বিজেপি ভারতের রাজনীতিতে বরাবর তার প্রতিপক্ষকে টেক্কা দিয়ে চলেছে। এই প্রথম তারা একজন আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করল। এর আগে অটল বিহারি বাজপেয়ীর আমলে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন প্রখ্যাত পরমাণুবিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম। বিজেপির হিসাব পরিষ্কার। আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাউকে রাষ্ট্রপতি করলে আগামী নির্বাচনে ওই সম্প্রদায়ের সিংহভাগ মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে।

দ্রৌপদী মুর্মুর বিজয়ের পর প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘বিজেপি কেন আলাদা, রাষ্ট্রপতি পদে সাঁওতাল দ্রৌপদী মুর্মুকে পছন্দ করা তার আরও একটা বড় প্রমাণ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ যে আদিবাসী জনগোষ্ঠী, তাদের আশা–আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে এমন কোনো পদক্ষেপ এত দিন কেউ নেয়নি। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার ও বিজেপি এখানেই অন্য সবাইকে টেক্কা দিয়ে গেল। সিদ্ধান্তটি ঐতিহাসিক।’

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন রেখেছেন, কেমন হবেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী, ব্যতিক্রমী না প্রতীকী? দলিত সম্প্রদায় থেকে আসা রামনাথ কোবিন্দ শেষ পর্যন্ত প্রতীকীই ছিলেন। আর ব্যতিক্রমী ছিলেন এ পি জে আবদুল কালাম ও প্রণব মুখার্জি। যদিও আরএসএসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে শেষোক্তজন সমালোচিত হয়েছিলেন।

ভারত গত ৭৫ বছরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপতি বেছে নিয়েছে। দেশটির প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রপতি ছিলেন জাকির হোসেন। এরপর ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ। তাঁরা দুজনই কংগ্রেসের রাজনীতি থেকে আসা। শিখ ধর্মাবলম্বী জ্ঞানী জৈল সিংও। কিন্তু আবদুল কালাম ছিলেন নির্দলীয়। তাঁকে ভারতের পরমাণবিক অস্ত্রের জনক বলা হয়। সবশেষে বিজেপি রাষ্ট্রপতি পদে বেছে নিল একজন সাঁওতাল নারীকে। দ্রৌপদী মুর্মুর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল রাজ্য সরকারের করণিক হিসেবে, পরবর্তী সময় তিনি কাউন্সিলর ও বিধানসভার সদস্য হয়েছেন। রাজ্যপাল হন। এখন ১৪০ কোটি মানুষের দেশের রাষ্ট্রপতি।

পাকিস্তানের সংবিধানে লেখা ছিল দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হবেন মুসলমান। বাংলাদেশের সংবিধানে সে রকম কিছু লেখা নেই। তারপরও এ পর্যন্ত কোনো অমুসলিম, অবাঙালি রাষ্ট্রপতি হননি। ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগের কাছে আমরা কি এমন একজন রাষ্ট্রপতি আশা করতে পারি, যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ নন; কিংবা যিনি এসেছেন ধর্মীয় কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে।

দেখতে দেখতে বাংলাদেশের বয়সও ৫১ বছর হলো। এ পর্যন্ত আমরা ২১ জন রাষ্ট্রপতি পেয়েছি। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। আবদুল হামিদের এটি দ্বিতীয় মেয়াদ। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে ২০২৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী, বর্তমান রাষ্ট্রপতির তৃতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান সংসদই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে; যার শতকরা ৯০ শতাংশ আসন আওয়ামী লীগ ও এর জোটসঙ্গীদের।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মুসলমান সম্প্রদায় এবং বাংলাভাষী মানুষের বাইরে কেউ রাষ্ট্রপতি হননি। ১৯৯১ সাল থেকে আমরা ধারাবাহিকভাবে নারী প্রধানমন্ত্রী পেয়েছি। জাতীয় সংসদের স্পিকার পদেও নারী পেয়েছি। কিন্তু কোনো নারী রাষ্ট্রপতি পাইনি।

