একটা মাস বদলে দিয়েছে ভবিষ্যতের অনেক সমীকরণ

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বছরের শেষ এই মাসটি যেন নতুন বছরে রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সূচনাবিন্দু হয়ে উঠেছে। মাত্র একটি মাসের মধ্যেই দেশের মানুষ একদিকে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর গভীর শঙ্কার মুখোমুখি হয়েছে, অন্যদিকে আবার গণতন্ত্রের প্রশ্নে নিজেদের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক রুচির স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

ওসমান হাদির জানাজায় মানুষের উপস্থিতি ছিল সেই আস্থা ও ভালোবাসারই প্রতিফলন। দেশের মানুষ যেন নীরবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা কেমন ধরনের প্রতিনিধি চায় এবং কোন রাজনীতি তারা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

এই আবহের মধ্যেই দেশে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী তিনিই দলের চেয়ারম্যান। তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য নিছক একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার ভেতর থেকে মানুষ আবার রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ও প্রত্যাশা ফিরে পাওয়ার সাহস খুঁজে পেয়েছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর তিন দিনের জনসংযোগ কর্মসূচিকে ঘিরে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন ছিল। তাঁর সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, সেগুলো তিনি ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে সামাল দিয়েছেন। এই সময়েই দেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণ রাজনীতিতে একদিকে প্রবল আবেগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে বিএনপির রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

দেশের রাজনীতিতে বহুবার দেখা গেছে, যখন কোনো রাজনীতিবিদ জনগণের আবেগকে সঠিকভাবে ধারণ করে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তখন সেটি জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই মুহূর্তে দেশের মানুষ আবার রাজনীতির দিকে আশা নিয়ে তাকাচ্ছে। তবে এই আশা কেবল জনপ্রতিনিধি পরিবর্তনের নয়। এই আশা মূলত প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের। মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া পুরোনো অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা দূর করা সম্ভব নয়।

এই সংকট সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যেই স্পষ্ট। গত বছর ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে সন্ত্রাসীর গুলিতে গুরুতর আহত হন ঢাকা–৮ আসনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে চাওয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি। তাঁর মৃত্যুর পর রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়।

এমন একটি অস্থির সময়ে বিএনপির রাজনীতি নিয়ে মানুষ যখন কিছুটা হতাশ ছিল, ঠিক তখনই দেশে ফিরলেন তারেক রহমান। দেশে ফিরে তিনি তিন দিনব্যাপী জনসংযোগ করেন। তাঁর চারপাশে নেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। রাজনৈতিক অবস্থান ও সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে এমন নিরাপত্তা তাঁর প্রাপ্যও ছিল।

তারেক রহমানের সামনে বড় প্রশ্ন ছিল, এই নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভেতর থেকেও তিনি জনমত গঠন করতে পারবেন কি না। শেষ পর্যন্ত তিনি সেটি পেরেছেন। ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে কর্মসূচি পালন করে তিনি বিএনপির রাজনীতিতেও একটি পরিবর্তনের সূচনা করেছেন। দলটি এখন সাংগঠনিকভাবে পরিকল্পনার দিকে এগোতে শুরু করেছে। অতীতে মনে হতো, দলটি সংগঠিত হলেও কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থবির ছিল। মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে যেন তারা অপেক্ষার মধ্যে ছিল। তারেক রহমানের দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের চোখে এই পরিবর্তন অনেকটাই রূপকথার মতো মনে হতে পারে।

এই মুহূর্তে দেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বহু সমীকরণ বদলে গেছে। খালেদা জিয়া জীবদ্দশায় দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রতীক ছিলেন। মৃত্যুর পরও সেই আবেগ তিনি রেখে গেছেন। এই আবেগ বিএনপির জন্য বড় সহায়ক শক্তি হয়ে উঠেছে। তারেক রহমান সেটিকে সাংগঠনিক দক্ষতায় জনমত গঠনের দিকে কাজে লাগাচ্ছেন। ফলে নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে দলের ভেতরে।

