ইরান ঘিরে বৈশ্বিক বিপর্যয় কি অনিবার্য

ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতিবাদছবি: রয়টার্স

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ তৃতীয় মাস পেরিয়ে চতুর্থ মাসে প্রবেশ করতে চলেছে। এই দীর্ঘায়িত সংঘাতকে ঘিরে এখন আবারও ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের ব্যর্থ যুদ্ধগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে মানবিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক ধস ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে এ যুদ্ধ আগের যেকোনো আমেরিকান সংঘাতের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা শেষ করার সক্ষমতা তাঁর নেই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো যুদ্ধবাজ নেতৃত্বের প্ররোচনায় তিনি নিজেই এখন এক কোণঠাসা অবস্থায় দাঁড়িয়ে। একদিকে তাঁর সামনে পথ হলো আরও বড় পরিসরে অবৈধ বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাওয়া।

উন্নত দেশগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়ছে স্পষ্টভাবে। ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত জ্বালানি, খাদ্য ও পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমে গেছে। সাধারণ মানুষ কার্যত একধরনের ‘যুদ্ধ কর’ বহন করছে।

এটি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগকেও উসকে দিতে পারে এবং ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা হতে পারে। অন্যদিকে রয়েছে আপসের পথ, যা তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য (ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস) পূর্ণ করতে ব্যর্থ হবে এবং একটি ক্ষুব্ধ ও আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া ইরানকে টিকিয়ে রাখবে।

এ দুই পথই ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর এবং বাস্তবিকভাবে টেকসই নয়। বোমা হামলা ইরানের প্রতিরোধ ভাঙতে পারেনি। এটা এখন স্পষ্ট। সামরিক দিক থেকেও এর কার্যকারিতা সীমিত, কারণ বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের বড় অংশ এখনো অক্ষত। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা (ইসরায়েল ছাড়া) এবং সাধারণ আমেরিকান ভোটাররাও নতুন করে যুদ্ধ বাড়ানোর বিরোধিতা করছে।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প জানেন, তিনি কেবল নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেন না। তাঁর সিদ্ধান্তহীনতা ও দোদুল্যমান আচরণ তাঁকে একদিকে উগ্র হুমকি এবং অন্যদিকে অস্পষ্ট আশাবাদের মধ্যে দোলাচলে ফেলেছে। জনসমর্থনও নেমে এসেছে প্রায় ৩৭ শতাংশে, যা তাঁর নীতির প্রতি তীব্র অসন্তোষের ইঙ্গিত দেয়। তবে সমস্যা শুধু তাঁর নয়—এ সংঘাত এখন পুরো বিশ্বের জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনছে।

বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সোমালিয়ায় চাল ও গমের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সারসংকট কৃষি মৌসুমকে বিপর্যস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস দিচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মতে, যুদ্ধ চলতে থাকলে আরও প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি সাহায্য কমে যাওয়া, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

উন্নত দেশগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়ছে স্পষ্টভাবে। ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত জ্বালানি, খাদ্য ও পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমে গেছে। সাধারণ মানুষ কার্যত একধরনের ‘যুদ্ধ কর’ বহন করছে।

আরও পড়ুন

এই যুদ্ধ ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যও বদলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তার ঘনিষ্ঠ মিত্র জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোও ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীন এ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে, ফলে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।

এ যুদ্ধের ফলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, পরিবেশনীতি এবং সাধারণ মানবিক মূল্যবোধ—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—বিশ্বজুড়ে এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ কোথায়?

এ বিপর্যয় অনিবার্য নয়। ট্রাম্পকে থামানো সম্ভব এবং তা জরুরি।

আরও পড়ুন

এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও কঠোর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ। পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে এখনো যথেষ্ট প্রভাব আছে। ব্রিটেন যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে এখনই সেই সম্পর্ককে বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহার করার সময়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ যে ‘স্বাধীনতার জোট’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, তা কাজে লাগিয়ে ভারত, ব্রাজিল, কানাডা ও জাপানের মতো দেশগুলোকে একত্র করা যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আফ্রিকান ইউনিয়ন, জি–২০ এবং ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক জোটগুলোকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

  • সাইমন টিসডাল আন্তর্জাতিক–বিষয়ক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

    দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।