কৃষকের গোলায় ধান, তবু চাল আমদানি কেন

প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতির নয়। এটি কৃষকের ন্যায্যমূল্য, ভোক্তার স্বার্থ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের বাজার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রশ্ন।ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় সাফল্যের নাম ধান। স্বাধীনতার পর যে দেশ খাদ্যসংকটের প্রতীক ছিল, সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধান উৎপাদনকারী দেশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৫ কোটি ৫০ লাখ টনের বেশি ধান উৎপাদিত হয়, যা মাড়াইয়ের পর প্রায় ৪ কোটি টন চালের সমান।

অন্যদিকে দেশের বার্ষিক চালের চাহিদাও প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ টন।

এ পরিসংখ্যান একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন সামনে আনে। দেশে ধানের উৎপাদন ও চাহিদা কাছাকাছি থাকার পরও যখন কৃষকের ঘরে গোলাভরা ধান, তখন প্রতিবছর বিদেশ থেকে লাখ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয় কেন?

প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতির নয়। এটি কৃষকের ন্যায্যমূল্য, ভোক্তার স্বার্থ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের বাজার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রশ্ন।

আরও পড়ুন

এ ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। খাদ্যগুদামে পর্যাপ্ত মজুত রাখা, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া এবং বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য অনেক সময় চাল আমদানি প্রয়োজন হয়।

বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা উৎপাদনঘাটতির আশঙ্কা থাকলে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে আমদানি যৌক্তিক হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন ওঠে সময় নিয়ে।

যখন কৃষক মাঠ থেকে ধান তুলে বাজারে আনছেন, ঠিক তখন যদি বড় পরিসরে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত আসে, তাহলে স্থানীয় বাজারে ধানের চাহিদা কমে যায়। ফলে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পান না।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই কৃষক, যিনি ঋণ শোধ, শ্রমিকের মজুরি ও সংসারের খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে ফসল কাটার পরপরই ধান বিক্রি করেন।

এখানেই উৎপাদননীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে বছরে বোরো, আমন ও আউশ মিলিয়ে ৫ কোটি ৫০ লাখ টনের বেশি ধান উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে শুধু বোরো মৌসুম থেকেই।

চলতি বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল প্রায় ২ কোটি ২৭ লাখ টন। অথচ এই বিপুল উৎপাদনের পরও কৃষকের সবচেয়ে বড় সংকট বাজার।

চলতি বোরো মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা প্রতি মণ ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মাত্র ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকায়।

প্রশ্ন হলো, সরকার যদি বেশি দামে ধান কিনতে চায়, তাহলে কৃষক সেই সুবিধা পাচ্ছেন না কেন? প্রতিবছর একই অভিযোগ শোনা যায়।

কৃষক ধান নিয়ে সরকারি গুদামে গেলে কখনো বলা হয় আর্দ্রতা বেশি, কখনো বলা হয় মান ঠিক নেই, আবার কোথাও জানানো হয় কোটা পূরণ হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত কৃষক বাধ্য হয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীর কাছে কম দামে ধান বিক্রি করেন।

আরও পড়ুন

এটি বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ নয়। বহু বছর ধরে কৃষক সংগঠন, গণমাধ্যম ও কৃষি অর্থনীতিবিদেরা সরকারি সংগ্রহব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা সরকারি সংগ্রহ কর্মসূচির বড় সুবিধাভোগী হয়ে ওঠেন।

সরকারি সংগ্রহব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো কৃষক কার্ড সিন্ডিকেট।

মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, প্রতি উপজেলায় গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন কৃষকের নামে সরকারি সংগ্রহ কার্ড থাকলেও প্রকৃত কৃষকের একটি বড় অংশ নিজেরা গুদামে ধান দিতে পারেন না।

অভিযোগ রয়েছে, এসব কার্ড দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকায় কিনে নেয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। পরে তারাই সরকারি দরে ধান সরবরাহ করে বিপুল মুনাফা করে।

হিসাব করলে শুধু একটি উপজেলাতেই এ প্রক্রিয়ায় প্রায় চার কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা সিন্ডিকেটের হাতে চলে যেতে পারে।

