বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু এবং অনেক সংক্রামক রোগের হার কমেছে। কিন্তু একই সময়ে একটি নীরব স্বাস্থ্য সংকট দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, আর সেটা হলো নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার এবং জরায়ুমুখ (সার্ভিক্যাল) ক্যান্সার। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রান্তিক ও স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর নারীরা এই রোগগুলোর সবচেয়ে বড় শিকার।
বাংলাদেশে ক্যান্সার এখন একটি দ্রুত বর্ধনশীল জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার ২০২২ এর হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয় এবং ১ লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যান্সার, আর জরায়ুমুখ ক্যান্সার দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্যান্সার।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ক্যান্সারের প্রায় ৩৬ শতাংশই স্তন ক্যান্সার এবং ১১ শতাংশের বেশি জরায়ুমুখ ক্যান্সার। প্রতিবছর আনুমানিক ১৩–১৫ হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে এবং ৮–৯ হাজার নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।
উদ্বেগের বিষয় হলো, অধিকাংশ রোগী চিকিৎসকের কাছে আসেন রোগের তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে, যখন চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ফলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, পরিবারগুলোকে বিপুল আর্থিক বোঝা বহন করতে হয় এবং বহু ক্ষেত্রে অকাল মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এখনও জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়, সেখানে ক্যান্সার শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটের পেছনে কোনো একক কারণ নয়; বরং একাধিক সামাজিক, পরিবেশগত এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাগত কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রধান কারণ হলো হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সংক্রমণ, যা বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে যৌনজীবন শুরু, ঘন ঘন গর্ভধারণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার সীমিত ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে বয়স বৃদ্ধি, পারিবারিক ইতিহাস, স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশগত দূষণ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ অধিকাংশ নগর ও পৌর এলাকায় কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অনুপস্থিত। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরামর্শ, প্রতিরোধমূলক সেবা, স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ, অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, মাসিক-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, অনিরাপদ পরিবেশে বসবাস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিংয়ের সীমিত সুযোগ ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সীসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু দ্বারা পরিবেশ দূষণ, এবং একটি খণ্ডিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা যেখানে অধিকাংশ নারী প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধমূলক সেবা থেকে বঞ্চিত থাকেন। ফলে প্রতিরোধযোগ্য ও প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাময়যোগ্য অনেক ক্যান্সারও শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারী ধাতু বা হেভি মেটাল দূষণ একটি উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর মধ্যে সীসা (লিড) দূষণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক এবং তিন চাকার যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব ব্যাটারির একটি বড় অংশ অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর উপায়ে পুনর্ব্যবহার বা ফেলে দেওয়া হয়। অনেক এলাকায় খোলা জায়গায় ব্যাটারি ভেঙে সীসা সংগ্রহ করা হয়, যার ফলে মাটি, পানি ও বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নন। বিশেষ করে ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলে দেওয়া বা অনিরাপদভাবে পুনর্ব্যবহারের ফলে যে বিষাক্ত সীসা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, শিশুদের মেধা বিকাশে প্রতিবন্ধকতা, কিডনি ও প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। সচেতনতার এই ঘাটতি এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার অভাব মিলে পরিবেশগত দূষণকে একটি নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে পরিণত করছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারী ও শিশুদের ওপর।
নারীস্বাস্থ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রায়শই উপেক্ষিত বিষয় হলো মাসিক-জনিত স্বাস্থ্যবিধি। বাংলাদেশের অনেক গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারে এখনও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাসিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। অনেক কিশোরী ও নারী পরিষ্কার স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করতে পারেন না, নিরাপদ পানি ও গোপনীয়তার সুযোগ পান না এবং মাসিক নিয়ে নানা সামাজিক কুসংস্কার, লজ্জা ও নীরবতার সংস্কৃতির কারণে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হন।
অস্বাস্থ্যকর মাসিক ব্যবস্থাপনার ফলে প্রজননতন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ, যেমন রিপ্রোডাক্টিভ ট্র্যাক্ট ইনফেকশন, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং অন্যান্য স্ত্রীরোগজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অপরিষ্কার কাপড় বা অস্বাস্থ্যকর উপকরণ বারবার ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি ও সাবানের অভাব এবং ব্যবহৃত উপকরণের অনিরাপদ সংরক্ষণ বা নিষ্পত্তি নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে।
দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত সংক্রমণ ও প্রদাহ জরায়ুমুখের স্বাভাবিক কোষে ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং এইচপিভি সংক্রমণের প্রভাবকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, যা জরায়ুমুখ ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া মাসিক-জনিত স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে অজ্ঞতা ও সামাজিক সংস্কারের কারণে অনেক নারী প্রজননস্বাস্থ্যের প্রাথমিক লক্ষণগুলো উপেক্ষা করেন এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করেন না।
