
আর তুরস্কসহ বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোকে বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতি আরও গভীর করতে হবে; কিন্তু সেটি যেন সব সময় সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে থাকে ঘরোয়া দলীয় সংঘাতে জড়িয়ে যাওয়া ছাড়াই। তাহলেই তুরস্ক-বাংলাদেশ সম্পর্ক আমাদের ইতিহাসের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্যও স্থিতিশীল এক সেতু হয়ে থাকতে পারবে।
আসিফ বিন আলী ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো। ই-মেইল: [email protected]
লেখাটির ইংরেজি সংস্করণ ‘আ শেয়ার্ড হিস্টরি, এ কমন ফিউচার’ শিরোনামে তুরস্কের থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠান টার্কি রিসার্চ ফাউন্ডেশন প্রকাশ করেছে।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