ডিসেম্বর মাসেই আমরা দেখেছি, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর গঠিত তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট গঠন। সংস্কারের প্রশ্নে এনসিপি জামায়াতকেই ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বেছে নিয়েছে। একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বহুদলীয় জোট। এই বাস্তবতায় স্পষ্ট যে দেশে নির্বাচনী রাজনীতির হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এই দুটি জোটের রাজনৈতিক কার্যক্রমই ভবিষ্যৎ সংসদীয় কাঠামো নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক আবেগ দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এই হিসেবে বিএনপি আপাতত এগিয়ে আছে। অনেকের ধারণা, ভোটাররা কেবল ব্যালটের প্রতীক দেখেই ভোট দেন। কিন্তু রাজনীতি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াও বটে। রাজধানী ও বড় শহরের ভোটারদের আচরণ প্রান্তিক এলাকার ভোটারদের থেকে ভিন্ন। প্রান্তিক ভোটারদের কাছে মৌলিক চাহিদা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নগর জীবনে মানুষের প্রধান চাহিদা নিরাপত্তা। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরের ভোটাররা সর্বাগ্রে নিরাপত্তা চায়।

আরও পড়ুন

এই কারণেই স্থানীয় সরকার প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকার কাঠামো প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দৃশ্যমান সংস্কার কার্যক্রম নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এর ফলে জাতীয় রাজনীতি নিয়ে মানুষের মধ্যে দ্বিধা ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে শক্তিশালী করা গেলে জাতীয় রাজনীতিও শক্ত ভিত্তি পায়। স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদাগুলোই সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে। একজন সংসদ সদস্য যখন স্থানীয় সমস্যার বাস্তব সমাধান করতে পারেন, তখন তিনি জাতীয় পর্যায়েও জনকল্যাণমূলক বাজেট আদায়ের নৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নাগরিক আবেগের এই সমন্বয়ই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন এই বিষয়টি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেনি।

আমরা দেখছি, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের পর দলটির অনেক নেতা পদত্যাগ করেছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এটিকে নির্বাচনকালীন সমঝোতা হিসেবে দেখলেও সেই বার্তা তৃণমূল পর্যন্ত কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জামায়াত মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে এবং একটি স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একাডেমিক পরিভাষায় ট্রানজিশনাল পলিটিকস বলা যায়। এই রূপান্তরের সময় আশা ও উদ্বেগ পাশাপাশি থাকে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কার্যকর রূপ নেয়।

এই প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটারদের এমন একটি পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তাঁরা নিরাপত্তা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জবাবদিহিমূলক ও সংস্কারভিত্তিক রাজনীতির কাঠামো তৈরি করাও জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে যে সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করেছে, সেগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নের দায় ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর নিশ্চিত করার পথনকশা এখনই তৈরি করতে হবে।

এই মুহূর্তে দেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বহু সমীকরণ বদলে গেছে। খালেদা জিয়া জীবদ্দশায় দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রতীক ছিলেন। মৃত্যুর পরও সেই আবেগ তিনি রেখে গেছেন। এই আবেগ বিএনপির জন্য বড় সহায়ক শক্তি হয়ে উঠেছে। তারেক রহমান সেটিকে সাংগঠনিক দক্ষতায় জনমত গঠনের দিকে কাজে লাগাচ্ছেন। ফলে নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে দলের ভেতরে।

তবে আত্মবিশ্বাস যেন জনভোগান্তি বা উদ্বেগের কারণ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। তারেক রহমানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে খালেদা জিয়ার শূন্যতায় নিজেকে নতুন রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, অন্যদিকে জিয়াউর রহমানের মতো বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠন করা। রাজনৈতিক আবেগ ও কাঠামোগত সংস্কারের এই সমন্বয়ই পারে দেশকে আরও পরিশীলিত গণতান্ত্রিক চর্চার দিকে এগিয়ে নিতে। এই কাজে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ইতিবাচক ভূমিকা অপরিহার্য। সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।

  • ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ স্থানীয় সরকার ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

*মতামত লেখকের নিজস্ব