ফলে সরকারের ঘোষিত ন্যায্যমূল্যের সুবিধা কৃষকের কাছে না পৌঁছে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে চলে যায়।

আরও পড়ুন

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বাস্তবতা। ফসল কাটার মৌসুমে কৃষকের হাতে ধান থাকলেও সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত। অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় তিনি অপেক্ষা করতে পারেন না।

অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও মিলমালিকেরা অপেক্ষা করতে পারেন। তাঁরা কম দামে ধান কিনে পরে বেশি দামে বাজারজাত করেন। ফলে উৎপাদক কম দাম পান আর ভোক্তাকে শেষ পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে চাল কিনতে হয়।

অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুই পক্ষই। লাভবান হয় মধ্যবর্তী বাজার চক্র।

খাদ্য অধিদপ্তরের ১৭ জুন ২০২৬ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট ৮৫ লাখ ৮৩ হাজার টনের বেশি খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে।

এর মধ্যে ৭৩ লাখ ১৬ হাজার টন চাল এবং ১২ লাখ ৬৭ হাজার টন গম।

সরকারের ব্যাখ্যা, খাদ্য মজুত নিশ্চিত রাখা, বন্যাসহ সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলা এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতেই এ আমদানি প্রয়োজন হয়েছে।

কিন্তু উৎপাদন, মজুত ও প্রকৃত চাহিদার তথ্য যদি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন না করা হয়, তাহলে আমদানির সিদ্ধান্তও ভুল হতে পারে।

ভৈরব মোকামের প্রতিদিনকার দৃশ্য।
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

আর সেই ভুলের সবচেয়ে বড় মূল্য দেন কৃষক। বাংলাদেশের কৃষি এখন উৎপাদনের সংকটে নয়; সংকটে রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনায়। তাই সমাধানও উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

প্রথমত, সরকারি ধান সংগ্রহব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। কোন কৃষক কত ধান বিক্রি করলেন, কোন গুদাম কত সংগ্রহ করল, কোন কারণে ধান বাতিল হলো—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা চালু করা প্রয়োজন, যাতে অনিয়ম ও পক্ষপাত কমে।

তৃতীয়ত, কৃষক পর্যায়ে আর্দ্রতা পরিমাপের যন্ত্র, আধুনিক শুকানোর ব্যবস্থা এবং সারা দেশে একই মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।

একই ধান এক গুদামে গ্রহণযোগ্য, আরেক গুদামে বাতিল—এমন পরিস্থিতি চলতে পারে না।

চতুর্থত, স্থানীয় ধান সংগ্রহ শেষ হওয়ার আগে বড় পরিসরের চাল আমদানি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।

যদি আমদানি করতেই হয়, তবে সময় ও পরিমাণ এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে কৃষকের বাজারদর ভেঙে না পড়ে।

সবশেষে উৎপাদন, মজুত, ক্ষয়ক্ষতি ও চাহিদার তথ্য দ্রুত, নির্ভুল ও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। কারণ, ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে সঠিক খাদ্যনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের কৃষক ভর্তুকি নয়, ন্যায্যমূল্য চান। তিনি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে বড় রক্ষক। অথচ বাজারে তিনিই সবচেয়ে দুর্বল।

কয়েক বছর আগে ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে এক কৃষকের হতাশাভরা মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল, ‘এবার থেকে ধান না করে, করব গাঁজা চাষ। দেখি তখন কী খাস!’ এটি কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য নয়; বরং এক উৎপাদকের গভীর বঞ্চনার আর্তনাদ।

খাদ্যনিরাপত্তার প্রকৃত মানদণ্ড গুদামে কত চাল আছে, তা নয়; মাঠের কৃষক তাঁর উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন কি না।

কৃষকের গোলাভরা ধান আর বন্দরে বিদেশি চালের জাহাজ যেন একই সঙ্গে আমাদের কৃষিনীতির প্রতীক না হয়ে ওঠে, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য।

  • জাহানুর রহমান, সাংবাদিক
    ইমেইল: [email protected]
    *মতামত লেখকের নিজস্ব।