জিওফ্রে ম্যাকডোনাল্ডের বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের নেতৃত্বের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে যাচ্ছে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে প্রভাবশালী তিন দলের পররাষ্ট্রনীতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে একই রকম। বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি কোন কোন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণে গড়ে উঠছে, তা তুলে ধরেছেন জিওফ্রে ম্যাকডোনাল্ড। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের কী প্রভাব পড়তে পারে, সেটিও তিনি বিশ্লেষণ করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাজার হাজার মানুষ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে এগিয়ে গেলে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তিনি এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে একচ্ছত্র ও কঠোর হস্তে দেশটি শাসন করেছিলেন। টানা চার মেয়াদে তাঁর শাসনকাল ব্যাপক দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার কঠোরভাবে খর্ব করার ঘটনায় চিহ্নিত ছিল—যার মধ্যে রয়েছে নির্বাচনে কারচুপি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, গণমাধ্যমের ওপর নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি তরুণ। শেখ হাসিনার শাসনামলে অর্থনৈতিক সুযোগ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমে যাওয়ায় তাঁরা বিশেষভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। দলীয় সমর্থকদের জন্য সুবিধাজনক সরকারি চাকরির কোটা পুনর্বহাল করলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তরুণেরা আন্দোলন শুরু করেন। সরকারের সহিংস প্রতিক্রিয়া—যার ফলে রাজপথে অন্তত ১,৪০০ জন প্রাণ হারান—জনঅসন্তোষের বাঁধ ভেঙে দেয়।
সব পেশা ও শ্রেণির সাধারণ বাংলাদেশি এই আন্দোলন-বিক্ষোভে যোগ দেন, যা পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। বল প্রয়োগ করেও গণ-অভ্যুত্থান নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় সরকারের পতন ঘটে। আইনি সংস্কার এবং নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যা ঘিরে গড়ে উঠলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রচলিত ধারায় এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে।
গত দুই দশকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বেড়ে গেলেও বাংলাদেশ ‘হেজিং’ বা কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার নীতি অনুসরণ করেছে। এর লক্ষ্য ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক রেখে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা। একই সঙ্গে কোনো একটি জোটের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত না হয়ে কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে।
তবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বাংলাদেশের এই নীতিকে ভারতের দিকে হেলে দিয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকার ভারতের নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছিল, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছিল এবং জ্বালানি, বন্দর ও নৌপথের ক্ষেত্রে ভারতকে বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছিল। বিনিময়ে রাজনৈতিক দমন ও নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থাকলেও নয়াদিল্লি আওয়ামী লীগ সরকারকে অবিচল কূটনৈতিক সমর্থন দেয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে তিনটি দল প্রভাবশালী এবং তারাই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নিষিদ্ধ করার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মিল রয়েছে।
এ কারণে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাত্র আন্দোলন এবং পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার—উভয়ের মধ্যেই জোরালো ভারতবিরোধী অবস্থান দেখা যায়। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৮ মাস দায়িত্বে থাকলেও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনেনি। তবে তাদের নীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য নতুন করে সাজানোর ইঙ্গিত ছিল। তারা ভারতের কাছ থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত এই ধারাই অব্যাহত রাখতে যাচ্ছেন। বয়সে তরুণ বা প্রবীণ, নতুন বা প্রতিষ্ঠিত—বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে শুধু বয়স দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না। বরং দীর্ঘদিন পর নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাওয়াই তাঁদের একটি প্রজন্ম হিসেবে আলাদা করেছে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে বিরোধী দল, স্বাধীন রাজনৈতিক কর্মী এবং বিকল্প রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো ক্ষমতার প্রতিযোগিতার বাইরে ছিল। এ কারণে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের নেতাদের মধ্যে শুধু ছাত্রনেতা ও নতুন দলের সদস্যরাই নন, এমন প্রবীণ রাজনীতিকেরাও আছেন, যাঁদের জাতীয় নেতৃত্বে যাওয়ার পথ আওয়ামী লীগের শাসনামলে বন্ধ ছিল। অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও এই নতুন নেতারা আঞ্চলিক সম্পর্ক, ভূরাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে মোটামুটি একমত।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আগামী প্রজন্মের নেতা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে তিনটি দল প্রভাবশালী এবং তারাই পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নিষিদ্ধ করার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মিল রয়েছে।
বিএনপি বাংলাদেশের প্রধান মধ্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দল। দলটি ঐতিহ্যগতভাবে জাতিগত পরিচয়ের বাইরে (নন–এথনিক) বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং জনজীবনে শক্তিশালী ইসলামি পরিচয়ের পক্ষে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে চীন, মুসলিম বিশ্ব ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ার পক্ষে। এর মাধ্যমে দলটি পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের প্রভাবের ভারসাম্য তৈরি করতে চেয়েছে।
ব্যবসায়ী অভিজাত, বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্র, শহুরে পেশাজীবী, মধ্যবিত্ত এবং রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী ভোটারদের বড় একটি জোট থেকে বিএনপি সমর্থন পেয়েছে। দলটি পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষক, গ্রামীণ পরিবার ও ছোট শহরের ভোটারদের মধ্যেও সমর্থন বাড়িয়েছে।
আওয়ামী লীগের তুলনায় বেসরকারি খাত এবং ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল মুসলিম ভোটারদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন বেশি ছিল। অন্যদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে কোনো দলই তরুণদের সমর্থনে স্থায়ী একচেটিয়া অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। বরং নিজেদের বিস্তৃত নির্বাচনী জোটের অংশ হিসেবে দুই দলই তরুণ ভোটারদের জন্য জোরালো প্রতিযোগিতা করেছে।
দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বিএনপি আবার বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ফিরে আসে। আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা এবং বিএনপির সদ্য প্রয়াত খালেদা জিয়ার মধ্যে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলেছে। এরপর বিএনপির নতুন প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমানকে পরবর্তী প্রজন্মের নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপি তাদের আগের সরকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনলেও মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পদে নতুন মুখও এনেছে। তবে দলটির উদীয়মান তরুণ নেতাদের বেশির ভাগই দলের ভেতর থেকে উঠে এসেছেন। তাঁদের আগে থেকেই দলীয় পদ ছিল এবং অনেকের সঙ্গে প্রভাবশালী বিএনপি পরিবারের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই নতুন যোগ দেওয়া নেতা নন।
২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি তরুণদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিতি এবং সংস্কারের প্রশ্নে রক্ষণশীল অবস্থান দলটির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনের আগের জরিপগুলোতে দেখা যায়, তরুণ ভোটারদের সমর্থন বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে।
ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামী ইসলামি সংহতিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির কথা বলেছে। তবে একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্কও বজায় রেখেছে।
দলটি বিশেষ করে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে। আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের সমর্থন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দেশটির প্রভাবের কারণে জামায়াত সাধারণত ভারতকে সন্দেহের চোখে দেখে।
জামায়াতের নেতারা প্রায়ই আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা ফিলিস্তিনের জনগণ এবং বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থনের ওপর গুরুত্ব দেন। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জামায়াত পররাষ্ট্রনীতির চেয়ে দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের দিকে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়েছে।
এনসিপির পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিণত। তবে দলটির নেতারা আওয়ামী লীগের ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে তাঁরা চীন, পশ্চিমা দেশ ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিস্তারের পক্ষে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জামায়াতের কৌশলের একটি প্রধান দিক ছিল নিজেদের প্রচলিত ইসলামপন্থী সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরেও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা। ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে দলটি নিজেদের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিপরীতে সুশৃঙ্খল, সৎ এবং প্রচলিত ব্যবস্থাবিরোধী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বানের বদলে দলটির নেতারা সুশাসন, দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁরা বারবার ভোটারদের আশ্বস্ত করেছেন যে দলটি গণতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করবে এবং শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে না।
তরুণ এবং আদর্শগতভাবে কম ধর্মীয় ভোটারদের আকৃষ্ট করতে জামায়াত নিজেদের প্রকাশ্য বক্তব্যও সংযত করেছে। তারা কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সরকারের জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে দলটি পরিকল্পিত ডিজিটাল প্রচার চালিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার ও পেশাদারভাবে তৈরি কনটেন্টের মাধ্যমে প্রথমবারের ভোটার এবং শহুরে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে।
এতে জামায়াতের ভাবমূর্তি একটি প্রচলিত ইসলামপন্থী দল থেকে আধুনিক ও সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ নিতে সহায়তা করে। অথচ দলটিতে ব্যাপকভাবে পরিচিত নেতার সংখ্যা খুব বেশি ছিল না।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে গড়ে ওঠা তরুণনির্ভর রাজনৈতিক দল। প্রধানত সাবেক ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে পরিচালিত দলটি নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বিকল্প এবং নতুন প্রজন্মের জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে।
দলটি সাংবিধানিক সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার কথা বলে।
এনসিপির পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিণত। তবে দলটির নেতারা আওয়ামী লীগের ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে তাঁরা চীন, পশ্চিমা দেশ ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিস্তারের পক্ষে।