পাকিস্তানের সংবিধানে লেখা ছিল দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হবেন মুসলমান। বাংলাদেশের সংবিধানে সে রকম কিছু লেখা নেই। তারপরও এ পর্যন্ত কোনো অমুসলিম, অবাঙালি রাষ্ট্রপতি হননি। ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগের কাছে আমরা কি এমন একজন রাষ্ট্রপতি আশা করতে পারি, যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ নন; কিংবা যিনি এসেছেন ধর্মীয় কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে।

এ প্রসঙ্গে প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একটি কথা মনে পড়ছে। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে তিনি তাঁর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। একবার সংবাদ অফিসে এলেন তাঁর পুরোনো রাজনৈতিক গুরু ও সম্পাদক আহমদুল কবিরের সঙ্গে দেখা করতে। সংবাদ সম্পাদক আমাদেরও ডাকলেন তাঁদের আলোচনায়। কথা প্রসঙ্গে সাংবাদিক খোন্দকার মুনীরুজ্জামান তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দাদা আর কত দিন আপনি সংসদ সদস্য থাকবেন? মন্ত্রী হবেন না?’ জবাবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বেশ রসিক ছিলেন। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘শোনো মিয়া, আমার বাংলা নাম না হলে আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হতাম।’ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মন্ত্রী হয়েছিলেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন সেই রাজনীতিক, যিনি ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের প্রবল স্রোতের বাইরে গিয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রার্থী হিসেবে। এরপর একতা পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি ইত্যাদি হয়ে আবার আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে যেসব রাজনীতিক উঠে এসেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই পাকিস্তান আমলের। যেমন ফণী ভূষণ মজুমদার, মনোরঞ্জন ধর, সুধাংশু শেখর হালদার। আর শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তো ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করে গেছেন পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পেশ করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে হত্যা করে। বাংলাদেশ আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে তেমন উজ্জ্বল নাম পাই না। মন্ত্রী হলে গণমাধ্যমে নাম প্রচারিত হয়, মন্ত্রিত্ব চলে গেলে হারিয়ে যান।

ভারতে ক্ষমতায় আছে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। দলটির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও হানাহানি ঘটানোর গুরুতর অভিযোগ আছে। তাদের নতুন নাগরিকত্ব আইন, আসামে নাগরিকপঞ্জির উদ্দেশ্যও সাম্প্রদায়িক ভেদনীতিকে উসকে দেওয়া। তারপরও বিজেপি মুসলমান সম্প্রদায় থেকে এ পি জে আবদুল কালাম এবং পিছিয়ে পড়া সাঁওতাল তথা আদিবাসী সম্প্রদায় থেকে রাষ্ট্রপতি বেছে নিয়েছে।

বাংলাদেশে এখন যে দলটি ক্ষমতায় আছে, তারা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে বলা আছে, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় নীতি (পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত) বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র, সকল ধর্ম, বর্ণ ও নৃগোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারে প্রতিষ্ঠা হবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভীষ্ট লক্ষ্য।’

যাঁরা সংবিধানে সাম্প্রদায়িক মোড়ক পরিয়েছেন, যাঁরা বাংলাদেশে বিশেষ ধর্মের মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে চান (পড়ুন বিএনপি ও জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র), তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বাইরের কাউকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে বসাবেন, সেটি আশা করা যায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেকে দাবি করে। দলীয় গঠনতন্ত্র এখনো চার মূলনীতি ধারণ করে। তারা সব ধর্ম, বর্ণ ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সমান অধিকারে বিশ্বাসী।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই দল বাংলাদেশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায় থেকে একজন রাষ্ট্রপতি বেছে নেবে কি না। যদি নেয়, সেটাই হতে পারে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বিলোপকারী বিএনপি ও রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তনকারী জাতীয় পার্টি থেকে তাদের মৌলিক পার্থক্য।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন