তাকাইচি কি জাপানকে খাদের কিনারা থেকে তুলতে পারবেন

সানায়ে তাকাইচিফাইল ছবি

জাপানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বয়স্ক পুরুষদের আধিপত্য ছিল। সেই ধারার অবসান ঘটিয়ে প্রথম নারী হিসেবে দেশটির নেতৃত্বে এসেছেন সানায়ে তাকাইচি। দেশের শান্তিবাদী সংবিধান সংশোধন করে সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের পক্ষে থাকা এই নেত্রী জোর দিচ্ছেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে।

এটি অর্জন করতে বড় পরিসরের সরকার ও সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে রয়েছে তাঁর অবস্থান। এ ছাড়া অভিবাসন প্রশ্নে তাঁর অবস্থান কঠোর ও রক্ষণশীল।

গত সপ্তাহে রেকর্ড ব্যবধানে জয়ের মাধ্যমে তাকাইচি আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছেন। আকস্মিক নির্বাচন ডেকে তাঁর দল নিম্নকক্ষের ৪৬৫টির মধ্যে ৩১৬টি আসন জিতেছে। ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর এটি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সবচেয়ে বড় জয়।

দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রাস্ফীতি ও মজুরি স্থবিরতা, জনসংখ্যা হ্রাস এবং বৈশ্বিক অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা জাপানের মানুষকে হতাশ করেছিল। তাকাইচি আশার বার্তা দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করেন। তিনি এমন এক ভবিষ্যতের কথা বলেন, যেখানে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হবে ও দেশের আত্মবিশ্বাস ফিরবে।

তাঁর এই বিপুল ব্যবধানে জয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তা খাতে বড় সংস্কারের পথ খুলে দিয়েছে। জাপান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি ও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র। দেশটির ভবিষ্যৎ নীতিগুলো নির্ভর করবে এ বাস্তবতার ওপরই।

খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে জাপানি পরিবারগুলো চাপের মুখে ছিল। তাকাইচি পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকি এবং চালের কুপন দেন। তিনি পেট্রলের কর কমান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেন। এতে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তাকাইচির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ে। মাত্র তিন মাস ক্ষমতায় থাকলেও তিনি দক্ষভাবে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হন। ক্ষমতায় আসার পর তিনি দ্রুত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেন, বিদেশি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং একটি অতিরিক্ত বাজেট পাস করান। এই বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য নানা সুবিধা ছিল।

খাদ্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে জাপানি পরিবারগুলো চাপের মুখে ছিল। তাকাইচি পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকি এবং চালের কুপন দেন। তিনি পেট্রলের কর কমান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেন। এতে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ে। এ আকস্মিক নির্বাচন ছিল কৌশলগত পদক্ষেপ। বিরোধীরা প্রস্তুত হওয়ার আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটারদের সামনে মূল প্রশ্ন ছিল, কাকে তাঁরা বেশি বিশ্বাস করেন। তাকাইচি নাকি বিরোধীদের।

প্রধান বিরোধী জোট সেন্ট্রিস্ট রিফর্ম অ্যালায়েন্স সদ্য গঠিত হওয়ায় সাংগঠনিকভাবে দুর্বল ছিল। দলটির নেতা ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিকো নোদা। তাঁর নেতৃত্বে দলটি বড় পরাজয়ের মুখে পড়ে। তাকাইচির জনপ্রিয়তার কারণে অনেক বিতর্কিত প্রার্থীও জয়ী হন। তিনি বিরোধীদের কিছু নীতি গ্রহণ করেন, যেমন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যে কর কমানো।

জাপানে অভিবাসীর সংখ্যা মাত্র ৩ শতাংশ হলেও এ ইস্যু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাকাইচির মতে, জাপানের বৃদ্ধ জনসংখ্যার কারণে বিদেশি শ্রমিক দরকার, তবে তা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। তাকাইচি মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের নীতির সংশোধিত সংস্করণ অনুসরণ করছেন।

জাপানে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নির্বাচন
ছবি: এএফপি

সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু জাপানের সরকারি ঋণ ইতিমধ্যে জিডিপির দ্বিগুণের বেশি। নতুন ঋণ নিয়ে ব্যয় বাড়ানোয় বাজারে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বন্ডের সুদ বেড়েছে ও ইয়েন দুর্বল হয়েছে। ফলে আমদানি পণ্যের দাম বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে।

তাকাইচি খাদ্যে কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এতে রাজস্ব কমে যেতে পারে। তিনি মনে করেন, সরকারি বিনিয়োগ বাড়ালে প্রবৃদ্ধি হবে, মজুরি বাড়বে ও কর আদায়ও বাড়বে। শেয়ারবাজার এই নীতিকে স্বাগত জানালেও বন্ড বাজার এখনো সন্দিহান।

প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্রুত বাড়ানোর পরিকল্পনাও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বৃদ্ধ জনসংখ্যার কারণে স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। বাজেটের বড় অংশই এসব খাতে যাচ্ছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শিনজো আবের অন্যতম লক্ষ্য ছিল জাপানকে আরও শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করা। তাকাইচি সেই লক্ষ্য পূরণে আগ্রহী। তিনি প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে চান এবং সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন। এদিকে চীন নিয়ে কঠোর অবস্থান তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।

তিনি বলেছেন, চীন যদি তাইওয়ানে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে জাপানও প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এতে সি চিন পিং সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করাও জরুরি। ভবিষ্যতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজতে হবে।

আরও পড়ুন

আগামী মার্চে তাকাইচি ওয়াশিংটন সফরে যাবেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাপান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেকে এশিয়ার অপরিহার্য মিত্র হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তবে আশঙ্কা রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নিজেদের মধ্যে বড় সমঝোতায় পৌঁছালে জাপানের স্বার্থ উপেক্ষিত হতে পারে। এদিকে তাকাইচি ক্ষমতায় এসে ইয়াসুকুনি মন্দিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। টোকিওর এই স্মৃতিসৌধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে নির্মিত হলেও এখানে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদেরও পদচিহ্ন রয়েছে। এ মন্দিরকে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া জাপানের সাম্রাজ্যবাদী অতীতের প্রতীক হিসেবে দেখে। সেখানে সফর করলে দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হতে পারে।

ইতিহাস, ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ ও জাতীয়তাবাদী আবেগ পূর্ব এশিয়ার সম্পর্ককে এখনো জটিল করে রেখেছে। তাকাইচির সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দেশীয় রাজনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।

  • জেফ কিংস্টন জাপানের টেম্পল ইউনিভার্সিটির এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক

    টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত