দিনটি ছিল ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুর। দেবীদ্বারের ফুলতলী গ্রামে অন্য দিনের মতোই বাড়ির পাশে খেলছিল ছোট্ট শিশু আহমেদ। পৃথিবীকে তখনো ঠিকমতো চিনে ওঠার বয়স হয়নি তার। হাঁটতে শেখার আনন্দ, চারপাশের নতুন জিনিস দেখার কৌতূহল আর নিজের মতো করে ছুটে বেড়ানো—এটাই ছিল তার পৃথিবী।
বাড়ির কাছেই ছিল পুকুর। পুকুরটি পরিবারের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতিদিনের জীবনেরই অংশ। আর সেই পরিচিত পানির পাশেই খেলছিল আহমেদ। মা নিপা আক্তারও ছিলেন কাছাকাছি। দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে সন্তানের দিকে নজর ছিল তাঁর। কিন্তু মানুষের জীবন তো সব সময় একই মুহূর্তে আটকে থাকে না। মাত্র এক মিনিটের জন্য তাঁর চোখের আড়াল হয়েছিল ছেলে।
প্রথমে নিপা ভেবেছিলেন, খেলতে খেলতে ছেলে একটু দূরে গেছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর মনে ভয় ঢুকে পড়ে। চারদিকে খুঁজতে শুরু করেন তিনি। এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ান। পুকুরের পাশেও দু-তিনবার খোঁজা হয়। কিন্তু আহমেদের কোনো সাড়া নেই। বাবাও কিছুক্ষণের মধ্যে ছুটে আসেন। শুরু হয় দুজনের মরিয়া খোঁজ। শুধু তাঁরাই নন, বাড়ির সবাই তখন আহমেদকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন। এরই মধ্যে পুকুরের পানিতে ভেসে ওঠে আহমেদের মরদেহ। মুহূর্তেই চারপাশে হইচই ও মায়ের আর্তনাদ শুরু হয়।
নিপা পরে বলেছেন, তিনি কিছু সময়ের জন্যই ছেলেকে চোখের আড়াল করেছিলেন। সময়টা এক মিনিটের বেশি হবে না। সময় মাপার ঘড়িতে এক মিনিট খুব বেশি কিছু নয়। কিন্তু একটি শিশুর জীবনে কখনো কখনো এক মিনিটই হয়ে উঠতে পারে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। আহমেদের ঘটনা শেষ পর্যন্ত কীভাবে গড়িয়েছে তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এমন ঘটনা সমাজে কেন বারবার ঘটছে? কারণ, আহমেদের গল্পটি একা কোনো গল্প নয়। বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের গল্পের সঙ্গে এর মিল আছে।
বাংলাদেশ নদী, খাল, বিল ও পুকুরের দেশ। গ্রামের অনেক বাড়ির পাশেই রয়েছে পুকুর। কোথাও বাড়ির উঠান থেকে কয়েক পা গেলেই পানি, কোথাও ঘরের কাছেই খাল বা ডোবা। এই পানিই যেমন মানুষের জীবন ও জীবিকার অংশ, তেমনি ছোট শিশুদের জন্য তৈরি করে বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ, এই বয়সে শিশুরা মাত্রই হাঁটতে ও দৌড়াতে শেখে, কিন্তু বিপদ সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকে না। তারা পানির গভীরতা বোঝে না, সাঁতার জানে না, আবার বিপদে পড়লে সাহায্যের জন্য কার্যকরভাবে ডাকতেও পারে না।
বিপদ অনেক সময় আমাদের চোখের সামনেই থাকে। আমরা তাকে বিপদ হিসেবে দেখি না, কারণ সেটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। শিশুকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখা সহজ নয়। বিশেষ করে পরিবারের কাজ, জীবিকা, রান্না, ঘরের দায়িত্ব—সবকিছু সামলাতে গিয়ে একজন অভিভাবকের পক্ষে প্রতিটি মুহূর্ত শিশুর পাশে থাকা কঠিন। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশকে নিরাপদ করা সম্ভব।
ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২২ সালে জানিয়েছিল, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ হাজারের বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পানিতে ডুবে মৃত্যু দেশের অন্যতম প্রধান মৃত্যুর কারণ। ইউনিসেফ এটিকে এই বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৪০টি শিশুর জীবন থেমে যায় পানিতে।
প্রথম আলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনেও একই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় পরিচালিত জাতীয় জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর সব বয়সী প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। তাদের মধ্যে আনুমানিক ১৪ হাজার ৫০০ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে বছরে প্রায় ১০ হাজারের মৃত্যু পানিতে ডুবে ঘটে। সংখ্যাগুলো শুধু সংখ্যা নয়। ১৪ হাজার মানে ১৪ হাজারটা পরিবার। ১৪ হাজার মায়ের বুক খালি হওয়া। ১৪ হাজার বাবার স্বপ্ন থেমে যাওয়া। ১৪ হাজার শিশুর অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিপদ সব সময় দূরের নদী বা গভীর জলাশয়ে থাকে না। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ৮০ শতাংশই পুকুরে ঘটে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটনা বাড়ি থেকে ২০ গজের মধ্যে ঘটে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৬০ শতাংশ মৃত্যু সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে ঘটে, যে সময় অনেক মা-বাবা ঘরের কাজ বা জীবিকার কাজে ব্যস্ত থাকেন।
