বাংলাদেশে দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি ব্যবস্থাপনায় মানসিক স্বাস্থ্য এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছরের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখিয়েছে, দুর্যোগের পর মানুষের পাশে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে পাশে থাকা জরুরি।
কারণ, বেঁচে ফেরার পরই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায় না। সংকটের প্রথম দিকে বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা গেলেও কয়েক মাস পর সেই সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই থেমে যায়।
অথচ বাস্তবতা হলো, এমন ঘটনার প্রভাব মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে থাকতে পারে।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে একটি বিধ্বংসী বিমান দুর্ঘটনা ঘটে, যেখানে অনেকে নিহত ও আহত হয়।
এক বছর পরও অনেক আহত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জীবনে সেই দিনের প্রভাব রয়ে গেছে। তবু এই এক বছরের গল্প কেবল কষ্টের নয়; এটি ধীরে ধীরে আবার জীবনকে গুছিয়ে নেওয়ার গল্পও।
এই এক বছরে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। অনেকে আবার নিয়মিত স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে, কেউ নিজের দৈনন্দিন রুটিন গুছিয়ে নিতে পেরেছে, আবার কারও রাগ ও বিরক্তি আগের তুলনায় কমেছে।
কেউ কেউ এখন নিজের ব্যায়াম, ম্যাসাজ বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত কিছু কাজ নিজেই করতে পারছে। ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসও ফিরে আসছে।
এসব পরিবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সঠিক সময়ে এবং ধারাবাহিকভাবে সহায়তা পেলে শিক্ষার্থীরা আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে।
তবে এটাও সত্য যে সবার পথচলা এক রকম নয়। এক বছর পরও শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ মানসিক চাপের সঙ্গে লড়াই করছে। ঘুমের সমস্যা অনেকের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
কেউ এখনো মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে। কেউ আগুন বা পোড়া গন্ধে ভয় পায়। আবার কেউ এখনো হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের কথা মনে করে রাতে ঘুমাতে চায় না।
পড়াশোনার ওপরও এর প্রভাব স্পষ্ট। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি বড় দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি একজন ব্যক্তির শিক্ষা, মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবিত করতে পারে।
আকাশ (ছদ্মনাম) এখনো চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পায় সেই বন্ধুদের, যারা এক বছর আগে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে তার চোখের সামনেই চিরতরে হারিয়ে গেছে। তাই যতটা সম্ভব ঘুমকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে সে।
ঘুম তার কাছে এখন আর বিশ্রাম নয়; বরং ভয়ের আরেকটি দরজা। রাত কেটে যায় মুঠোফোনের আলোয়, আর ভোর হলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুরু হয় নতুন একটি দিন।
দুর্ঘটনার পর আকাশের জীবন অনেকটাই বদলে গেছে।
সে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। শরীরের আঘাতের দাগ নিয়ে কেউ কিছু বললে সে অস্বস্তি বোধ করে, বিরক্ত হয়ে যায়। পরিবার লক্ষ্য করেছে, আগের তুলনায় তার খাওয়ার অভ্যাসও বদলে গেছে।
মানসিক চাপের সময় সে আগের চেয়ে বেশি খায়, আবার দিনের বড় একটি সময় কাটায় মুঠোফোনের পর্দায়।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, সে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। কিন্তু তার প্রতিটি রাত যেন মনে করিয়ে দেয়, একটি দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু শরীরে নয়, মনে কত দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যেতে পারে।
সাবিনার (ছদ্মনাম) জীবনের প্রতিটি দিন এখন হাসপাতাল, ওষুধ, ড্রেসিং, প্রেশার গার্মেন্টস আর ফলো-আপের সময়সূচি ঘিরে আবর্তিত হয়।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাত পর্যন্ত তার সবচেয়ে বড় চিন্তা এখন একটাই, তার মেয়েটা আজ কেমন আছে?
