বাংলাদেশি ডায়াসপোরা: জাতীয় উন্নয়নে প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করার চ্যালেঞ্জগুলো

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই সম্পৃক্তকরণের কৌশল, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন মোবাশ্বের মোনেম। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

প্রবাসী সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক কাঠামোর উন্নয়ন। প্রচলিত সরকারি কর্মকাণ্ড সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু প্রবাসী সম্পৃক্ততা একটি বহুমাত্রিক বিষয় হওয়ায় এটি কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত শাসনব্যবস্থা (নেটওয়ার্ক গভর্ন্যান্স) কাঠামো প্রয়োজন; যেখানে সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী ও অন্যান্য অংশীদার একযোগে কাজ করবে। অর্থাৎ এটি কেবল সরকারি উদ্যোগ নয় বরং নেটওয়ার্ক গভর্ন্যান্স, যা যৌথ অংশগ্রহণভিত্তিক একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো।

এই কাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সম্পদ ব্যবহার করে একটি সাধারণ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ প্রবাসীদের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অর্থ মন্ত্রণালয়, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। একইভাবে প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। এ ধরনের সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর সমন্বয়কারী সংস্থা থাকা প্রয়োজন, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করবে এবং কর্মসূচিগুলোকে সুসংগঠিতভাবে পরিচালনা করবে।

আরও পড়ুন

এ কথা অনস্বীকার্য যে প্রবাসী সম্পৃক্ততার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর। একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান বলতে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাসকে বোঝায়, যার সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ও সম্পদ রয়েছে এবং সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে যার স্বতন্ত্র মর্যাদা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত।

বাংলাদেশে প্রবাসী–বিষয়ক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই মন্ত্রণালয় মূলত শ্রম অভিবাসীদের কল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান–সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশি ডায়াসপোরার জ্ঞান, দক্ষতা, বিনিয়োগকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর বিষয়টি অবহেলিত রয়ে গেছে। এই মন্ত্রণালয়ের এ–সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের কোনো ম্যান্ডেট বা কাঠামো নেই। 

প্রবাসী সম্পৃক্ততার বিস্তৃত ধারণা তুলনামূলকভাবে নতুন। প্রবাসী সম্পৃক্ততার তত্ত্ব ও বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার নিরিখে আমরা একটি নতুন ফ্রেমওয়ার্কের কথা চিন্তা করতে পারি, যার নাম দেওয়া যেতে পারে ‘পিআইই’।

পিআইই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্তকরণ

আগেই বলা হয়েছে যে প্রবাসী সম্পৃক্ততা বর্তমানে উন্নয়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশ বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের অর্থনৈতিক, সামাজিক জ্ঞানভিত্তিক অবদানকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় উন্নয়নের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রেরণের মাধ্যমে। তবে কেবল রেমিট্যান্সের মধ্যেই এই অবদান সীমাবদ্ধ নয়; প্রবাসীদের দাতব্য সহায়তা, বিনিয়োগ এবং জ্ঞান ও দক্ষতার ব্যবহারও দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিতে হবে।

এই লক্ষ্য সামনে রেখে পিআইই (ফিলানথ্রপি, ইনভেস্টমেন্ট, এক্সপার্ট এনগেজমেন্ট) ফ্রেমওয়ার্ক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় প্ল্যাটফর্ম (ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর ডায়াসপোরা এনগেজমেন্ট ইন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট) প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এটি একটি উচ্চপর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কাজ করবে। এই কমিটির প্রধান হতে পারেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। এর ফলে প্রবাসী সম্পৃক্ততার বিষয়টি দেশে এবং প্রবাসীদের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করবে। এই কমিটি একদিকে প্রাথমিক সমন্বয়কারী কাঠামো হিসেবে কাজ করবে, অন্যদিকে ডায়াসপোরা সম্পৃক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনাও প্রদান করবে। ডায়াসপোরা সম্পৃক্তকরণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই কমিটি একটি প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন ইউনিট (পিআইইউ) গঠন করতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের ইকোনমিক রিলেশন ডিভিশনকে (ইআরডি) স্বল্প মেয়াদে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে।

পিআইই ফ্রেমওয়ার্ক ফিলানথ্রপি, ইনভেস্টমেন্ট, এক্সপার্ট এনগেজমেন্ট—এই তিনটি ক্লাস্টার নিয়ে গঠিত। প্রতিটি ক্লাস্টারেরই ডায়াসপোরা সম্পৃক্তকরণে অসীম সম্ভাবনা রয়েছে। নিচে প্রতিটি ক্লাস্টারের সঙ্গে কোন কোন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট থেকে কাজ করতে পারে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:

প্রথম ক্লাস্টার হলো ফিলানথ্রপি, অর্থাৎ দাতব্য সম্পৃক্ততা। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রবাসীদের দাতব্য সহায়তাকে দেশের সামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগানো। অনেক প্রবাসী নিজ নিজ এলাকায় স্কুল, হাসপাতাল বা অন্যান্য সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তা করতে আগ্রহী। এই ক্লাস্টারের মাধ্যমে সেই সহায়তাকে সুসংগঠিত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার আওতায় পরিচালনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করে। তারা উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা প্রস্তুত করে এবং প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তা প্রবাসীদের কাছে তুলে ধরার কাজটি করবে।

দ্বিতীয় ক্লাস্টার হলো ইনভেস্টমেন্ট, অর্থাৎ বিনিয়োগ। এর লক্ষ্য প্রবাসী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। প্রবাসী বিনিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই ক্লাস্টারের আওতায় বিনিয়োগ বোর্ড, রাজস্ব বোর্ড, বিভিন্ন বাণিজ্যিক চেম্বার ও উন্নয়ন সহযোগীরা কাজ করতে পারে। তারা বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি, নীতিগত সহায়তা প্রদান ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রবাসী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে।

তৃতীয় ক্লাস্টার হলো এক্সপার্ট এনগেজমেন্ট, অর্থাৎ বিশেষজ্ঞ সম্পৃক্ততা। এর উদ্দেশ্য বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি পেশাজীবী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা। অনেক প্রবাসী বিশেষজ্ঞ শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা একটি ভার্চ্যুয়াল নেটওয়ার্ক তৈরি করবে, যার মাধ্যমে প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা দেশের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে।

এই কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেসরকারি অংশীদারদের অংশগ্রহণ। এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশন এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠন এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা তথ্য সংগ্রহ, তহবিল ব্যবস্থাপনা, নেটওয়ার্ক গঠন এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্পৃক্তকরণের প্রধান চ্যালেঞ্জ

সাধারণ চ্যালেঞ্জগুলো: বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সাধারণ চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। প্রথমত, প্রবাসী কমিউনিটিকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে একটি নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অনলাইন ডেটাবেজ অত্যন্ত প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, অনেক প্রবাসী এমন দেশে বসবাস করেন, যেখানে তাঁদের বৈধ আবাসিক অনুমতি নেই। ফলে তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকেন। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত প্রবাসীদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করা এবং নিশ্চিত করা যে তাঁদের তথ্য নিরাপদ থাকবে এবং তা কেবল উন্নয়নমূলক উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হবে।

তৃতীয়ত, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানা সংগঠন ও সমিতি গঠন করেছেন। এসব সংগঠনের অনেকগুলোর ওপর আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির প্রভাব রয়েছে। এর ফলে প্রবাসীদের একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে একত্র করা অনেক সময় কঠিন হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে শুরুতে কিছু নির্বাচিত সংগঠনকে নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা একটি বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে। পাশাপাশি বৃহত্তর প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে ধারাবাহিক প্রচার চালিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বৈদেশিক মিশনগুলোকে নির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব বণ্টন করে দিতে হবে।

নীতি পর্যায়ের চ্যালেঞ্জগুলো: বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে নীতি পর্যায়ে কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। প্রথমত, প্রবাসী সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত নীতিমালার অভাব রয়েছে। বিদ্যমান নীতিগুলো মূলত শ্রম অভিবাসন এবং প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু পিআইই পদ্ধতির মতো সমন্বিত ধারণা এসব নীতিমালায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বিতভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন।

দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে এমন কিছু নতুন কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে হতে পারে, যা তাদের বর্তমান দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। এতে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মূলত শ্রম অভিবাসীদের কল্যাণ–সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করে। কিন্তু পিআইই কাঠামোর আওতায় দাতব্য কার্যক্রম, বিনিয়োগ এবং বিশেষজ্ঞ সম্পৃক্ততার মতো নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব ও কার্যপরিধি পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন হবে।

তৃতীয়ত, প্রবাসীদের দাতব্য সহায়তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করতে হলে তাদের আস্থা অর্জন করা জরুরি। অনেক প্রবাসী তাঁদের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে তা নিয়ে সংশয়ে থাকতে পারেন। তাই আগে থেকেই জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা প্রস্তুত করা প্রয়োজন। প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য উপকারভোগী এবং সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রবাসীদের কাছে তুলে ধরলে তাঁদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।

চতুর্থত, প্রবাসীদের কাছ থেকে দাতব্য তহবিল গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ ব্যাংক হিসাব বা তহবিল ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন। সব সরকারি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের তহবিল পরিচালনার সক্ষমতা রাখে না, যদি না তাদের জন্য স্পষ্ট ম্যান্ডেট নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে, যাতে প্রবাসীরা সহজেই দেখতে পারেন তাঁদের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে চ্যালেঞ্জগুলো: বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স ছাড়া অন্যান্য সম্পদ—যেমন জ্ঞান, দক্ষতা ও বিনিয়োগ—ব্যবহারের জন্য জাতীয় পর্যায়ে সুসংগঠিত কোনো উদ্যোগ বা শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। ফলে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তনের প্রতি কিছু প্রতিরোধ দেখা দিতে পারে। এই প্রতিরোধ অতিক্রম করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও তা দূর করা অসম্ভব নয়।

অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বর্তমানে শ্রম অভিবাসীদের নানা সমস্যা ও প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত। সীমিত জনবল ও সম্পদের কারণে এই মন্ত্রণালয়ের পক্ষে একই সঙ্গে প্রবাসী সম্পৃক্ততার মতো নতুন ও জটিল কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন, কিন্তু তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

ভবিষ্যৎ করণীয়

এ পর্যন্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জাতীয় উন্নয়নে প্রবাসী সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ এখনো গ্রহণ করেনি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত করার জন্য এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো সুসংগঠিত কর্মসূচি বা কার্যকর প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠেনি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হলে বিদ্যমান নীতিমালা ও কর্মপদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা প্রয়োজন এবং সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে আসা জরুরি।

প্রবাসী কমিউনিটিকে পিআইই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হলে সরকারকে একটি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যার মূল লক্ষ্য প্রবাসী সম্প্রদায়ের তথ্যভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি, তাঁদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দাতব্য, বিনিয়োগ ও বিশেষজ্ঞ কার্যক্রমের মাধ্যমে আস্থা ও বিশ্বাস গড়ে
তোলা। দূতাবাস, মিশন ও কনস্যুলেটের মাধ্যমে প্রবাসীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা, বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন, প্রবাসী পদক প্রদান এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগ স্থাপন করা অতি জরুরি।

  • মোবাশ্বের মোনেম চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন

    মতামত লেখকের নিজস্ব