গরিবের লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ হলে যা হয়

চিলমারী রমনা রেলপথছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশের গরিবতম জেলা কুড়িগ্রাম। একসময় সেখানে চারটি ট্রেন চলত—ভোর ৪টায়, সকাল ১০টায়, বেলা ১টায় এবং রাত ১০টায়। সকাল ও রাতের ট্রেন রমনা থেকে লালমনিরহাট, ভোরের ট্রেনটি পার্বতীপুর হয়ে চিলাহাটি পর্যন্ত এবং দুপুরের ট্রেনটি সান্তাহার পর্যন্ত চলত। এখন সব বন্ধ। এরই মধ্যে একটি ট্রেন ফেরি-সংযোগে বাহাদুরাবাদের সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

চিলমারী বন্দর যে গৌরবের অধিকারী ছিল, তার সঙ্গেও ট্রেনের সম্পর্ক ছিল। কুড়িগ্রাম জেলা যে দারিদ্র্যের শীর্ষে চলে গেল, তার সঙ্গে এই চারটি লোকাল ট্রেন উঠিয়ে নেওয়ার সম্পর্ক আছে।

এরশাদ সরকারের পতনের পরও ট্রেন চারখানা চলেছে। ট্রেন চলেছে পুরান কুড়িগ্রাম পর্যন্তও। তারপর স্থানীয় নেতাদের দাবিতেই রেললাইন তুলে ফেলা হলো। এখন সেই রেললাইনের জায়গা কাদের দখলে, তা বের করলেই বের হবে এতে কার লাভ। এভাবেই কুড়িগ্রাম জেলার পুরান কুড়িগ্রাম, টগরাইহাট ও বালাবাড়িহাট স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। আর যাত্রাপুর থেকে সোনাহাট স্থলবন্দর পর্যন্ত রেলপথ উঠে গেছে তো সেই কবে। মালবাহী ট্রেনের লাইন তুলে ফেলা হলো, রেলভিত্তিক গোডাউনগুলো অকেজো হয়ে গেল। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত বাংলায় ভ্রমণ বইটি পড়লে জানা যায় কোন স্টেশন কোন পণ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল।

আরও পড়ুন

আগে যেখানে ৪০ টাকায় পার্বতীপুর, সান্তাহার যাওয়া যেত, সেখানে ট্রেন না থাকায় এখন লাগছে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। ট্রেনে যত কম খরচে যত পণ্য বহন করা যায়, ট্রাকে তা সম্ভব নয়। ট্রেনে একজন কৃষক ৫ কেজি আদা, শর্ষে বা বাদাম; একজন কুমার মাটির কয়েকটি পাত্র, একজন কারিগর ৫টি শীতলপাটি বা ৫০টি চাটাই নিয়ে সহজেই রংপুর শহরে গিয়ে বিক্রি করতে পারবেন; ট্রাকে তা সম্ভব নয়। কারণ, ট্রাকভাড়ার যে খরচ এবং পণ্যের যে পরিমাণ, তাতে কারোরই পোষায় না।

লোকাল ট্রেনগুলো কবে চালু হবে, জানতে চাইলে রেলের ডিজি ও সচিবের একই উত্তর—লোকোমোটিভ ও লোকোমাস্টারের সংকট। এটা কাটলেই চালু হবে। ৪০ বছর কেটে গেল; কেউ কথা রাখল না।

তখন মাঝখানে এসে দাঁড়ান একজন ফড়িয়া। কিংবা ট্রাক ব্যবসায়ীরাই একজনকে দালাল হিসেবে নিয়োগ দেন, যিনি খুচরা পণ্যগুলো কম দামে কিনে ট্রাক ভাড়া করে অথবা মালিকের ট্রাকে রংপুর, পার্বতীপুর ও সান্তাহারে নিয়ে যেতে পারেন। ট্রেনের বদলে ট্রাক এসে মধ্যস্বত্বভোগীর বাহাদুরি ব্যাপক বাড়িয়ে দিল। কৃষিকাজ আর লাভজনক থাকল না। কৃষকেরা শ্রমিকে রূপান্তরিত হয়ে চলে গেলেন ঢাকা, চট্টগ্রামে। অনাবাদি রইল উর্বর চরাঞ্চল। এখন শহরের চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা গিয়ে চরের জমি লিজ নিয়ে চাষ করছেন। বৈষম্য আর গরিবানার গল্পের রহস্য এখানেই।

আরও পড়ুন

অতীতের এই চারটি ট্রেনে যাত্রী গিজগিজ করত। স্টেশনে স্টেশনে থাকা কোয়ার্টারগুলো তারই স্মারক। স্টেশনগুলোতে সারাক্ষণই হুল্লোড় লেগে থাকত। এমনকি গল্প-উপন্যাস ও পত্রিকার দোকানও থাকত। সেই স্টেশনগুলো হয়ে গেল ভূতের ময়দান।

লোকাল ট্রেনগুলো যখন ছিল, তখন আমার বাবার মতো প্রায় সব চাকরিজীবী পরিবারের পুরুষেরা পরিবারকে গ্রামে রেখে চিলমারী থেকে ডোমার হাসপাতালে চাকরি করতে যেতেন। ভোরের ট্রেনে কর্মস্থলে যেতেন, বিকেলের ট্রেনে ফিরতেন। এতে যেমন বাসাভাড়া বাঁচত, তেমনি বাবা-মা, চাচা-জ্যাঠার নিরাপদ পরিবেশে স্ত্রী-পুত্রকে রেখে ঘর-গৃহস্থালি করে উন্নত জীবন যাপন করা যেত।

রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির আন্দোলনের কারণে চালু হলো কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। এটির ঘোষিত যাত্রাস্টেশন চিলমারীর রমনা রেলস্টেশন। কিন্তু আন্তনগর ট্রেনটি চলছে কুড়িগ্রাম থেকে। সে কারণে কুড়িগ্রাম-চিলমারী রেললাইন প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও চার-পাঁচ বছর ধরে কচ্ছপগতিতে কুড়িগ্রাম থেকে চিলমারী পর্যন্ত সংস্কারের কাজ চলছে। এখনো বাকি আছে উলিপুর থেকে চিলমারী পর্যন্ত কাজ।

চলমান কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসেও গরিবদের জন্য সুলভ বগি রইল না। অন্যদিকে হাসিনা সরকারের আমলে দূরত্বভিত্তিক রেয়াত তুলে দেওয়া হলো। ভাড়া বাড়ল ৩০-৪০ শতাংশ। রইল না মালবাহী বগিও।

লোকাল ট্রেনগুলো কবে চালু হবে, জানতে চাইলে রেলের ডিজি ও সচিবের একই উত্তর—লোকোমোটিভ ও লোকোমাস্টারের সংকট। এটা কাটলেই চালু হবে। ৪০ বছর কেটে গেল; কেউ কথা রাখল না। একটি গণ-অভ্যুত্থান হলো, আমরা আশা দেখেছিলাম। অন্তর্বর্তী সরকার গেল, এখন বিএনপি সরকারও এল; সেই আশা পূরণ কবে হবে বা আদৌ হবে কি না, জানি না।