ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ হলো। যুদ্ধের এই ডামাডোলে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। যে নির্বাসিত নেতা রেজা পাহলভীকে দীর্ঘ সময় ধরে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রধান বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল, সেই পাহাড়সম আস্থায় এখন বড় ফাটল ধরেছে। খোদ বিরোধী শিবিরের একটি বড় অংশই এখন তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।
সংশয় শুধু বর্তমান যুদ্ধের দুই সপ্তাহে তৈরি হয়েছে, তা নয়, বরং এর শিকড় আরও গভীরে। বিশ্লেষকদের মতে, পাহলভীর প্রতি বিমুখ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল চলতি বছরের জানুয়ারির উত্তাল বিক্ষোভের সময় থেকেই। চরম দমন-পীড়নের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তিনি যখন মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানান, তখনই তাঁর ‘দূরদর্শিতা’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
নিরাপত্তার খাতিরে ছদ্মনাম ‘দিনা’ ব্যবহার করে মিডিল ইস্ট আই-এর সঙ্গে কথা বলছেন তেহরানের ৩৯ বছর বয়সী এক নারী। একসময় দিনা বিশ্বাস করতেন, বিচ্ছিন্ন ইরানি জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন শাহ-পুত্র। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাঁর সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছে।
দিনা বলেন, ‘যদি তাঁর মধ্যে বাবার সামান্য রাজনৈতিক জ্ঞান কিংবা মায়ের মানবিক প্রজ্ঞা থাকত, তবে তিনি বুঝতেন এভাবে সাধারণ মানুষকে গুলির মুখে ঠেলে দিয়ে ক্ষমতা অর্জন সম্ভব নয়।’
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাহলভী এবং ওয়াশিংটন-তেল আবিবের আহ্বানে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে অংশ নিয়েছিলেন দিনাও। দেখেছিলেন সেই রক্তাক্ত দমন-পীড়ন। সরকারি ভাষ্যে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার বলা হলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি—এই সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরার পরও পাহলভীর অনড় অবস্থান ও নতুন নতুন কর্মসূচির আহ্বান অনেকের কাছেই এখন ‘বাস্তববিবর্জিত’ বলে মনে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ইরানের ঐতিহ্যবাহী পারস্য উৎসব ‘চাহারশানবে সুরি’র আহ্বানকে কেন্দ্র করে। গত রোববার এক ভিডিও বার্তায় পাহলভী উৎসবটি ঘটা করে পালন করে বর্তমান সরকারের প্রতি বিদ্রোহ দেখানোর আহ্বান জানান। কিন্তু বর্তমান পটভূমি সম্পূর্ণ ভিন্ন। টানা দুই সপ্তাহ ধরে ইরানের বড় শহরগুলোয় বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র পড়ছে। রেড ক্রিসেন্টের মতে, এরই মধ্যে ১৫ শতাধিক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এমন মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে উৎসব করার আহ্বানকে অনেকেই দেখছেন নিছক রসিকতা হিসেবে।
তেহরানের ছাত্র মাজিদ তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। জানুয়ারির বিক্ষোভে তিনি তাঁর প্রিয় বন্ধুকে হারান। মাজিদের মতে, বন্ধুর মৃত্যুর জন্য সরকার সরাসরি দায়ী হলেও পাহলভী বা অন্যান্য নেতারা যেভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ‘অবাস্তব জয়ের আশা’ গেঁথে দিয়েছিলেন, তার দায়ও কম নয়। যখন সাধারণ মানুষ প্রতি রাতে প্রাণ হাতে নিয়ে ঘুমাতে যায়, তখন রাস্তায় নেমে বাজি পোড়ানোর মতো শক্তি কারও মনে অবশিষ্ট নেই।
এই হতাশার আগুনে ঘি ঢেলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিশ্রুতি। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার বিপ্লবের আশা দেখালেও রাজপথের লড়াইয়ে ইরানি জনতা শেষ পর্যন্ত একাই থেকে গেছে। ২৪ বছর বয়সী মোর্তেজা বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম ১৯৭৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনি যেভাবে নির্বাসন থেকে ফিরে দেশকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন, পাহলভীও সেভাবে আসবেন। কিন্তু তিনি দূর থেকে শুধু নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছেন।’
রেজা পাহলভীর কিছু একনিষ্ঠ সমর্থক এখনো স্বপ্ন দেখেন যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে তিনি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের জোর দিন দিন কমে আসছে। গোরগানের বাসিন্দা আমিরের মতে, একসময় পাহলভীর সমালোচনা করলেই তাঁকে সরকারের দালাল হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হতো, আজ পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ এখন বুঝেছে, ফাঁপা প্রতিশ্রুতি আর সংবেদনহীন নেতৃত্বের দিয়ে পরিবর্তন অসম্ভব।
রাজনৈতিক সমীকরণ ছাপিয়ে পাহলভীর মানবিক সংবেদনশীলতাও এখন তর্কের তুঙ্গে। অভিযোগ উঠেছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের প্রতি তিনি সমবেদনা জানালেও ইরানি বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানিতে তাঁর অবস্থান ছিল মৌন। এটি ইরানিদের আত্মসম্মানে বড় আঘাত হেনেছে। দিনার প্রশ্ন— যিনি নিজেকে ইরানিদের প্রতিনিধি দাবি করেন, তিনি বিদেশি সেনাদের জন্য কাঁদেন ঠিকই, কিন্তু নিজের দেশের মৃত শিশুদের জন্য তাঁর কেন কোনো দুঃখ নেই?
এদিকে ইরানের পুলিশপ্রধান আহমেদ রেজা রাদান রাজপথে যেকোনো বিক্ষোভের বিরুদ্ধে ‘দেখামাত্র গুলি’র যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা পরিস্থিতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন প্রাণঘাতী মুহূর্তে নির্বাসিত নেতার আহ্বানে সাড়া দেওয়া যেন মরণফাঁদে পা দেওয়া—এমনই মত অধিকাংশ সাধারণ মানুষের।
রেজা পাহলভীর কিছু একনিষ্ঠ সমর্থক এখনো স্বপ্ন দেখেন যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে তিনি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের জোর দিন দিন কমে আসছে। গোরগানের বাসিন্দা আমিরের মতে, একসময় পাহলভীর সমালোচনা করলেই তাঁকে সরকারের দালাল হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হতো, আজ পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ এখন বুঝেছে, ফাঁপা প্রতিশ্রুতি আর সংবেদনহীন নেতৃত্বের দিয়ে পরিবর্তন অসম্ভব।
ইরান আজ যুদ্ধের ভয়াবহতা আর অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার এক কঠিন ক্রান্তিলগ্ন অতিক্রম করছে। নেতৃত্বের সংকট বিরোধী শিবিরকে যেখানে দুর্বল করেছে, সেখানে জনগণের দীর্ঘদিনের আশাগুলো ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। রাজপথে রক্তের দাগ মোছার আগেই আরও রক্তের হাতছানি সম্ভবত ইরানি জনতাকে পাহাড়সম এক ‘মোহভঙ্গ’ বা হতাশার চোরাবালিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। এখান থেকে উত্তরণের পথ বর্তমানে বড়ই জটিল।
মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত