রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নতুন বছরের শুরুতেই এমন এক পরিস্থিতিতে পড়লেন, তাঁকে অস্বস্তিকর দুটি সিদ্ধান্তের মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। হয় তাঁকে ইউক্রেনে তাঁর বিশেষ সামরিক অভিযান সীমিত করতে হবে, নয়তো রাশিয়ার অর্থনীতিতে মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকি নিতে হবে।
কিন্তু প্রায় রাতারাতি পুতিনের হাতে সমস্যার সমাধান তুলে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা ক্রেমলিনের আয়ের প্রধান উৎসকে চাঙা করে দিয়েছে এবং পুতিনের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়া আরও সহজ করে তুলেছে।
গত সপ্তাহান্তে ইসরায়েল ইরানের তেল স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর পর অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২২ সালের গ্রীষ্মের পর এটিই তেলের সর্বোচ্চ দাম; তখন ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসনের পর বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দামের এই উল্লম্ফন রাশিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দেশটির জন্য বড় অর্থনৈতিক আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে। কারণ, ইউক্রেনে চার বছরের যুদ্ধের খরচ রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট তৈরির উপক্রম হয়েছিল।
ইরানের ওপর এই হামলা হয়তো মিত্রদের পাশে দাঁড়ানোর মস্কোর দাবিকে কিছুটা ম্লান করেছে, কিন্তু এটি ইতিমধ্যে রাশিয়ার অর্থনীতি এবং পরোক্ষভাবে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধকে লাভবান করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা এই সংঘাতের অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে ক্রেমলিন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
অর্থনৈতিক মোড়
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও রাশিয়ার অর্থনৈতিকভাবে অভিজাত ব্যক্তিদের মেজাজ ছিল বেশ বিষণ্ন। রুশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ বছরের বাজেট পরিকল্পনায় দেশটির প্রধান রপ্তানিযোগ্য জ্বালানি ‘ইউরাল ক্রুড’–এর (অপরিশোধিত জ্বালানি তেল) ভিত্তি মূল্য ধরা হয়েছিল প্রতি ব্যারেলে ৫৯ ডলার। কিন্তু জানুয়ারিতে জ্বালানি খাত থেকে আসা রাজস্ব ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়, যার ফলে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও হতাশাজনক হয়ে পড়ে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ সুদের হার এবং শ্রমিকের সংকটে অর্থনীতি যখন চাপে ছিল, তখন ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে উত্তেজনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের সিনিয়র ফেলো সার্গেই ভাকুলেনকো বলেন, ‘সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছিল; ব্যয় কমাতে হচ্ছিল, কর বাড়াতে হচ্ছিল এবং এমনকি সামরিক ব্যয় কমানোর বিষয়ও বিবেচনায় ছিল।’
রাশিয়া বরাবরই বলে আসছিল, তারা তাদের মিত্রদের (যেমন ইরান) রক্ষা করবে, খামেনির মতো একজন নেতার মৃত্যু রাশিয়ার সেই ‘মিত্রকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতির’ ওপর একটি বড় আঘাত। তবে পুতিন শেষ পর্যন্ত মনে করতে পারেন, এতে তাঁর লাভের পাল্লাই ভারী।
ভাকুলেনকো আরও যোগ করেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি কখনোই আলোচনার টেবিলে ছিল না, তবে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে সেই ফ্রন্টেও রাশিয়াকে কিছুটা ‘মিতব্যয়ী’ হতে হবে।
ঠিক তখনই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালায়। তেহরান পাল্টা জবাব দেয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়। তখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে স্থবিরতা নেমে আসে, যা তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। নির্বাসিত ক্রেমলিন সমালোচক এবং সাবেক জ্বালানিবিষয়ক উপমন্ত্রী ভ্লাদিমির মিলোভ বলেন, ‘হঠাৎ করেই মস্কো এই উপহার পেল। তারা যেন তাদের জীবনরক্ষাকারী সঞ্জীবনী পেয়ে গেল।’ তিনি জানান, বর্তমানে রুশ কর্মকর্তারা ‘খুবই খুশি’।
‘কৌশলগত ভুল’
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন আর কম দামে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে না; বরং রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল এখন চড়া দামে বিক্রি হতে পারে; কারণ, ভারত ও চীনের মতো প্রধান ক্রেতারা তাদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আরও বড় কথা হলো, ওয়াশিংটনও এতে সম্মতি দিচ্ছে।
গত শুক্রবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের ছাড়পত্র দেয়, যেন বিশ্ববাজারে তেলের প্রবাহ অটুট থাকে। এর এক দিন পর মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে। এটি গত বছরে নেওয়া মার্কিন নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে রাশিয়ার জ্বালানি কেনার জন্য দেশগুলোকে মার্কিন দণ্ডের মুখে পড়তে হতো।
অবশ্যই ক্রেমলিন এই মুহূর্তকে সর্বোচ্চ ফায়দা তোলার জন্য ব্যবহার করছে। পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাশিয়া তেল ও গ্যাস উভয় ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী ছিল এবং আছে।’ তিনি আরও যোগ করেন যে রুশ জ্বালানি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে।
এদিকে রাশিয়ার একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং পুতিন প্রশাসনের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী কিরিল দিমিত্রিভ এক্সে ধারাবাহিক পোস্টে উল্লাস প্রকাশ করে বলেন, ‘তেলের ধাক্কার সুনামি মাত্র শুরু হয়েছে।’ রুশ জ্বালানি থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার ইউরোপীয় সিদ্ধান্তকে তিনি একটি ‘কৌশলগত ভুল’ হিসেবে সমালোচনা করেন।
সোমবার ক্রেমলিনপন্থী ভাষ্যকারেরা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি নিবন্ধ প্রচার করেন, যেখানে তেলের দাম ২১৫ ডলারে পৌঁছে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
জ্বালানিবিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মস্কোর জন্য এখনই বিজয়ের দাবি করা খুব দ্রুত হয়ে যাবে। ইরানের সংকট রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য টেকসই সমাধান হবে কি না, তা সরাসরি নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হয়, তার ওপর।
রাশিয়ার সাবেক জ্বালানিবিষয়ক উপমন্ত্রী মিলোভ বলেন, রাশিয়ার অর্থনীতির অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য তেলের দাম অন্তত এক বছর বর্তমান স্তরে থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এক বা দুই মাসের উচ্চ দাম অবশ্যই সাহায্য করবে, কিন্তু এটি অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে দেবে না।’ ভাকুলেনকো যোগ করেন, দামের এই সাময়িক উল্লম্ফন কেবল ‘কঠিন সিদ্ধান্তগুলোকে পিছিয়ে দিতে সাহায্য করবে।’
মস্কো আরও একটি কারণে আশা করছে যে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে। যুদ্ধের প্রতিটি দিনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে, যেসব অস্ত্রের ওপর ইউক্রেনের আত্মরক্ষা নির্ভর করছে। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে, যাতে তারা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
তবে রাশিয়া বরাবরই বলে আসছিল, তারা তাদের মিত্রদের (যেমন ইরান) রক্ষা করবে, খামেনির মতো একজন নেতার মৃত্যু রাশিয়ার সেই ‘মিত্রকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতির’ ওপর একটি বড় আঘাত। তবে পুতিন শেষ পর্যন্ত মনে করতে পারেন, এতে তাঁর লাভের পাল্লাই ভারী।
ইভা হার্টগ একজন ডাচ সাংবাদিক, পলিটিকোর সঙ্গে কাজ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে রাশিয়া ও ইউরোপীয় রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদন করে আসছেন।
পলিটিকো থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।