প্রতিদিন তাকে মনে করিয়ে দিতে হয় প্রেশার গার্মেন্টস পরতে, ম্যাসাজ করতে, ব্যায়াম করতে। কখনো মেয়ে বিরক্ত হয়ে রেগে যায়, কখনো বলে, ‘আজ আর ভালো লাগছে না।’
তখন সাবিনা বুঝতে পারেন না জোর করবেন, নাকি ছেড়ে দেবেন। সন্তানের শরীরের ক্ষত ধীরে ধীরে শুকালেও তার মনের ভয় আর অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি।
এই এক বছরে নিজের কথা ভাবার সময়ই পাননি সাবিনা। সংসার, হাসপাতাল, স্কুল, চিকিৎসা—সবকিছুর ভার একসঙ্গে সামলাতে সামলাতে তিনি প্রায়ই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
তবু প্রতিদিন নিজেকে শক্ত রাখেন। কারণ তিনি জানেন, সন্তান যদি তাকে ভেঙে পড়তে দেখে, তাহলে সে-ও হয়তো আর সাহস করে সামনে এগোতে পারবে না।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পর আকাশ ও সাবিনার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় কোনো দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু শিক্ষার্থীদের জীবনেই নয়, তাদের পাশে থাকা অভিভাবকদের জীবনেও গভীর ছাপ ফেলে।
তাই দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক সহায়তা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, তাদের পরিবারের জন্যও সমান জরুরি। মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা আর মানুষকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা এক বিষয় নয়।
শারীরিক চিকিৎসার দীর্ঘ পথচলা অনেকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী এখনো দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনরায় অস্ত্রোপচার, প্রেশার গার্মেন্টস ব্যবহার কিংবা নিয়মিত ফিজিওথেরাপির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া তাদের জন্য শারীরিক ও মানসিক, দুই দিক থেকেই ক্লান্তিকর। কেউ কেউ শরীরের দাগ নিয়ে অস্বস্তি অনুভব করছে, অন্যদের সামনে যেতে চাইছে না বা নিজেদের নিয়ে সংকোচ বোধ করছে।
এই পুরো সময়ে অভিভাবকেরাও কম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হননি। সন্তানকে আবার আগের জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে তারাও ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে অসহায় বোধ করেছেন।
কোথাও কোথাও চিকিৎসা-সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে শারীরিক চিকিৎসা যেমন জরুরি, তেমনি দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক ও সামাজিক সহায়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গত এক বছরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সাইকিয়াট্রিস্ট ও ব্র্যাকের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের যৌথ সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করা হয়েছে।
সংকটের সময় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার চেয়ে আগে থেকে প্রস্তুত অংশীদারত্ব অনেক বেশি কার্যকর। একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। দুর্ঘটনার পর অতিরিক্ত কৌতূহল, বারবার ঘটনাটি জানতে চাওয়া, শারীরিক ক্ষত নিয়ে মন্তব্য করা, ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া এসব আচরণ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এ ছাড়া অভিভাবকদের চ্যালেঞ্জের কথা বিবেচনা করে সম্মিলিতভাবে ইতিমধ্যে দুটি প্যারেন্টস গ্রুপ সেশনের আয়োজন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে অভিভাবকদের অনুভূতিগুলো শোনা, বোঝা এবং তাদের সন্তানদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এমন একটি দুর্ঘটনার প্রভাব কখনো শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর পড়ে না; পুরো পরিবারই এর ভার বহন করে তাই কেয়ারগিভারের যত্নও অপরিসীম।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছরপূর্তি শুধু স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; এটি আমাদের শেখারও সময়। প্রথমত, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
স্কুল, হাসপাতাল এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগীর পাশাপাশি তাদের অভিভাবক/পরিবারে যত্নদানকারী ব্যক্তিদের জন্যও নিয়মিত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার এই দীর্ঘ যাত্রায় তারাও সমানভাবে প্রভাবিত হন।
তৃতীয়ত, সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান এবং মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে আগেভাগেই সমন্বিত প্রস্তুতি গড়ে তুলতে হবে।
সংকটের সময় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার চেয়ে আগে থেকে প্রস্তুত অংশীদারত্ব অনেক বেশি কার্যকর।
একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। দুর্ঘটনার পর অতিরিক্ত কৌতূহল, বারবার ঘটনাটি জানতে চাওয়া, শারীরিক ক্ষত নিয়ে মন্তব্য করা, ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া এসব আচরণ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
ট্রমা-সংবেদনশীল আচরণ এখন শুধু স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের নয়; পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি এবং গণমাধ্যম সবার দায়িত্ব।
এই এক বছরপূর্তিতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত মানসিক স্বাস্থ্যকে আর ‘পরের ধাপ’ হিসেবে নয়; বরং দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি সহায়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা।
কারণ, শরীরের ক্ষত একদিন শুকিয়ে যায়, কিন্তু মনের ক্ষত সারতে সময়ের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘ সময় ধরে পাশে থাকা, সহমর্মিতা ও সম্মিলিত দায়বদ্ধতা।
ডা. শায়লা ইসলাম, সহযোগী পরিচালক, ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচি।
[email protected]