এনসিপির ছয়জন সংসদ সদস্য মূল নেতা হিসেবে সামনে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একজন নেতা।
তবে দলটি এখনো সাংগঠনিকভাবে দুর্বল এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচনের আগের জরিপে সাধারণ মানুষের মধ্যে, এমনকি তরুণ ভোটারদের কাছেও দলটির সীমিত সমর্থন দেখা গেছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের বাইরে গিয়ে এনসিপি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গতিশীলতাকে একটি টেকসই স্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নতুন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে ওঠার কারণ
বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের নেতাদের পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি কয়েকটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণে গড়ে উঠছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে রয়েছে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আরও সমতাভিত্তিক ভারসাম্য রক্ষা।
প্রথমত, বাংলাদেশ এমন এক ভূরাজনৈতিক ‘সুইং’ রাষ্ট্র হিসেবে উঠে এসেছে, যেখানে আঞ্চলিক ও বিশ্বশক্তির মাঝে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের সুবিধা আদায় করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝে দেশটির কৌশলগত অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকার এটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্য, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সম্পদের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
বিশাল জনসংখ্যা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শক্তিশালী তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বাড়িয়েছে। বিভিন্ন যোগাযোগ প্রকল্প প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথে পরিণত করছে।
ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি, বিনিয়োগ এবং সামরিক সহায়তা ও সহযোগিতা দিয়ে বাংলাদেশকে কাছে টানার চেষ্টা করছে। ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ায় দেশটি এখন বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বেশি সুবিধা আদায় করতে পারে। ফলে শুধু ভারতকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমেছে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নেতারা এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশে কাজ করছেন, যেখানে ভারতের প্রতি গভীর বিরূপ মনোভাব রয়েছে। ফলে পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে সাজানোর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের একটি জরিপে ৬০ শতাংশ বাংলাদেশি বলেছেন, তাঁদের দেশের ওপর ভারতের প্রভাব নেতিবাচক। সীমান্তে হত্যা, পানিবণ্টন এবং ভারতের অভ্যন্তরে মুসলিম ও বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত নীতির কারণে দেশটির প্রতি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের মানুষের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।
গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে এই মনোভাব আরও তীব্র হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়, তাঁকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে এবং বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর সহিংসতা ও উগ্রবাদ বৃদ্ধির অভিযোগগুলো অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরে। এসব কারণে মানুষের ক্ষোভ আরও গভীর হয়।
তৃতীয়ত, ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থানে ভারত সম্পর্কে সন্দিহান রাজনীতিকদের গুরুত্ব বেড়েছে। এতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে ভারসাম্যপূর্ণ করার রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি আসন পায় এবং মোট ভোটের ৩১ শতাংশ অর্জন করে। এটি দলটির আগের যেকোনো নির্বাচনী ফলের তুলনায় অনেক ভালো। এই ফল দেখায়, মানুষ ইসলামপন্থী রাজনীতিকে গ্রহণ করতে আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত।
২০২৫ সালের একটি জরিপে অর্ধেক উত্তরদাতা বলেছেন, আগের এক বছরে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বেড়েছে। একই বছরের তরুণদের নিয়ে করা আরেকটি জরিপে ৪৮ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ধর্মীয় রাজনীতি বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়ক।
ছাত্ররাজনীতিতেও এই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের বহুল আলোচিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন বড় জয় পেয়েছে। তবে ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসিত হয়ে অংশ নিলে জামায়াত এই মাত্রার সমর্থন ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
চতুর্থত, তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং আওয়ামী লীগ আমলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপ বাস্তবভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজন আরও বাড়িয়েছে। এসব চাপের মধ্যে ছিল বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়া।
বাংলাদেশ পশ্চিমা রপ্তানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আবার অবকাঠামো বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগেরও প্রয়োজন রয়েছে। ফলে দেশটির পক্ষে কোনো একটি শক্তির সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়া সম্ভব নয়।
একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রেখে চললে একক কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানো যায়। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে নিজের পক্ষে ঝুঁকে থাকা বাণিজ্যসুবিধা আদায় করেছে এবং ব্যাপক দুর্নীতির সমালোচনা করেনি। ফলে ভারতের বিশেষ সুবিধাগুলো কমানোর জন্য নতুন সংসদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
সবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের উন্নয়ন সহায়তা কমানো, বাণিজ্য ও শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিকভাবে অনির্ভরযোগ্য পররাষ্ট্রনীতি বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে বাংলাদেশকে আরও উৎসাহিত করেছে।
বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতিতে হঠাৎ পরিবর্তন এলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখতে এই পরিস্থিতি বাংলাদেশকে চীন, উপসাগরীয় দেশ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে উৎসাহিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতায় এর প্রভাব
২০১০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা ধীরে ধীরে বহুমেরুর দিকে যেতে থাকে এবং চীন আরও দৃঢ় অবস্থান নেয়। ফলে ছোট দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার নতুন কৌশল তৈরি করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ দুই বড় শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার নীতি অনুসরণ করেছিল।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ালেও নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী হয়ে উঠেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় দেশটি বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। চীন বাংলাদেশের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী এবং সামরিক প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
তবে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া এড়াতেও বাংলাদেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু চীনা প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে, ঋণের ঝুঁকি সীমিত রাখা হয়েছে, প্রকল্পে স্থানীয়দের বেশি অংশগ্রহণ দাবি করা হয়েছে এবং কখনো কখনো চীনের কূটনৈতিক চাপও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
চীনের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের প্রতিও বাংলাদেশ সংবেদনশীল থেকেছে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখার বৃহত্তর নীতিরই এটি প্রতিফলন।
আওয়ামী লীগ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা, উন্নয়ন, বাণিজ্য ও মানবিক সহযোগিতা বাড়িয়েছিল। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একক বা বিশেষ জোটে যুক্ত হওয়া এড়িয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সামরিক অর্থায়ন, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগ, উন্নয়ন সহায়তা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বড় ধরনের মানবিক সহায়তা দিয়েছিল। দেশটি বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান উৎস এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার।
তবে বাইডেন প্রশাসনের সময় দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা দেয়। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনটি আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর চাপ দেয়। এর মধ্যে ছিল ভিসা বিধিনিষেধ, বাংলাদেশের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে নিয়মিত সমালোচনা।
এই বিরোধ শেখ হাসিনা সরকারকে ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখার দিকে আরও বেশি ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশের নতুন সংসদ যে ভিন্ন ভূরাজনৈতিক পথ অবলম্বন করবে তার একটা পূর্বাভাস আওয়ামী লীগের পতনের পর ইউনূস-নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দিয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের কাছ থেকে পারস্পরিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। একই সঙ্গে ভারতের কাছ থেকে আরও দূরত্ব তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারে সমর্থন পাওয়ার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করে।
একই সময়ে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক বজায় রাখা হয়। কারণ, চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেনি। তবে তারা বাণিজ্য ও ট্রানজিট ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে, ভারতের বাণিজ্য বিধিনিষেধের প্রতিবাদ জানায় এবং সমতাভিত্তিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।
বাংলাদেশের নতুন সরকার ও সংসদের রাজনৈতিক শক্তিগুলো সম্ভবত এই ধারাই অনুসরণ করবে। বিএনপি ঐতিহ্যগতভাবে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। দলটি পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব ও একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেয়।
আগের বিএনপি সরকারগুলো চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।
ভারত সম্পর্কে মানুষের ব্যাপক সন্দেহ এবং বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে বাড়তে থাকা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই ঐকমত্য যুক্ত হয়েছে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ এবং কম ভারতকেন্দ্রিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শেখ হাসিনার পতনের আগে ও পরে বিএনপির নেতারা বলেছেন, বাংলাদেশকে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। তবে তাঁরা ভারতের প্রতি বিরূপ বক্তব্য কিছুটা সংযত করে দেশটির সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ গড়ার কথা বলেছেন।
বিএনপি গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে সাধারণত স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো, বাণিজ্য ও উন্নয়নে চীনের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে।
বিএনপির নেতারা প্রায়ই এমন একটি কূটনৈতিক নীতির কথা বলেন, যাতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়।
ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ভারতের প্রতি সন্দিহান জামায়াত ভারতের প্রভাব রুখতে এবং বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উৎস হিসেবে চীনকে বাস্তবসম্মত এক বিকল্প হিসেবে দেখে এসেছে। বাণিজ্য এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থনের প্রশ্নে জামায়াত যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সঙ্গেও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়তে চেয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের নেতারা বলেছেন, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলতে হবে। বরং এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি নিতে হবে, যাতে কোনো শক্তির সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত না হয়েও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রক্ষা করা যায়, অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানো যায় এবং বড় বৈশ্বিক শক্তিগুলোর পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা যায়।
এনসিপি নিজেদের একটি সংস্কারপন্থী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। দলটি আরও স্বাধীন, স্বচ্ছ ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে। আওয়ামী লীগ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে উঠে আসা দলটি ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বিদেশি শক্তির সঙ্গে অস্বচ্ছ চুক্তির সমালোচনা করেছে।
এনসিপির নেতারা সাধারণত চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে নিরপেক্ষ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে। তাঁরা কোনো একটি জোটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধিতা করেন।
দলটি অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, গণতান্ত্রিক শাসন এবং স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের প্রতি সমর্থন থাকলেও এনসিপির নেতারা অবকাঠামো, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য হলো, কোনো বিদেশি শক্তিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা সার্বভৌমত্বের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া যাবে না।
উপসংহার
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের নেতারা দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ভারসাম্যের নীতি পরিত্যাগ করবেন বলে মনে হয় না। বরং তাঁরা এই নীতিকে আরও পরিমার্জিত করতে চাইবেন।
আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে বাংলাদেশ সম্ভবত ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এড়িয়ে চলবে।
পশ্চিমা রপ্তানি বাজার, চীনা বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা রয়েছে। এসব কারণে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক রাখার প্রবল কাঠামোগত প্রয়োজন রয়েছে।
প্রধান পরিবর্তনটি কৌশলগত ভারসাম্যের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারে হবে না। বরং এই ভারসাম্য কোন দিকে থাকবে, সেটিই বদলাবে। আওয়ামী লীগ যেখানে পররাষ্ট্রনীতিকে ক্রমে ভারতের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে সমদূরত্বে রাখার পক্ষে। এতে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও সমানভাবে বণ্টিত হবে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক শ্রেণির মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। আদর্শগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—তিন দলই কৌশলগত স্বাধীনতা, বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং কোনো একক বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিরোধিতার কথা বলে।
তাদের বক্তব্য, অগ্রাধিকার ও পছন্দের অংশীদারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে বাংলাদেশকে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার বদলে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা থেকে সর্বোচ্চ সুযোগ নেওয়া উচিত—এই প্রশ্নে দলগুলো মোটামুটি একমত।
ভারত সম্পর্কে মানুষের ব্যাপক সন্দেহ এবং বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে বাড়তে থাকা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই ঐকমত্য যুক্ত হয়েছে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ এবং কম ভারতকেন্দ্রিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই প্রবণতা কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে এর জন্ম হয়েছে, সেটি কত দিন টিকে থাকে তার ওপর।
আওয়ামী লীগের ওপর থাকা বিধিনিষেধ ভবিষ্যতে শিথিল বা প্রত্যাহার করা হলে দলটির আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে ফিরে আসা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনীতিতে ভারতঘনিষ্ঠ একটি কণ্ঠ আবার যুক্ত হবে।
একইভাবে প্রথম আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের বিশেষ পরিস্থিতি থেকে জামায়াত বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচনে দলটি হয়তো একই মাত্রার সমর্থন পাবে না।
জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে এনসিপির ছয়টি সংসদীয় আসনে জয়ও সহজ হয়েছে। একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দলটির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে ভারত বিএনপি ও বাংলাদেশের অন্য উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে। ভারত বুঝতে পেরেছে, নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় শুধু আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভর না করে অন্য দলগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক গড়তে হবে।
এই প্রচেষ্টার ফলে ভবিষ্যতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক উষ্ণ হতে পারে। তেমনটি হলে বর্তমানে চলমান পররাষ্ট্রনীতির পুনর্ভারসাম্য কিছুটা ধীর বা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
সংক্ষেপে বলা যায়, নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের নেতারা আরও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের জন্য প্রস্তুত। তবে এই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
জিওফ্রে ম্যাকডোনাল্ড হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া সেন্টারের একজন অ্যাসোসিয়েট। তিনি ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিলেন। তিনি ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসে বাংলাদেশবিষয়ক ভিজিটিং বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
দ্য ন্যাশনাল ব্যুরো অফ এশিয়ান রিসার্চ থেকে অনূদিত