কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হবেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক?

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থী প্রার্থী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলাকে সমর্থন জানিয়েছেন।ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থী প্রার্থী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলাকে সমর্থন জানিয়েছেন।

ট্রাম্প এসপ্রিয়েলাকে সমর্থন জানিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, এই নির্বাচনের ফলাফল কলম্বিয়ার ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কলম্বিয়ার সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার ব্যাপক প্রশংসা করেন এবং তাঁর প্রচারণার নাম এল তিগ্রে (বাঘ) উল্লেখ করে বলেন, ‘এসপ্রিয়েলার অসাধারণ সাফল্য এবং আমার প্রতি তার রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে আবেলার্দোকে আমি আমার পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন দিচ্ছি।’

এসপ্রিয়েলা জুনে অনুষ্ঠেয় রানঅফ নির্বাচনে বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর দলের প্রার্থী ইভান সেপেদার মুখোমুখি হবেন। ইভান সেপেদা ট্রাম্পের এই সমর্থনের নিন্দা করে সাংবাদিকদের বলেন, কলম্বিয়ার নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কলম্বিয়ার স্বার্থের পরিপন্থী।

অন্যদিকে এসপ্রিয়েলা ট্রাম্পের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্র-কলম্বিয়া সম্পর্ককে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী করবেন।

আরও পড়ুন

কলম্বিয়ান সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসপ্রিয়েলা বলেন, অপরাধ, মাদক-সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং কলম্বিয়াকে দীর্ঘদিনের সহিংসতা থেকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নিজের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ট্রাম্পের সমর্থনের পর এসপ্রিয়েলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করেন। সেখানে তাঁর প্রচারণার প্রতীক ‘বাঘ’–এর পাশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীক ইগলকে দেখানো হয়।

এদিকে ট্রাম্পের কলম্বিয়ার নির্বাচনে প্রকাশ্যে সমর্থন বিভিন্ন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিদেশি নির্বাচনে প্রকাশ্যে সমর্থন এবং প্রভাব বিস্তারের যে প্রবণতা দেখা গেছে, কলম্বিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন তারই উদাহরণ।

অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য সমর্থন বিদেশি নির্বাচনে প্রায় অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু এখন তা নিয়মিত হয়ে উঠছে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর নির্বাচনে।

আরও পড়ুন

গত বছর ট্রাম্প হন্ডুরাসের জাতীয় নির্বাচনে একজন ডানপন্থী প্রার্থীকে সমর্থন করেছিলেন, পরে যিনি নির্বাচনে জয়ী হন। এ ছাড়া ট্রাম্প আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলিয়ের রাজনৈতিক জোটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে সমর্থন দিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের এই সমর্থন লাতিন আমেরিকায় সমমনা নেতাদের প্রতি ইতিমধ্যে একটি ডানপন্থী রাজনীতিকে শক্তিশালী করছে বলে মনে করা হয়। এর মাধ্যমে ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবও প্রকাশ পায়।

তাই এসপ্রিয়েলার প্রতি ট্রাম্পের এই সমর্থন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মার্কিন নাগরিক কি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন?
পৃথিবীর অনেক দেশেই রাষ্ট্রের প্রধান কে হবেন, এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশের সংবিধানের আর্টিকেল ৬৬ (২) অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে হলে এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তাঁকে অবশ্যই দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে। তবে কলম্বিয়ার ব্যাপারটা ভিন্ন।

আরও পড়ুন

কলম্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে হলে একজন ব্যক্তিকে জন্মসূত্রে কলম্বিয়ান নাগরিক হতে হবে এবং ন্যূনতম ৩০ বছর বয়সী হতে হবে।

কলম্বিয়ার আইন দ্বৈত নাগরিকত্বকে স্বীকৃতি দেয়, তাই কোনো ব্যক্তি যদি জন্মসূত্রে কলম্বিয়ার নাগরিক হন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও গ্রহণ করেন, তিনি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করতে পারবেন।

এ কারণেই দে লা এসপ্রিয়েলা, যিনি কলম্বিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং পরে মার্কিন নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন, আইনগতভাবে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন। তবে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবের ইতিহাস রয়েছে। ফলে একজন প্রেসিডেন্ট যদি একই সঙ্গে কলম্বিয়ান ও মার্কিন নাগরিক হন, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার আনুগত্য থাকবে কোন দেশের প্রতি এবং এসপ্রিয়েলা কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন?

ট্রাম্প–সমর্থিত প্রার্থী এসপ্রিয়েলা একজন আইনজীবী। কর্মজীবনের বড় একটি অংশ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি এবং পরে ইতালির ফ্লোরেন্সে কাটিয়েছেন। গত বছর তিনি কলম্বিয়ায় ফিরে যান এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন।

তিনি নিজেকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মাইলেইর মতো ব্যয় সংকোচনকারী সংস্কারক এবং এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নাইয়াব বুকলির মতো কঠোর নিরাপত্তানীতির সমর্থক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছেন।

তাঁর এ বার্তা কলম্বিয়ার ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে; কারণ, দেশটির জনগণ সাম্প্রতিক সময়ে পুনরায় তীব্র হয়ে ওঠা মূল্যস্ফীতি, সশস্ত্র সংঘাত, সহিংসতা এবং সংগঠিত অপরাধ বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