আহমেদের ঘটনাটি তাই এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে ভয়ংকরভাবে মিলে যায়। পুকুরটি দূরে ছিল না। শিশুটি অপরিচিত জায়গায় ছিল না। মা–ও খুব দূরে ছিলেন না। তবু মাত্র এক মিনিটের আড়াল তৈরি করেছিল বিপদ। এখানেই পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতাটি লুকিয়ে আছে।
বিপদ অনেক সময় আমাদের চোখের সামনেই থাকে। আমরা তাকে বিপদ হিসেবে দেখি না, কারণ সেটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। শিশুকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখা সহজ নয়। বিশেষ করে পরিবারের কাজ, জীবিকা, রান্না, ঘরের দায়িত্ব—সবকিছু সামলাতে গিয়ে একজন অভিভাবকের পক্ষে প্রতিটি মুহূর্ত শিশুর পাশে থাকা কঠিন। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশকে নিরাপদ করা সম্ভব।
ইউনিসেফ বলছে, শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে পরিবার ও সম্প্রদায়ের সচেতনতা, শিশুদের সাঁতার ও পানিতে নিরাপত্তার দক্ষতা, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নিরাপদ শিশুযত্ন এবং জাতীয় পর্যায়ে বিনিয়োগ ও নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সমাধান শুধু মা-বাবাকে আরও সতর্ক হতে হবে, এমনটি নয়। পুকুরের চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকতে পারে। ছোট শিশুদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক দিবাযত্নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বয়স উপযোগী সময়ে সাঁতার শেখানো যেতে পারে। গ্রাম বা মহল্লাভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিশুদের খেলার জায়গা ও পানির জায়গাকে আলাদা করার পরিকল্পনা করতে হবে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে এমন উদ্যোগের কথাও এসেছে। সিআইপিআরবি সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ‘আঁচল’ নামের এলাকাভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের সাঁতার ও উদ্ধার কৌশল শেখাতে ‘সুইমসেফ’ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ দেখায়, পানিতে ডুবে মৃত্যু কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। অবশ্যই প্রতিরোধের সুযোগ আছে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন এত এত শিশুর মৃত্যু যদি আমাদের নাড়া না দেয়, তবে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। নদী থাকবে। খাল-বিল থাকবে। পানি থাকবে আমাদের জীবনের অংশ হয়ে। শুধু যেন আর কোনো মাকে বলতে না হয় যে মাত্র এক মিনিটের জন্য চোখের আড়াল করেছিলাম। কারণ, একটি শিশুর জীবন কখনোই এক মিনিটের আড়ালের কাছে হার মানার মতো ছোট নয়।
একজন মা হয়তো সেদিনের সেই এক মিনিটকে সারা জীবন মনে রাখবেন। কিন্তু আহমেদের গল্পকে শুধু একজন মায়ের অসতর্কতার গল্প বানিয়ে ফেললে আমরা মূল সমস্যাটিকে দেখতে পাব না। কারণ, একই ধরনের ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রথম আলোর আরও এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন শিশু-কিশোর পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা। আর ইউনিসেফের হিসাবে, বছরে ১৪ হাজারের বেশি শিশু ডুবে মারা যায়।
এই দুই তথ্যকে পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে, আমরা কি এই মৃত্যুগুলোকে এতটাই স্বাভাবিক করে ফেলেছি যে প্রতিদিন ৪০টি শিশুর মৃত্যু আমাদের বড় কোনো জাতীয় সংকট বলে মনে হয় না? সড়ক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে কয়েকজন মারা গেলে আমরা খবর করি। অগ্নিকাণ্ডে মানুষ মারা গেলে আলোচনা হয়। ভবনধসে মৃত্যু হলে তদন্ত হয়। কিন্তু একটি শিশু বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে মারা গেলে অনেক সময় সেটি থেকে যায় স্থানীয় সংবাদ হিসেবে। অথচ প্রতিটি শিশুর জীবনই সমান মূল্যবান।
বাংলাদেশ থেকে পুকুর সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। পানির সঙ্গে আমাদের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি গভীরভাবে জড়িত। প্রয়োজন হলো পানির সঙ্গে নিরাপদ সহাবস্থান তৈরি করা। একটি শিশুর জন্য পুকুর যেন খেলার মাঠ না হয়। বাড়ির পাশে পানির উৎস থাকলে নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ছোট শিশুকে নিরাপদ তত্ত্বাবধানের বাইরে রাখা যাবে না। আর পরিবারকে একা এই দায়িত্ব বহনের পাশাপাশি সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রকেও যুক্ত হতে হবে। কারণ, শুধু একজন মায়ের সতর্কতা দিয়ে ১৪ হাজার শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে প্রতিদিন এত এত শিশুর মৃত্যু যদি আমাদের নাড়া না দেয়, তবে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। নদী থাকবে। খাল-বিল থাকবে। পানি থাকবে আমাদের জীবনের অংশ হয়ে। শুধু যেন আর কোনো মাকে বলতে না হয় যে মাত্র এক মিনিটের জন্য চোখের আড়াল করেছিলাম। কারণ, একটি শিশুর জীবন কখনোই এক মিনিটের আড়ালের কাছে হার মানার মতো ছোট নয়।
মো. তারেক হাসান গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব