আমেরিকায় ‘অনওয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ান সোলজার্স’ গানটি খুব জনপ্রিয় ছিল। ১৮৬৫ সালে ইংরেজ ধর্মযাজক ও ধর্মতত্ত্ববিদ সাবিন বারিং গৌল্ড গানটি লিখেছিলেন। পুরোনো সেই যুদ্ধংদেহী সংগীত এখন আর তেমন শোনা যায় না।
একসময় গির্জার প্রার্থনা আর স্কুলের সমাবেশে এটি ছিল খুবই জনপ্রিয় গান। আক্রমণাত্মক সুরে গানটিতে বিশ্বাসীদের ধর্মযুদ্ধে ডাকা হয়। জয় আর দখলের পথে এগিয়ে যেতে আহ্বান জানানো হয়: ‘আগাও, খ্রিষ্টান সৈনিকেরা/যুদ্ধের মাঠে ছুটে যাও/যিশুর ক্রুশ সামনে নিয়ে/এগিয়ে চলো—আগাও!’
ভিক্টোরিয়ান যুগের মানসিকতার সঙ্গে এই সামরিক সুর মানানসই ছিল। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে (যদিও ১৯৬০-এর দশকের শুরুতেও আমার প্রাইমারি স্কুলেও এটি গাওয়া হতো)। এখন এই ধরনের বিজয়োন্মাদ মনোভাবই বরং ধর্মের বদনাম ডেকে আনে।
কিন্তু নিজেকে একরকম ‘খ্রিষ্টান সৈনিক’ হিসেবে ভাবা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই কথার ব্যাপারে একমত হবেন না। কে জানে, হয়তো তিনি অফিসে যাওয়ার পথেই এই গান গুনগুন করেন।
সম্প্রতি পেন্টাগনে এক ধর্মীয় প্রার্থনায় হেগসেথ ইরানের প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, ‘যাদের প্রতি কোনো দয়া দেখানোর সুযোগ নেই, তাদের বিরুদ্ধে প্রবল শক্তি প্রয়োগ করা হোক।’ তাঁর বিশ্বাসের কেন্দ্রে যেন রয়েছে সহিংসতা। তিনি ইরানিদের ‘ধর্মান্ধ’ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। অথচ তাঁর নিজের ইভানজেলিক খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদই মার্কিন মানদণ্ডেও চরমপন্থী। আর এই অবস্থানকে সমর্থন করেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প ২০২০ সাল পর্যন্ত নিজেকে প্রেসবাইটেরিয়ান খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচয় দিতেন। তারপর হঠাৎ তিনি জানালেন, তিনি আর তা নন। তবে এখন তিনি কী, তা হয়তো ঈশ্বরই জানেন।
রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে খ্রিষ্টধর্মকে ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রে বহুদিনের পুরোনো এবং নিতান্তই নিন্দনীয় একটি প্রথা। কিন্তু এর আরও এক অন্ধকার ও ঘৃণ্য দিকও আছে।
ইরানকে সরকারি ভাষায় যেভাবে দানবায়িত ও অমানবিক করে তোলা হচ্ছে, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে ‘অন্য’কে ভয় পাওয়া ও ঘৃণা করার মনোভাব। এ ক্ষেত্রে শিয়া মুসলমানদের প্রতি সেই বিদ্বেষ স্পষ্ট।
২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ট্রাম্প কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের অভিবাসীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর পর থেকেও তিনি একই ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন।
অন্যদিকে, অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টানের কাছে ধর্মকে বিকৃত করে যুদ্ধ, ধ্বংস আর বিভাজনের হাতিয়ার বানানো গভীরভাবে বেদনাদায়ক। তাঁরা বিশ্বাস করেন, যিশু মানবজাতির পাপ মোচনের জন্য আত্মাহুতি দিয়েছিলেন—প্রতিশোধ, অহংকার বা আধিপত্যের জন্য নয়।
রোমে পাম সানডের প্রার্থনায় পোপ লিও এই বার্তাই জোর দিয়ে বলেছেন। তাঁর কথায়, ‘যিশুকে ব্যবহার করে কেউ যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।’ তিনি বাইবেলের উদ্ধৃতি টেনে বলেন, যুদ্ধপ্রিয়দের প্রার্থনা শোনা হবে না—‘তোমাদের হাতে রক্ত লেগে আছে।’
সব খ্রিষ্টান যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইরানবিরোধী এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন—তা নয়। কিন্তু পোপ লিওর ক্ষোভের সঙ্গে একমত হয়েছেন ব্রিটেনের সাবেক ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ রাওয়ান উইলিয়ামসসহ আরও অনেকে।
এই প্রতিক্রিয়া শুধু সেখানেই থেমে নেই—এটি প্রতিধ্বনিত হয়েছে গোটা ইসলামি বিশ্বে এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের ইহুদিদের মধ্যেও।
এটা আসলে বড় একটা সমস্যার অংশ। আজকের অনেক ক্ষমতাধর নেতা আন্তর্জাতিক আইন মানতে চান না। তাঁরা নিজের সুবিধামতো নিয়ম ভেঙে ফেলছেন। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে ‘নিয়ম মেনে চলা বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ে উঠেছিল, সেটাই ভেঙে পড়ছে।
এর প্রভাব আমরা দেখি—বিশ্বরাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়ছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় কোনো শাস্তির ভয় ছাড়াই একতরফাভাবে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যেমনটা আমরা ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং গাজায় গণহত্যার ক্ষেত্রে দেখেছি।
সোজা কথায়, বিশ্বটা এখন নিয়মের বদলে শক্তির ওপর বেশি চলে যাচ্ছে—এটাই মূল সমস্যা।
কিন্তু বৈশ্বিক ব্যবস্থার এই নিষ্ঠুরতা ও মানসিক ভাঙনকে শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দেখলে চলবে না। এটি একটি গভীর নৈতিক প্রশ্নও। এই ব্যবস্থার পতন আসলে এক মৌলিক, সর্বজনীন নৈতিক সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।
এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, এই বিভক্ত পৃথিবীর দরকার এমন স্বাধীন, নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর—যারা ক্ষমতার মুখে সত্য বলার সাহস রাখবে, স্বৈরাচারীদের সামনে দাঁড়াবে, দুর্বল ও অসহায়দের রক্ষা করবে এবং অন্যায় ও রাষ্ট্রীয় আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে সরব হবে।
কিন্তু যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়, যখন সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র ও রাজনীতির ওপর আস্থা কমে যায়, যখন গণতন্ত্রে বিশ্বাস ক্ষয়ে যেতে থাকে, আর মানুষের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা শক্তির কারণে হুমকির মুখে পড়ে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কে?
হতাশাগ্রস্ত ও নিজেদেরই তৈরি করা সংকটে আটকে পড়া ভাঙা সমাজগুলো তখন আধ্যাত্মিক মুক্তির খোঁজে যেন ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় চিৎকার করে ওঠে।
এই বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সব ধর্মেরই ভূমিকা থাকা উচিত। কিন্তু ইরান প্রসঙ্গে (যা এই সংকটের সর্বশেষ রূপ) ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই সতর্ক ও বিভক্ত বলে মনে হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ ও বিশ্বব্যাপী অ্যাংলিকান গির্জার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া সারাহ ম্যুলালি তাঁর প্রথম ভাষণে এই যুদ্ধের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে ইরানি বংশোদ্ভূত গুলি ফ্রান্সিস ডেকানি স্পষ্ট ভাষায় এই যুদ্ধকে অবৈধ, অনৈতিক ও অন্যায্য বলে নিন্দা করেছেন।
এদিকে ইসরায়েলের হাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত উসকানিমূলক (এবং অবৈধও)। তিনি শুধু ইরানের রাজনৈতিক নেতা নন, বিশ্বজুড়ে শিয়া মুসলমানদের একজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা ছিলেন। তবু এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া অঞ্চলজুড়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রেখায় ভাগ হয়ে গেছে। সিরিয়ায় কিছু সুন্নি মুসলমান তাঁর মৃত্যুকে উদ্যাপন করেছেন।
এই যুদ্ধ ইসরায়েলের ইহুদিদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও আমেরিকান ইহুদিদের বেশির ভাগই এর বিরোধী। জে স্ট্রিট-এর এক জরিপ অনুযায়ী, আমেরিকান ইহুদিদের ৭৭ শতাংশ মনে করেন—এই যুদ্ধে ট্রাম্পের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও একই ধরনের বিভাজন দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেন সরকার সেখানে রুশ অর্থোডক্স গির্জার সঙ্গে যুক্ত (যারা পুতিনপন্থী ও যুদ্ধসমর্থক) ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে।
মার্কিন কলামিস্ট লিডিয়া পলগ্রিন প্রশ্ন তুলেছেন—সব দোষ কি শুধু ট্রাম্পের? নাকি তিনি আসলে সেই আমেরিকারই প্রতিফলন, যে নিজেকে সব সময় শ্রেষ্ঠ মনে করে, নিজের নিয়তির বিশেষত্বে বিশ্বাস রেখে যা খুশি তাই করার অধিকার নিজের হাতে তুলে নিয়েছে?
এই ধরনের বিভাজন নতুন কিছু নয়। কিন্তু আজ যখন বিশ্ব এক ভয়াবহ ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে, তখন সব ধারার খ্রিষ্টান নেতাদের ওপর একটি স্পষ্ট নৈতিক দায়িত্ব বর্তায়। তা হলো—তাদের একজোট হয়ে আরও সরব, আরও সক্রিয়, স্পষ্টভাবে যুদ্ধবিরোধী ও ন্যায়বিচারপন্থী ধর্মীয় ঐক্যের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
তেহরান, বৈরুত ও গাজার মসজিদের মুসল্লি, তেল আবিব, জেরুজালেম ও উত্তর লন্ডনের সিনাগগের উপাসক, ক্যান্টারবারি থেকে সিনসিনাটি পর্যন্ত গির্জার বিশ্বাসী—সবাই আসলে এক সাধারণ অধিকারের ভাগীদার। সেই অধিকার হলো, নিজের বিবেকমতো ধর্ম পালন করে শান্তিতে বাঁচা।
মিনাবে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পুড়ে যাওয়া শিশুদের মতো করুণ পরিণতি যেন আর কারও না হয়—এটাই সবার চাওয়া।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বনাশা বক্তব্য, আর অনলাইনে ‘শেষ সময়’ বা ‘আর্মাগেডন’ নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনার মাঝেও এই ভয়াবহ, অন্যায় ও লজ্জাজনক যুদ্ধ হয়তো আমেরিকানদের নিজেদের নৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
মার্কিন কলামিস্ট লিডিয়া পলগ্রিন প্রশ্ন তুলেছেন—সব দোষ কি শুধু ট্রাম্পের? নাকি তিনি আসলে সেই আমেরিকারই প্রতিফলন, যে নিজেকে সব সময় শ্রেষ্ঠ মনে করে, নিজের নিয়তির বিশেষত্বে বিশ্বাস রেখে যা খুশি তাই করার অধিকার নিজের হাতে তুলে নিয়েছে?
আসন্ন ইস্টারে প্রার্থনা থাকুক—ট্রাম্প ও তাঁর এই ধর্মবিরোধী সহযোগীরা যেন অন্তত কিছুটা আত্মসমালোচনার পথে হাঁটেন এবং ইরানবিরোধী এই ‘ক্রুসেড’ থামান। সেই পুরোনো ভিক্টোরিয়ান যুদ্ধংদেহী গানটাকেও এবার বিদায় জানানোর সময় এসেছে।
সাইমন টিসডাল দ্য গার্ডিয়ান–এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক ভাষ্যকার।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