এসপ্রিয়েলা নিজেকে ‘কলম্বিয়া প্রথম’ নীতির প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং তাঁর প্রচারণায় জাতীয়তাবাদী বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মাদক পাচারকারীদের দমন করার অঙ্গীকার করেছেন।

আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় এখনো স্পষ্ট করে জানাননি যে নির্বাচিত হলে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করবেন কি না। ফলে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন যে এসপ্রিয়েলা কতটা স্বাধীনভাবে কলম্বিয়ার স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করবেন, যখন তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে সমর্থন জানাচ্ছেন।

একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মার্কিন নাগরিক হওয়া তাঁর জন্য এবং কলম্বিয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন লাতিন আমেরিকাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।

প্রচারণা চলাকালে তাঁর ও তাঁর দলের কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি সহিংসতা এবং প্রার্থীদের বিরুদ্ধে হুমকির প্রেক্ষাপটে তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন: যদি কেউ একজন মার্কিন নাগরিককে আক্রমণ করে, তাহলে সে সরকার হোক, বিরোধী দল হোক, সন্ত্রাসী বা মাদক সন্ত্রাসী হোক, তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।

রাজনৈতিকভাবে আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার নাগরিকত্ব বিতর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, দে লা এসপ্রিয়েলা একদিকে কলম্বিয়ান জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের বার্তা দিচ্ছেন; আবার অন্যদিকে তিনি নিজেই একজন মার্কিন নাগরিক।

আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় এখনো স্পষ্ট করে জানাননি যে নির্বাচিত হলে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করবেন কি না। ফলে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন যে এসপ্রিয়েলা কতটা স্বাধীনভাবে কলম্বিয়ার স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করবেন, যখন তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে সমর্থন জানাচ্ছেন।

ইতিমধ্যে এসপ্রিয়েলার পুরোনো একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যেখানে দে লা এসপ্রিয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণের ঘোষণার পর অনলাইনে লেখেন: আমি আমেরিকায় যে শান্তি ও সমৃদ্ধি উপভোগ করছি, তা কলম্বিয়ায় খুঁজে পাওয়া কঠিন; কারণ, সেখানে আছে অনেক নিরাপত্তাজনিত সমস্যা। তাই এখন সব ছাপিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচিত হলে দে লা এসপ্রিয়েলার আনুগত্য থাকবে কোন দেশের প্রতি, যুক্তরাষ্ট্র নাকি কলম্বিয়া?

এদিকে রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায় এসপ্রিয়েলার প্রতি ট্রাম্পের এই সমর্থন, বিদেশি নির্বাচনী হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিতর্কের একটি উদাহরণ, যা লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

কলম্বিয়ার এই জাতীয় নির্বাচন দুটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে: দ্বৈত নাগরিকত্ব বনাম জাতীয় আনুগত্য এবং বিদেশি সমর্থন বনাম জাতীয় সার্বভৌমত্ব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যখন একটি দেশ অন্য একটি দেশের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে, তখন গণতন্ত্র আর টিকে থাকতে পারে না।

বিদেশি শক্তির নির্বাচনী হস্তক্ষেপ কলম্বিয়ার জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার মার্কিন নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তানীতির ক্ষেত্রে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। অনেকে দাবি করেছেন, নির্বাচিত হলে এসপ্রিয়েলা মার্কিন স্বার্থই রক্ষা করবেন।

এসপ্রিয়েলা নির্বাচিত হলে কার স্বার্থ রক্ষা করবেন, তা–ই এখন দেখার বিষয়? ইতিমধ্যে কলম্বিয়ায় প্রথম দফায় ৩১ মে ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফায় ডানপন্থী প্রার্থী এসপ্রিয়েলা ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন এবং তাঁর পরই ছিলেন বামপন্থী প্রার্থী ইভান সেপেদা ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট লাভ করেন।

উল্লেখ্য, প্রথম দফায় প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থীই মোট ভোটের অন্তত ৫০ শতাংশ অর্জন করতে না পারায় শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে ২১ জুন দ্বিতীয় দফায় রানঅফ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আসন্ন এ নির্বাচনের মাধ্যমেই কলম্বিয়ার ভাগ্য নির্ধারিত হবে।

আর এ নির্বাচনে যদি এসপ্রিয়েলা জয়ী হন, তাহলে কলম্বিয়া একই সঙ্গে একজন কলম্বিয়ান ও মার্কিন নাগরিককে তাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেতে যাচ্ছে। তখন এসপ্রিয়েলার আনুগত্যের বিতর্ক আরও নতুনভাবে শুরু হবে আর সেটা হতে পারে কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার নতুন কারণ।

কলম্বিয়ার জাতীয় স্বার্থ এবং সন্ত্রাস-মাদক নির্মূলের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি জাতীয় ঐক্য ও সংহতি এবং এই সময়ে এসপ্রিয়েলার জয় কলম্বিয়ার জাতীয় ঐক্যের জন্য কোনো সুবিধাজনক ফলাফল বয়ে আনবে না বলেই আপাতত মনে হচ্ছে।

  • সানজিদা বারী, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরাল ফেলো হিসেবে অধ্যয়নরত
    [email protected]