বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মার খেতেন। এখন ঘটছে উল্টোটি। বিএনপির আমলে বিদেশে অর্থ পাচার হতো। সেই পাচারকৃত অর্থের সামান্য অংশ ফেরত এনে আওয়ামী লীগ সরকার বাহবা নিয়েছে, এখন তার চেয়ে কয়েক শ গুণ অর্থ পাচার হচ্ছে। একটি পয়সাও ফেরত আনতে পারেনি।

বিএনপির আমলে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে ‘হাওয়া ভবন’ ছিল। এখন অনেক ভবনের নাম শোনা যাচ্ছে। পি কে হালদার নামের এক ব্যবসায়ী সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা পাচার করে এখন ভারতের জেলে আটক। পুলিশের এক থানা পর্যায়ের কর্মকর্তাও কয়েক শ কোটি টাকা পাচার করেছেন।

বিএনপির আমলে সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি হতো। এখনো দুর্নীতি হচ্ছে। মাত্রা আরও বেড়েছে। বিএনপির আমলে জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণে আইসিটি আইন হয়েছিল। আওয়ামী লীগের আমলে তার উন্নত সংস্করণ দেখছি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। বিএনপির আমলে সংখ্যালঘুরা উৎপীড়িত হয়েছেন।

অতএব আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপির কর্মকাণ্ড এবং ছাত্রলীগ নেতারা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে নিজ দলের নেতা-কর্মীরা কী করছেন, সেদিকে নজর দিলে বুঝতে পারতেন, কোথায় কতটা সর্বনাশ হয়ে গেছে। ১৬ বছর আগে ক্ষমতা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বিএনপিকে নিয়ে শক্তিক্ষয় না করে আওয়ামী লীগের উচিত আয়নায় নিজের মুখ দেখা।

এখন হয় না এই দাবি করা যাবে না। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ৯ মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ৩০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত বছর দুর্গোৎসবের সময় পরিকল্পিতভাবে বহু মন্দিরে-বাড়িতে হামলা হয়েছে।

বিএনপির আমলে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদলের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। এখন ছাত্রলীগের আধিপত্য চলছে। তবে বিএনপির আমলে ছাত্রলীগ মাঝেমধ্যে ক্যাম্পাসে যেতে পারত, ছাত্রদল এখন সেটাও পারে না। এখন শিক্ষাঙ্গনে মারামারি হয় ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্রলীগের। এর সর্বশেষ উদাহরণ ঐতিহ্যবাহী ইডেন কলেজ। সেখানে ছাত্রলীগের নেত্রীরা সিট–বাণিজ্য করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। সেখানে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ আমরা দেখলাম।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে, তাতে দেশবাসী হতবাক। সেখানে ছাত্রদলের নতুন কমিটির নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চেয়েছিলেন এবং তিনি অনুমতিও দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে ক্যাম্পাসে ঢুকতেই তাঁদের বেধড়ক পেটান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।

কর্মসূচি নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে অনেক সময় পাল্টাপাল্টি বাধা–প্রতিপত্তি হয়ে থাকে। কিন্তু সেদিন ছাত্রদলের কোনো কর্মসূচি ছিল না উপাচার্যের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করা ছাড়া। ভাবতেও অবাক লাগে, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল শিক্ষার্থী আরেক দলের ওপর এভাবে হামলে পড়তে পারে? আওয়ামী লীগের নেতারা বলবেন, বিএনপির আমলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও এভাবে মার খেয়েছেন। জখম হয়েছেন। অর্থাৎ কুশীলব বদলায়, তাদের চরিত্র বদলায় না।

আওয়ামী লীগ ও বি‌এনপির আমলের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। বিএনপির আমলে বিরোধী দল আন্দোলন করে সরকারকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্যও করতে পারত। এখন সে রকম বিরোধী দল নেই। নাগরিক সমাজ ম্রিয়মাণ। গণমাধ্যম সদা ভয়ে থাকে।

এ অবস্থায় ক্ষমতাসীনেরা কাউকে পরোয়া করে না। বিএনপির আমলে গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ছিল। এখন সবল হয়েছে এ কথা নিশ্চয়ই কেউ বলবে না। তাহলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ফারাক কি কেবল স্লোগান আর পোশাকে? 

আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপিকে নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে নিজের সংগঠনের দিকে একবার নজর দিলে বুঝতে পারতেন, বাইরে যতই তাঁরা ক্ষমতার দাপট দেখান না কেন, ভেতরে-ভেতরে ঘুণ ধরেছে।

২০০৯ আর ২০২২ সালের আওয়ামী লীগ এক নয়। আওয়ামী লীগের ঘুণ সারানোর ওষুধ নিশ্চয়ই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া নয়। ওষুধ হলো নিজের নেতা-কর্মীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা।

আগামী ডিসেম্বরে দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ তৃণমূল স্তরে সম্মেলন করছে। এ সম্মেলন নিয়ে কোথায় কী কাণ্ড ঘটছে, তা–ও নিশ্চয়ই দলের নেতাদের জানা। কিছু কিছু খবর গণমাধ্যমেও এসেছে।

আওয়ামী লীগের নেতারা একসময় বলতেন, রাজনীতিতে বিএনপির কোনো অস্তিত্ব নেই। গণমাধ্যম তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। এখন দেখা যাচ্ছে সেই অস্তিত্বহীন বিএনপির নিরীহ কর্মসূচিতে তারা ভয় পেয়ে গেছে। যেখানে বিএনপি সমাবেশ ডাকে, সেখানেই আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা বাগড়া দেন।

কোথাও কোথাও হামলা করেন। মনে হচ্ছে, তঁারা আইনশৃঙ্খলা  রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও ভরসা রাখতে পারছেন না। আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, বিএনপি আন্দোলন জমানোর জন্য লাশের রাজনীতি করছে। কিন্তু সেই লাশের রাজনীতি করার সুযোগটি আওয়ামী লীগ কেন তাদের দিচ্ছে? নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার প্রতিবাদে বিএনপি তো সারা দেশে সভা-সমাবেশ করেছে।

কোনো সমস্যা হলো না। ভোলায় কেন দলের দুজন নেতা-কর্মীকে খুন হতে হলো? সেখানে পুলিশ বাড়াবাড়ি করেছে কি না, সরকার সেটি খতিয়ে দেখারও প্রয়োজন বোধ করেনি। এরপর নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জে কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বিএনপি-যুবদলের দুই নেতা-কর্মী মারা গেলেন।

চিকিৎসকের রিপোর্টে বলা হয়, ‘মস্তিষ্কে গুলির আঘাতে ক্ষত থেকে মৃত্যু হয়েছে।’ অথচ ঘটনার এক সপ্তাহ পর সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ বলছে, ‘ইটের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।’ সব সরকারই সত্যকে ভয় পায়। ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি জনগণকে ভয় দেখাত। আওয়ামী লীগও ভয় দেখাচ্ছে।

খোদ ঢাকা শহরের লালবাগ ও চকবাজার এলাকার দুটি সম্মেলন সুষ্ঠুভাবে হতে পারেনি। একটিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে তৃণমূল নেতারা মারামারি করেছেন। আরেকটিতে বিরক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা যাননি।

অতএব আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপির কর্মকাণ্ড এবং ছাত্রলীগ নেতারা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে নিজ দলের নেতা-কর্মীরা কী করছেন, সেদিকে নজর দিলে বুঝতে পারতেন, কোথায় কতটা সর্বনাশ হয়ে গেছে। ১৬ বছর আগে ক্ষমতা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বিএনপিকে নিয়ে শক্তিক্ষয় না করে আওয়ামী লীগের উচিত আয়নায় নিজের মুখ দেখা।

  • সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]