সম্প্রতি দেশে অণুপুষ্টি সমৃদ্ধকৃত (অণুপুষ্টি ফর্টিফায়েড) চালের ব্যবহার বাণিজ্যিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে। অণুপুষ্টিসমৃদ্ধ পুষ্টি চালে সাধারণ চালের সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অণুপুষ্টি যেমন আয়রন, জিংক, ভিটামিন এ ইত্যাদি, চালের মতো দানার আকারে নির্দিষ্ট অনুপাতে মেশানো হয়। এই ফর্টিফায়েড চাল আমাদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যবহার করা হয়। নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর অণুপুষ্টির ঘাটতি বিবেচনায় এবং তাদের পুষ্টিঘন খাদ্য ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় এটি একটি গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ।

কিন্তু এই চাল বাণিজ্যিকভাবে সর্বসাধারণের মধ্যে উন্মুক্ত করার আগে বাংলাদেশের চালের পুষ্টিমান এবং অন্যান্য বিষয়সম্পর্কিত যেসব পরীক্ষা, নিরীক্ষা ও গবেষণা দরকার ছিল, তা কি করা হয়েছে? এখানে বিষয়টি জনস্বাস্থ্যপুষ্টি বিজ্ঞানের আলোকে দেখার সুযোগ আছে। কয়েকটা বিষয় বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল:
প্রথমত, বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে সারা বিশ্বে সাফল্যের একটি উদাহরণ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন পদকে ভূষিত হয়েছেন এবং সারা বিশ্বে বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা অতি উৎপাদনশীল বিভিন্ন জাত, যেমন বিআর-২৯, বিআর-২৮, বিআর-১১ উদ্ভাবন করেছেন, যা এ দেশের মানুষের ক্ষুধামুক্ত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশে এখন ৮০ শতাংশ চালই বিরি ধান, যা আকারে বড়, কিন্তু বাজারে প্রচুর সরু চাল পাওয়া যায় যা বিরি চালকে কেটে ছোট করে বা পলিশ করে ওপরের স্তরের অণুপুষ্টিসমৃদ্ধ অংশ বাদ দিয়ে বাজারজাত করা হয়। যার ফলে চালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অণুপুষ্টি কম পরিমাণে থাকে।

দ্বিতীয়ত, অণুপুষ্টি র অংশ ফেলে দেওয়া চালে আবার ছয়টি অণুপুষ্টি কৃত্রিমভাবে যুক্ত করে বেশি দামে বাজারজাত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে পুষ্টি চালের দাম বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে না।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে এই চালের কার্যকারিতার ওপর একটিমাত্র গবেষণা হয়েছে। গবেষণাটার উদ্দেশ্য ছিল পুষ্টিচাল দেশের দক্ষিণের কয়েকটি উপজেলায় ভিজিডি কার্যক্রমভুক্ত জনগোষ্ঠীর রক্তশূন্যতা ও জিংক অপুষ্টি কমানোতে কতটুকু কার্যকর, তা দেখা। তার আগে বলা প্রয়োজন, জনগোষ্ঠীতে রক্তশূন্যতা ও আয়রন স্ট্যাটাস বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়েই সন্তোষজনক মাত্রায় আছে (প্রথম, ২০১১-১২ ও দ্বিতীয় জাতীয় অণুপুষ্টি জরিপ, ২০২১-২০২২) ।

এখানে উল্লেখ্য যে আন্তর্জাতিক মানের বেশ কিছু গবেষণায় প্রমাণিত বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানিতে বিদ্যমান আয়রন (টিউবওয়েলের পানি থেকে প্রাপ্ত) জনগোষ্ঠীর আয়রনের অভাব দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দক্ষিণের উপজেলাগুলো যেখানে গবেষণাটি করা হয়েছে, সেখানে ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রনের মাত্রা মোটাদাগে কিছুটা কম। ফলে আয়রনের বিপাকীয় কারণে গবেষণাটিতে ফর্টিফায়েড চাল রক্তশূন্যতা কিছুটা কমাতে পেরেছিল, যদিও জিংক অপুষ্টি কমাতে পারেনি। আয়রনজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়নি।

কিন্তু দেশের অনেক অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রনের মাত্রা বেশি এবং এসব অঞ্চলে জনগোষ্ঠীতে আয়রনের ঘাটতি অনেক কম মাত্রায় আছে। আয়রন ফর্টিফিকেশনের বিষয়টি এমন যে, দেহে আয়রনের মাত্রা পর্যাপ্ত অবস্থায় যদি সাপ্লিমেন্ট বা ফর্টিফিকেশন হিসেবে আরও আয়রন খাওয়ানো হয়, তবে তা আন্ত্রিক ব্যাকটেরিয়াগুলোয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আয়রনজনিত বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যেমন স্বল্প মেয়াদে ডায়রিয়া, বমিভাব ইত্যাদি।

দীর্ঘ মেয়াদে আন্ত্রিক ব্যাকটেরিয়াগুলোয় আয়রনের আধিক্যজনিত প্রতিক্রিয়ায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ ইত্যাদি বিপাকীয় সমস্যা থেকে সৃষ্ট হতে পারে অসংক্রামক রোগ, যা আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের নতুন নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাই পুষ্টিচাল বৃহৎ আকারে উন্মুক্ত করার আগে যেসব অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রনের মাত্রা বেশি, সে রকম একটা অঞ্চলে গবেষণাটির পুনরাবৃত্তি করা উচিত ছিল, একই রকম না ভিন্ন রকম ফলাফল হয় কি না, তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দরকার ছিল। সেটা করলে আরও পূর্ণাঙ্গ এবং জনপ্রতিনিধিত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পুষ্টিচাল উন্মুক্তকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত, যা জনসাধারণের পুষ্টি অবস্থার উন্নয়নের ফলে সুস্থ-সবল জনশক্তি সৃষ্টিতে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরও সহায়ক ভূমিকা রাখতে।

আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুষ্টিচালের একটি অন্যতম অণুপুষ্টি হলো ভিটামিন এ। ফুড ফর্টিফিকেশনের নীতিমালা অনুযায়ী যখন ভোজ্যতেলে সর্বজনীন ভিটামিন এ ফর্টিফিকেশন প্রচলিত আছে সেখানে চালের মতো প্রধান খাদ্য সর্বসাধারণের জন্য ফর্টিফিকেশন করার আগে বিশেষজ্ঞ মতামতসহ বিস্তারিত গবেষণার মাধ্যমে এটার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব নেই, সে রকম বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দরকার ছিল। কারণ, ভিটামিন এ-যুক্ত ভাত এবং তেল প্রতিদিন খেলে চর্বিতে দ্রবণীয় এই ভিটামিনটি কত সময়ে দেহে জমা হয়ে ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, তার তথ্য ছাড়া এ সিদ্ধান্ত জাতির জন্য নতুন জনস্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করার আশঙ্খা থাকে।
সদ্য উপস্থাপিত দ্বিতীয় জাতীয় অণুপুষ্টি জরিপের (২০২১-২০২২) ফলাফল অনুসারে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ভিটামিন এ ঘাটতির মাত্রা মাত্র ৭.২ শতাংশ। ধারণা করা যায়, এক দশক ধরে ভোজ্যতেলের ভিটামিন এ ফর্টিফিকেশনের জাতীয় প্রোগ্রাম এই অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

ভিটামিন এর মাত্রা রক্তে বাড়তে থাকলে তা দেহে জমা হয়ে ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। ভিটামিন এর প্রয়োজনীয় মাত্রা আর ক্ষতিকর মাত্রার মধ্যে পার্থক্য শিশুদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম। বাংলাদেশে শিশুরা ইতিমধ্যেই দুটি জাতীয় প্রোগ্রামের আওতার মধ্যে আছে—ভিটামিন এ ক্যাপসুল আর ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ ফর্টিফিকেশন। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য এবং সবচেয়ে বেশি পরিমাণে খাওয়া হয়। আমাদের জনগোষ্ঠী, বিশেষত শিশুরা পুষ্টিচালের মাধ্যমে তৃতীয় আরেকটি পুষ্টি কার্যক্রমের আওতায় এলে দেহে ভিটামিন এ অতিরিক্ত হয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাতে পারে।

জনস্বাস্থ্যপুষ্টি কার্যক্রমের আওতায় একটি দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী আসতে পারে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের ওপর নতুন কোনো পুষ্টি কার্যক্রমের সুফল বা কুফল না জেনে তা কার্যকর করা নৈতিকতার মতো একটা সুবিশাল বিবেচনার বিষয় থেকে যায়

ইতিমধ্যে আফ্রিকার কিছু দেশে একই অভিজ্ঞতার প্রমাণ আছে। বিভিন্ন পুষ্টি কার্যক্রমের অসমন্বিত বাস্তবায়নে জনগোষ্ঠীর বিশেষত শিশুদের দেহে ভিটামিন এর মাত্রা অতিরিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুপারিশ করা হয়েছে ভিটামিন এর বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে গুরুত্ব যাচাই করে অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের আওতা কমিয়ে আনা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্যপুষ্টি কার্যক্রমের আওতায় একটি দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী আসতে পারে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের ওপর নতুন কোনো পুষ্টি কার্যক্রমের সুফল বা কুফল না জেনে তা কার্যকর করা নৈতিকতার মতো একটা সুবিশাল বিবেচনার বিষয় থেকে যায়। পুষ্টি কার্যক্রম যদি বৈজ্ঞানিক, টেকনিক্যাল, বায়োলজিক্যাল বিবেচনায় সুফলতা বয়ে নিয়ে না আসে, তা প্রোগ্রামের দক্ষতা (efficiency) কমিয়ে দিতে পারে। তাই নতুন পুষ্টি কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত জাতীয় পরিপ্রেক্ষিতে পর্যাপ্ত গবেষণা ও নিরীক্ষা সম্পূর্ণ করে এবং যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।

জনস্বাস্থ্যপুষ্টির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সুশাসন সমুন্নত রাখার জন্য নিচের সুপারিশগুলো অত্যন্ত জরুরি এবং নীতিনির্ধারকদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন:


১. একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সম্পূর্ণ স্বাধীন জাতীয় টেকনিক্যাল অডিট কমিটি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কমিটির কাজ হবে নতুন পুষ্টি কার্যক্রমের আগে যথাযথ স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিতের গবেষণা, নিরীক্ষা ও পুষ্টিবিজ্ঞানের হালনাগাদ অগ্রগতির আলোকে মূল্যায়ন নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান।


২. চলমান পুষ্টি কার্যক্রমগুলোর প্রযুক্তিগত বা টেকনিক্যাল সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য সময়মতো প্রয়োজনীয় গবেষণা, নিরীক্ষা ও মূল্যায়নের আয়োজন করা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশগুলো বিবেচনায় নেওয়া ।

৩. জনস্বাস্থ্যপুষ্টি কার্যক্রমে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে পুষ্টিবিজ্ঞান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম উৎসাহিত করা।


  • ড. সবুক্তগীন রহমান, নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
    ড. নাজমা শাহীন, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়