বিশ্লেষণ
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার জন্য একটি প্রস্তাবিত আইনি কাঠামো
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার জন্য একটি প্রস্তাবিত আইনি কাঠামোর রূপরেখা নিয়ে লিখেছেন বদিউল আলম মজুমদার।
দ্রুত নির্বাচনের জন্য স্থানীয় সরকারের একটি যুগোপযোগী আইনি কাঠামো আবশ্যক। ২০০৭ সালে ড. শওকত আলীর নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ কমিটি বর্তমান এবং গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ড. তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশনের প্রস্তাবিত আইনের খসড়াগুলো পর্যালোচনা করে একটি চূড়ান্ত আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি বলে মনে করি। এর তাত্ত্বিক ভিত্তি হবে ‘সাবসিডিয়ারিটি প্রিন্সিপাল,’ যার মূলকথা হলো সমস্যা যেখানে, সমাধানের মোক্ষম ও টেকসই সুযোগও সেখানে।
অর্থাৎ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন, পরিবেশ, নিরাপত্তা ইত্যাদিসহ যেসব সমস্যা জনগণ প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হন, সেগুলো তাঁদের নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে সমাধান করা আবশ্যক। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং এগুলোতে সর্বাধিক সম্পদ, দায়দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেওয়া আবশ্যক। ফেডারেল কাঠামোর পরিবর্তে আমাদের এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় জেলা পরিষদও গুরুত্বপূর্ণ, যেটি হতে পারে আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূল থেকে প্রস্তুত করা স্থানীয় পরিকল্পনা অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। উপজেলার কাজ হতে পারে মূলত সমন্বয়।
প্রস্তাবিত আইনি কাঠামোতে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়া আবশ্যক, তা তুলে ধরা হলো—
স্থানীয় সরকারের স্তরবিন্যাস
স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে সাধারণত দুইভাগে ভাগ করা হয় গ্রামীণ বনাম নগর স্থানীয় সরকার। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নিয়ে নগর স্থানীয় সরকার গঠিত। জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন, ৪৯৫টি উপজেলা, ৬৪টি জেলা, ৩৩১টি পৌরসভা এবং ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। ফলে প্রতি জেলায় গড়ে আটটি উপজেলা, প্রতিটি উপজেলায় গড়ে নয়টি ইউনিয়ন এবং প্রতিটি জেলায় গড়ে পাঁচটি (৩৩০/৬৪) পৌরসভা রয়েছে। স্থানীয় সরকারের বিদ্যমান এই স্তরবিন্যাস অব্যাহত রাখা যেতে পারে।
সমন্বিত আইন
শওকত আলী কমিটি এবং তোফায়েল আহমেদ কমিশনের অনুসরণে আমরাও মনে করি যে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার জন্য দুটি একটি পল্লী স্থানীয় সরকার এবং আরেকটি নগর স্থানীয় সরকারের জন্য সমন্বিত আইন প্রণয়ন করা আবশ্যক। পল্লী স্থানীয় সরকারের সমন্বিত আইনে তিনটি ভাগ থাকবে, যার একটিতে থাকবে জেলা পরিষদ, দ্বিতীয়টিতে উপজেলা পরিষদ এবং অন্যটিতে ইউনিয়ন পরিষদ–সংক্রান্ত বিধান। এমনিভাবে নগর স্থানীয় সরকারের সমন্বিত আইনে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসংক্রান্ত পৃথক দুটি ভাগ থাকবে।
প্রতীক ব্যবহার না করেও যদি দলীয় প্রার্থী ঘোষণা কিংবা একক প্রার্থী দাঁড় করানো হয়, তাহলে আক্ষরিক অর্থে আইন মানা হলেও আইনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে ভন্ডুল করা হবে, যা হবে আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আশা করি, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আইন না মানার অতীতের সংস্কৃতিতে ফিরে যাবে না।
নির্বাচনব্যবস্থা
সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ মানতে হলে সব কটি প্রশাসনিক একাংশ বা স্তরে দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করা জরুরি। বিদ্যমান কাঠামো অব্যাহত রেখে ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে ইউনিয়ন গঠিত হবে এবং প্রতিটি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা হবে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার জন। অর্থাৎ প্রতিটি ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা হবে ২৭ হাজার থেকে ৪৫ হাজারের মধ্যে। ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন সদস্য এবং পুরো ইউনিয়ন থেকে একজন চেয়ারম্যান সরাসরি নির্বাচিত হবেন।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ২ জন সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে উপজেলা পরিষদ গঠিত হবে। একই সঙ্গে উপজেলার অন্তর্ভুক্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা পদাধিকারবলে উপজেলা পরিষদের সদস্য হবেন। ফলে উপজেলা পরিষদের গড় সদস্যসংখ্যা হবে মোট ২৮ জন (১৮ জন নির্বাচিত + ৯ জন পদাধিকারবলে + ১ জন চেয়ারম্যান)।
প্রতিটি পৌরসভা ওয়ার্ড থেকে একজন করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন। এর পাশাপাশি প্রতিটি পৌরসভায় জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একজন পৌর মেয়র থাকবেন। ফলে পৌরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা হবে ১০। তবে ইউনিয়নভুক্ত এলাকাকে পৌরসভায় পরিণত করার মানদণ্ডকে আরও কঠোর করা এবং বিদ্যমান আইনের শর্তাবলি পূরণ না করা সত্ত্বেও যেসব এলাকাকে পৌরসভা ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোকে প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বাতিল করা আবশ্যক।
বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ১৩টি সিটি করপোরেশন, যার সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এবং প্রতিটি সিটিতে একজন সরাসরিভাবে নির্বাচিত মেয়র রয়েছেন। তবে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরের সংখ্যায় ভিন্নতা রয়েছে। সিটি করপোরেশনের বিদ্যমান কাঠামো অব্যাহত রাখা যেতে পারে।
বর্তমানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের পরিবর্তে জেলার অধীন সব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কমসংখ্যক নির্বাচকমণ্ডলী হওয়ায় বর্তমানে জেলা পরিষদ নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কেনাবেচা হয়, ফলে পুরো নির্বাচনব্যবস্থা ভয়াবহভাবে কলুষিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জেলা পরিষদের নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো আবশ্যক। তবে জেলার পরিসর এত বড় যে চেয়ারম্যান পদের জন্য সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা অযৌক্তিক। তবে জেলা পরিষদের অন্য সদস্যদের জন্য সরাসরি নির্বাচনের আয়োজন করা বাস্তবসম্মত।
প্রত্যেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলা এবং প্রতিটি পৌরসভা থেকে একজন করে জেলা পরিষদের সদস্য সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন। একই সঙ্গে উপজেলা ও পৌরসভার চেয়ারম্যানরা পদাধিকারবলে জেলা পরিষদের সদস্য হবেন। এর পাশাপাশি প্রতিটি জেলা পরিষদের একজন চেয়ারম্যান পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হবেন। জেলার অধীন সব নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের জেলা পরিষদের নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য করার পাশাপাশি নতুন নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্যও এতে যুক্ত করা যেতে পারে। প্রসঙ্গত, সব নির্বাচনের জন্য ব্যয়সীমা নির্ধারণ ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
সংসদ সদস্যদের ভূমিকা
সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়ন তথা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হওয়া বা তাঁদের জন্য উপজেলা পরিষদে অফিসের ব্যবস্থা করা সংবিধানের ৫৯ ও ৬৫ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং কুদরত-ই-এলাহী বনাম বাংলাদেশ [৪৪ডিএলআর(এডি)(১৯৯২)] ও আনোয়ার হোসেন বনাম বাংলাদেশ [১৬বিএলটি(এইচডি) ২০০৮] মামলার রায়ের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
কারণ, সংসদ সদস্যগণের সাংবিধানিক দায়িত্ব আইন প্রণয়ন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, বাজেট অনুমোদন এবং নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ভূমিকা পালন। মহান জাতীয় সংসদ বা হাউস অব দ্য পিপলের সদস্য হিসেবে সংসদ ভবন হল তাদের কর্মস্থল এবং এ লক্ষ্যে তাঁদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তাই প্রস্তাবিত স্থানীয় সরকার আইনে সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে হবে, যাতে অতীতের মতো ‘এমপিরাজ’ সৃষ্টি না হয়।
ওয়ার্ড সভা
শওকত আলী কমিটির সুপারিশের আলোকে ওয়ার্ডের সব ভোটারকে নিয়ে ওয়ার্ড সভার বিধান ইউনিয়ন পরিষদ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বছরে দুবার ওয়ার্ড সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের কাছে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত, স্থানীয় পর্যায় থেকে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে সরকারি স্কিমের উপকারভোগী চিহ্নিত করার বিধান রয়েছে।
একই সঙ্গে ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে স্থানীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা, যদিও তা বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পৌরসভা পর্যায়ে নাগরিক কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সিটি করপোরেশনের জোনাল অফিসগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণের এবং জনগণকে যথার্থ সেবা প্রদানের মাধ্যম হিসেবে কার্যকর করার এবং প্রতি জোনে নাগরিক কমিটি গঠন করা আবশ্যক।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি নির্ভর করে নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ওপর। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যথাযথ ও অব্যাহতভাবে পরিচালনার জন্য ‘এনআইএলজি’কে প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল প্রদান এবং এর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা আবশ্যক। আরও আবশ্যক এর প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আধুনিকায়ন এবং এর গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা।
স্থানীয় পরিকল্পনা
সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণের সম্পৃক্ততায় প্রতিটি স্থানীয় সরকারের স্তরে পাঁচসালা উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাৎসরিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। এ প্রক্রিয়ায় সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও স্থানীয় সংগঠনগুলোকে কাজে লাগিয়ে এবং জনগণকে সংগঠিত করে উন্নয়নকে আন্দোলনে পরিণত করা যেতে পারে, যে উদ্যোগ অতীতের বিএনপি সরকার গ্রহণ করেছিল। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের ভিত্তি হবে স্থানীয়ভাবে প্রণীত এসব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা
জনপ্রতিনিধিদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের জন্য প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিবীক্ষণ ও পরিদর্শন করা আবশ্যক। একই সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ অডিট পদ্ধতিকে শক্তিশালী করা আবশ্যক। এ ছাড়া নির্বাচিত চেয়ারম্যান বা মেয়র এবং সদস্য বা কাউন্সিলার ও স্থায়ী কমিটির সভাপতি বা সদস্যরা পরিষদের কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ হবেন। এ লক্ষ্যে প্রতি মাসে পরিষদের একটি সভা অনুষ্ঠানের এবং স্থায়ী কমিটিগুলোর সংখ্যা কমিয়ে এগুলোকে কার্যকর করা আবশ্যক।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি নির্ভর করে নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ওপর। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যথাযথ ও অব্যাহতভাবে পরিচালনার জন্য ‘এনআইএলজি’কে প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল প্রদান এবং এর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা আবশ্যক। আরও আবশ্যক এর প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আধুনিকায়ন এবং এর গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল
সাংবিধানিক নির্দেশনা রয়েছে প্রতিটি প্রশাসনিক একাংশে একটি ‘সরকার’ প্রতিষ্ঠার, যার ওপর অর্পিত হবে ‘স্থানীয় শাসনের’ এবং এর জন্য ‘প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য’কে এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রে যেমন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অধীনে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়, তেমনিভাবে স্থানীয় পর্যায়ে সব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীকেও স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে, সংবিধান অনুযায়ী, দায়িত্ব পালন করার কথা।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠাগুলোকে সংবিধান নির্ধারিত সব ‘পাবলিক সার্ভিস’ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন–সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হলে, লাইন মিনিস্ট্রির সব জনবলকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অধীনে ন্যস্ত করার কোনো বিকল্প নেই। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে একটি পৃথক ‘লোকাল গভর্নমেন্ট সার্ভিস’ চালু করার কথা বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। প্রসঙ্গত, কুদরত-ই-এলাহী মামলার রায়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন যে স্থানীয় সরকারের বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সাংবিধানিক নির্দেশনাকে উপেক্ষা করতে পারেন না।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন
সংবিধান অনুযায়ী আমাদের এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের সমান্তরাল একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকারব্যবস্থা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার সম্পূর্ণ উল্টো। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা হয়ে গেছে আমলাতন্ত্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় সরকারের একটি বর্ধিত অংশ। এ ছাড়া ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকার নির্দেশ প্রদান এবং নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, যার ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা আমাদের দেশে বিকশিত হওয়ার এবং জনগণের কল্যাণ সাধনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে, যার পরিবর্তন জরুরি।
স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এগুলোর আর্থিক প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ, এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর অযাচিত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপের নিরসন এবং এগুলোর যথাযথ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের লক্ষ্যে শওকত আলী কমিশন ২০০৭ সালে একটি আইনের খসড়া প্রস্তাব করে। প্রস্তাবিত কমিশনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিকেন্দ্রীকরণের, বিশেষত আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের পথ সুপ্রশস্ত করা এবং এ প্রক্রিয়ায় জেলা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা।
প্রস্তাবে আইনের খসড়াটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করা হয় এবং পাঁচ বছর মেয়াদের তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশনও গঠন করা হয়। সংসদ কর্তৃক অধ্যাদেশটি অনুমোদন না করার কারণে কমিশনটি বিলুপ্ত হয়ে যায়, যা আবার পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করার লক্ষ্যে আইন পাস করা হয়। কিন্তু অধিবেশন শেষ হওয়ার আগেই কিছু দল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। আবার কিছু দল স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার পথ খুঁজছে।
প্রতীক ব্যবহার না করেও যদি দলীয় প্রার্থী ঘোষণা কিংবা একক প্রার্থী দাঁড় করানো হয়, তাহলে আক্ষরিক অর্থে আইন মানা হলেও আইনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে ভন্ডুল করা হবে, যা হবে আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আশা করি, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আইন না মানার অতীতের সংস্কৃতিতে ফিরে যাবে না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)
মতামত লেখকের নিজস্ব