ফলে প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য অনেক সমস্যা ধীরে ধীরে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়। তাই মাসিক-জনিত স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা শুধু নারীর মর্যাদা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় নয়; এটি সংক্রমণ প্রতিরোধ, প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদে জরায়ুমুখ ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগ।
বাংলাদেশে এখনও অনেক এলাকায় অল্প বয়সে বিয়ে এবং অল্প বয়সে সন্তান ধারণ একটি বাস্তবতা। কৈশোরে বিয়ে ও গর্ভধারণ মায়ের শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রজনন-সংক্রান্ত ঝুঁকির মধ্যে থাকা নারীদের জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। একই সঙ্গে অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া অনেক মেয়ে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে, ফলে স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো একটি শক্তিশালী, সমন্বিত ও সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অভাব। যদিও দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে, বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো জনবল সংকট, সীমিত সেবার পরিধি, দুর্বল তদারকি, অপর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং ওষুধের ঘাটতিতে ভুগছে।
শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ অধিকাংশ নগর ও পৌর এলাকায় কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অনুপস্থিত। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরামর্শ, প্রতিরোধমূলক সেবা, স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
অনেক ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগ প্রতিরোধের পরিবর্তে রোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল, যা ব্যয়বহুল এবং কম কার্যকর। এর ফলে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মতো রোগগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়ার সুযোগ হারিয়ে ফেলে। দেশের বহু ইউনিয়ন ও শহুরে ওয়ার্ডে নারীদের জন্য নিয়মিত স্তন পরীক্ষা, জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং, স্বাস্থ্যশিক্ষা বা ঝুঁকিপূর্ণ রোগী শনাক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
গ্রাম পর্যায়ে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থার অনুপস্থিতি সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অথচ জরায়ুমুখ ক্যান্সার বিশ্বের অন্যতম প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সার এবং স্তন ক্যান্সারও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। কিন্তু একটি দুর্বল ও খণ্ডিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে হাজার হাজার নারী সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগ হারাচ্ছেন, যার পরিণতিতে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রসবসেবা সম্পর্কেও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এখনও দেশের কিছু এলাকায় অদক্ষ ধাত্রী বা প্রশিক্ষণহীন ব্যক্তির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হয়। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সিজারিয়ান অপারেশন সরাসরি ক্যান্সারের কারণ নয়, তবে এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গভীর সমস্যার প্রতিফলন, যেখানে প্রতিরোধমূলক ও মানসম্মত মাতৃস্বাস্থ্যসেবার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ও খণ্ডিত সেবা প্রাধান্য পাচ্ছে। নারীস্বাস্থ্যের সামগ্রিক অবনতি, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা হস্তক্ষেপ এবং দুর্বল ফলো-আপ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রথমত, সারা দেশে ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্পত্তির জন্য কঠোর নীতি ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশ দূষণকে জনস্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্কুল, কলেজ এবং কমিউনিটি পর্যায়ে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি, নারীস্বাস্থ্য এবং ক্যান্সার সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। নিরাপদ স্যানিটারি পণ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, কিশোরী শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং নারীর ক্ষমতায়নকে ক্যান্সার প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে ।
চতুর্থত, প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে নিয়মিত জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং রেফারেল সেবা থাকবে। প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করতে পারেন।
পঞ্চমত, জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকাদানকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যেহেতু এইচপিভি সংক্রমণই জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রধান কারণ, তাই কিশোরীদের মাসিক শুরু হওয়ার পর এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকিতে যাওয়ার আগেই এই টিকা প্রদান সবচেয়ে কার্যকর।
তাই অবিলম্বে সারাদেশে স্কুলভিত্তিক ও কমিউনিটিভিত্তিক এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি চালু করে সকল উপযুক্ত বয়সী কিশোরীর সর্বোচ্চ কভারেজ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আজকের একটি টিকা আগামী দিনের একটি ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে; তাই এই বিনিয়োগ শুধু স্বাস্থ্য খাতে নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নারী প্রজন্মের জীবন রক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নারীর স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক সংকট। একটি মা, বোন বা কন্যার অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ক্ষতি।
আজ যদি আমরা পরিবেশ দূষণ, বাল্যবিবাহ, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত স্ক্রিনিং এবং নারীস্বাস্থ্যের অবহেলার বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারি, তাহলে হাজার হাজার নারীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।
অন্যথায় এই নীরব মহামারি আগামী দশকে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত করা মানে জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। এখনই সময় প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার, কারণ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো সচেতনতা, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং একটি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা।
ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায়), বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ
*মতামত লেখকের নিজস্ব
