নতুন মেডিক্যাল কলেজ: সমস্যার সমাধান, নাকি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি

সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধফাইল ছবি

বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রায় ১২ হাজার আসন রয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী এমবিবিএস পাস করে বের হচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, এই বিশাল সংখ্যক চিকিৎসককে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত বা ‘অ্যাবজর্ব’ করার জায়গা কোথায়?

বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণ বিসিএস সম্পন্ন হতে আড়াই থেকে তিন বছর এবং একটি বিশেষ বিসিএস সম্পন্ন হতে প্রায় দেড় বছর লেগে যায়। প্রতি তিন বছরের ব্যবধানে যদি ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে ওই একই সময়ে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত প্রায় ৩০ হাজার চিকিৎসকের মধ্যে ২৫ হাজার জনই সরকারি কাঠামোর বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

দেশের সিংহভাগ বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক গড়ে উঠেছে মূলত চারটি অপারেশনকে কেন্দ্র করে: সিজারিয়ান সেকশন, গল ব্লাডার, হার্নিয়া ও অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশন। এই ছোট ও মাঝারি মানের হাসপাতালগুলো মূলত সরকারি খাতের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেখানে নতুন পাস করা এমবিবিএস চিকিৎসকদের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত।

আরও পড়ুন

চাকরির বাজারে চাহিদা ও জোগানের এই চরম ভারসাম্যের অভাব চিকিৎসকদের পারিশ্রমিককে এক অবিশ্বাস্য তলানিতে নামিয়ে এনেছে। উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির সুবিধার্থে অনেক তরুণ চিকিৎসক রাজধানী বা বড় শহরের বেসরকারি হাসপাতালে অন-কল বা চুক্তিভিত্তিক ডিউটি করেন, যা চিকিৎসা মহলে ‘খ্যাপ’ নামে পরিচিত। এখানে একজন এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসককে টানা ২৪ ঘণ্টা ইমার্জেন্সি ও ইনডোরের রোগীদের দেখভালের জন্য মাত্র ২ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।

আমাদের দেশে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি বড় ভূমিকা থাকে। প্রত্যেকেই নিজ এলাকায় একটি মেডিক্যাল কলেজ চান এই ভেবে যে এতে এলাকার মানুষ উন্নত চিকিৎসা পাবেন। কিন্তু এই ধারণার ভেতরেই রয়েছে বড় গলদ।

মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েটরা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের মতো নন। একজন মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর সামান্যতম শিক্ষাঘাটতি সরাসরি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। অথচ দেশের নতুন ও বেশ কিছু পুরোনো মেডিক্যাল কলেজের ভেতরের চিত্র অত্যন্ত করুণ। অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, মাইক্রোবায়োলজি বা ফার্মাকোলজির মতো বেসিক ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। 

মেডিক্যাল কলেজ মূলত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এটি মূলধারার সেবাকেন্দ্র নয়। সাধারণত মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতাল নির্ধারিত থাকে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষাদানের জন্য, যেখানে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ছাত্রের বিপরীতে সুনির্দিষ্ট সংখ্যক বেড (যেমন: ১০০ জন ছাত্রের জন্য ৫০০ বেড) ও নির্বাচিত রোগী থাকতে হয়। অথচ আমরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে মূল সেবাকেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছি। এর ফলে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলো তাদের গুরুত্ব ও ফোকাস হারিয়েছে।

যদি উদ্দেশ্য হয় এলাকার মানুষকে সেবা দেওয়া, তবে জেলা হাসপাতালকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বেডে উন্নীত করে ফাংশনাল করাই সবচেয়ে যৌক্তিক ও দ্রুততম সমাধান। নতুন একটি মেডিক্যাল কলেজকে পুরোপুরি সচল করতে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়, যা অনেক সময় উদ্যোগ গ্রহণকারী ব্যক্তির মেয়াদকাল বা জীবদ্দশাতেও শেষ হয় না।

মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েটরা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের মতো নন। একজন মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর সামান্যতম শিক্ষাঘাটতি সরাসরি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। অথচ দেশের নতুন ও বেশ কিছু পুরোনো মেডিক্যাল কলেজের ভেতরের চিত্র অত্যন্ত করুণ। অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, মাইক্রোবায়োলজি বা ফার্মাকোলজির মতো বেসিক ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। 

রাঙামাটি মেডিকেলে কলেজের অস্থায়ী ক্যাম্পাস
প্রথম আলো

মাগুরা, নওগাঁ, নেত্রকোনা বা রাঙামাটির মতো ৮-১০টি মেডিক্যাল কলেজের নিজস্ব ক্যাম্পাস বা হসপিটাল ভবন পর্যন্ত নেই। রাঙামাটির শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিক্যাল ও ট্রেনিংয়ের জন্য চট্টগ্রামে আসতে হচ্ছে। সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। কারণ, ভবন হলেও হাসপাতাল চালু হয়নি। মেধাবী শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও প্রয়োজনীয় শিক্ষক, হোস্টেল, ল্যাব বা একাডেমিক পরিবেশ পাচ্ছেন না। এই তীব্র ঘাটতি নিয়েই তাঁরা পাস করছেন এবং বিএমডিসি থেকে লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছেন।

এখানে একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন দেখা দেয়। এই অপ্রস্তুত ও লার্নিং ঘাটতি থাকা চিকিৎসকদের কাদের চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হচ্ছে? নিশ্চিতভাবেই দেশের সাধারণ মানুষের জন্য। কারণ, যাঁরা এসব কলেজের অনুমোদন দিচ্ছেন বা দেশের নীতিনির্ধারক, তাঁদের পরিবারের সামান্যতম অসুখ হলেও তাঁরা উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা দেশের নামী করপোরেট হাসপাতালে চলে যান।

আরও পড়ুন

এই আত্মঘাতী ভুলের বৃত্ত থেকে বের হতে হলে সরকারকে অবিলম্বে কতগুলো কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, যেসব মেডিক্যাল কলেজের নিজস্ব ক্যাম্পাস, একাডেমিক ভবন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষক ও শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নেই, সেগুলোতে অবিলম্বে নতুন ছাত্র ভর্তি বন্ধ রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো ও শিক্ষকহীন প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি মানসম্পন্ন ও সক্ষমতাসম্পন্ন মেডিক্যাল কলেজে (যেমন: মাগুরা থেকে যশোর, নওগাঁ থেকে রাজশাহী ও নেত্রকোনা থেকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ) স্থানান্তর করে তাঁদের শিক্ষাজীবন সুরক্ষিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, নতুন মেডিক্যাল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হলেও, ডিপিপি তৈরি করে শতভাগ ভৌত অবকাঠামো, আধুনিক ল্যাব এবং শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন করার আগে কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করা যাবে না।

বর্তমানে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক নিয়োগ মূলত সিভিল সার্ভিসের মেডিক্যাল ক্যাডারের ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসকেরা প্রথমে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তী সময়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইচ্ছার ভিত্তিতে মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এর ফলে ক্লিনিক্যাল বিষয়ে তুলনামূলকভাবে শিক্ষক পাওয়া গেলেও বেসিক ও প্যারা ক্লিনিক্যাল বিষয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মেডিক্যাল কলেজের জন্য পৃথক শিক্ষক নিয়োগকাঠামো প্রবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি।

  • ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়